শত্রুর সঙ্গে ব্যবহার ও ইসলামের শিক্ষা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৫ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ২১ ১৪২৮,   ২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

শত্রুর সঙ্গে ব্যবহার ও ইসলামের শিক্ষা

উম্মে মাবাদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:১১ ২২ জুন ২০২১   আপডেট: ১২:১২ ২২ জুন ২০২১

শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে ফেলাই শ্রেয়। ছবি: সংগৃহীত

শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে ফেলাই শ্রেয়। ছবি: সংগৃহীত

শত্রু শুধু খারাপ মানুষের জন্যে নয়, ভালো মানুষের পিছনে আদিম যুগ থেকেই লেগে আছে। শত্রু থেকে মুক্তি পায়নি আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও।  তবে তিনি মহান।  তাই তার ভাবনা এবং আমাদের ভাবনার ফারাক ও আকাশ পাতাল।

বেশ ঐতিহাসিক একটি ঘটনা, এক ইহুদী বুড়ি রোজ মহানবীর যাওয়ার রাস্তায় কাটা বিছিয়ে রাখতেন। নামাজ পড়ার সময়, সিজদাহে গেলে উটের নাড়িভুরি চাপিয়ে দিতেন।  অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন।  

একদা হঠাৎ তার অত্যাচার বন্ধ হয়ে গেলো। হুজুর পাক (সা.) চিন্তিত হয়ে তার বাড়ি গেলেন এবং দেখলেন, সে অসুস্থ, সেবা করার জন্যে কেউ নেই।  তখন নবী করিম (সা.) তার সেবা করে তাকে সুস্থ করে তুললেন  এবং সে মুসলমান হয়ে গেলো। 

বিদ্র: মহানবী শুধু বাণী দেননি, কাজেও দেখিয়ে গিয়েছেন যে, শত্রুদের সঙ্গে শত্রুতা নয়। বন্ধুত্ব দিয়েও শত্রুতা দমানো যায় এবং তাতেই রয়েছে প্রকৃত জয়।  

শত্রু হলে যে সব কথা মাথায় রাখতে হবে- 
১. নিশ্চয়, নমনীয় হয়ে যা করা যায়, রাগারাগি কিংবা বাড়াবাড়ি করে তা করা যায় না।  
২.  ধৈর্যশীলকে আল্লাহ তায়ালা উত্তম প্রতিদান দান করে।  
৩. মুসলমানদের শানে শত্রুটা মানায় না।
৪. শত্রুতা বাধিয়ে কারও বা নিজের খতি করার চেয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা শ্রেয়।  
৫. আপনি আজ শত্রুতা করে বেচেঁ গেলেন, 
কিন্তু বিপদের আশংকা থেকে যাবে আপনার পরিবারের উপর। তাই শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে ফেলাই শ্রেয়।

শত্রুতা কেনো হয়? 
জায়গা জমি, প্রেম কাহিনি, পরকীয়াসহ আরও নানান বিষয় নিয়ে শত্রুতা হতে পারে।  তবে বুদ্ধিমানের কাজ, যে কারণেই হোক, শত্রুতা এড়িয়ে চলা।  কারণ! শত্রুতা অনেক ভয়ংকর। সাধু সন্যাসি মানুষকে খুনিও করে ফেলতে পারে শত্রুতা। মনে প্রতিশোধের আগুন যার জ্বলে, সে অন্ধ হয়ে যায়, বুকে থাকে প্রতিশোধের নেশা।  কাজেই এই আগুন কারো বুকে জ্বালানো কিংবা নিজের বুকে পুষে রাখা মারাত্বক।  

শত্রুর সঙ্গে করণীয়  
শত্রু প্রভাবশালী হোক কিংবা গরীব। শত্রুকে ভয় করতে হবে। সর্বদা শত্রুকে দেখলে হেসে কথা বলতে হবে। সেটা না পারলেও অন্তত: তাকে উপহাস কিংবা হেয় করে তার প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া যাবে না।  যতদূর সম্ভব, ঝামেলা না করার চেষ্টা করতে হবে।   
শত্রুর সঙ্গে মনোমালিন্য দূর করার বেশ কিছু পদ্ধতি।  
১. যে কারণে শত্রুতা, যথাসম্ভব সেই কারণটি মিটিয়ে ফেলা।  
২. শত্রুর সঙ্গে যতদূর সম্ভব ভালো ব্যবহার করা।  
৩. শত্রুর পিছনে লেগে না থাকা, (শত্রুর উপর নির্যাতন করলে আল্লাহ মাজলুমের হয়ে আপনার উপর অসন্তুষ্ট হবে) 
৪. শত্রুকে অস্তর থেকে ভালোবাসতে চেষ্টা করা।  
৫. শত্রুকে উপহার দেওয়া 
৬. আপনি যে তার সব ত্রটিগুলো জেনেও তাকে ভালোবাসছেন, এই ব্যাপারটি তাকে বুঝানো। 

শত্রুর সঙ্গে বর্জনীয়  
কিছু কিছু সময় দেখা যায়, শত্রু মিলে যেতে চাইলেও লোকলজ্জায় মিলতে পারছে না, সে মুহূর্তে যদি আপনি তাকে আরও বেশি হেয় করেন, তাহলে নিজের অনিচ্ছায় শত্রু আবার আপনার সঙ্গে শত্রুতা শুরু করবে। কাজেই আপনি এসব কাজ বর্জন করে, উল্টো তার সঙ্গে মেলার চেষ্টা করুন। ফায়দা! সে মিলুক কিংবা না মিলুক। আপনার খতি করবেনা ইনশাআল্লাহ।  
১. তাকে দেখে আরেকদিক ফিরে হাঁটা। 
২. তার সঙ্গে কথা না বলা 
৩. তার নামে বদনাম করা।
৪. তার হক পালন না করা।
৫. তার সকল (গুনাহ ছাড়া) সুখ শাস্তি নষ্ট করে দেওয়া।  
৬. রাস্তা ঘাটে কিংবা কের সামনে তাকে অপমান করা। 

উপরোক্ত আমলগুলো পালন করে, আপনার শত্রু কোনো ঝামেলা ছাড়াই মন থেকে আপনার বন্ধুতে রুপান্নিত হবেন, ইনশাআল্লাহ। 

এ ছাড়াও শত্রু বাড়লে, আমল রয়েছে অনেক
যখন কোনো ব্যক্তির উপর, অনেক শত্রুদের নজর পড়ে এবং তার কিছুই করার থাকে না। তখন আশপাশের মানুষের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও, খোদার দরজা খুলে যায়। এছাড়া এই বিপদ থেকে বাঁচার জন্যে আল্লাহ তায়ালা আমাদের কিছু দোয়াও দিয়ে দিয়েছেন। এই আমলগুলো নিয়মিত করলে শত্রুমিত্রু সব দূর হয়ে যায়। 

সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যারা অটল ও অবিচল, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভালোবাসেন। দুনিয়াতে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে গেলে মানুষের বিপদ আপদ এসেই থাকে। বিপদ-মুসিবত মোকাবেলার পাশাপাশি সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার সাহায্য কামনা করা আবশ্যক। কারণ আল্লাহই বান্দাদের বিপদের সময় সাহায্য করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) দুশমনের দুশমনি থেকে আত্মরক্ষায় ন্যায় ও সত্যের পক্ষে কাজ করা নির্দোষ মানুষের জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করার জন্য হাদিসে বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছেন।

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো দল সম্পর্কে (শত্রুতার) ভয় করতেন, তখন বলতেন-উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্না নাঝ্আ’লুকা ফি নুহুরিহিম, ওয়া নাউ’জুবিকা মিং শুরূরিহিম। অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমরা তোমাকে শত্রুর মোকাবেলায় পেশ করছি, তুমিই তাদের দমন কর। আর তাদের অনিষ্ট থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই।’ (আবু দাউদ, মিশকাত)

যখন কোনো লোক, আপনার সঙ্গে যে কোনো ব্যাপারো শত্রুতা শুরু করবে, তখন আপনি তাকে দেখলে এড়িয়ে যাবেন না, কথা বলবেন, মহব্বত বাড়ানোর চেষ্টা করবেন। সে রাগ করবে, এমন কাজ করবেন না, এবং মনে মনে আল্লাহকে ডাকবেন, আর এই আমলগুলোর সঙ্গে সঙ্গে করণীয় এবং বর্জনীয় খেয়াল রাখবেন।  তবে হ্যাঁ, এটা সর্বদা মনে মনে রাখবেন, যে সে আপনার শত্রু, কাজেই তার কোনো চক্রান্তে পা দিবেন না। বরং তাকে ইসলামের আলোই আলোকিত করার চেষ্টা করুন।  ইনশাআল্লাহ আপনি সফল হবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে