লাইলাতুল কদরের সহজ ১২ আমল

ঢাকা, রোববার   ০৯ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৬ ১৪২৮,   ২৬ রমজান ১৪৪২

লাইলাতুল কদরের সহজ ১২ আমল

ধর্ম ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:১১ ৪ মে ২০২১   আপডেট: ১২:১৪ ৪ মে ২০২১

প্রতিটি মুসলমানের কাছে লাইলাতুল কদরে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মহাসম্মানিত হিসেবে পরিগণিত। ফাইল ছবি

প্রতিটি মুসলমানের কাছে লাইলাতুল কদরে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মহাসম্মানিত হিসেবে পরিগণিত। ফাইল ছবি

লাইলাতুল কদর মানে হচ্ছে মাহাত্মপূর্ণ বা সম্মানিত রাত। মহান আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মার জন্য হাজার মাসের চেয়েও উত্তম করেছেন লাইলাতুল কদরকে। এ রজনী এত সম্মানিত যে, এক হাজার মাস ইবাদত করলেও যে সওয়াব হতে পারে তার চেয়ে লাইলাতুল কদরের ইবাদতে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

পবিত্র রমজানে নাজাতের দশদিন গণনা শুরু আজ। আর সেই সঙ্গে লাইলাতুল কদর গণনাও শুরু হয়ে গেছে। এ রজনী রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে হাদিসে এসেছে। এ রাতগুলোতে যেসব আমল করতে পারেন-

১. তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া: লাইলাতুল কদরের প্রধান আমল হলো কিয়াম তথা নামাজে দণ্ডায়মান হওয়া। তাহাজ্জুদের সময়ে প্রতিটি রাতেই আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে এসে বান্দাদের ফরিয়াদ শোনেন। কোরআনে আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় হাবিব রাসুল (সা.) কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এবং রাত্রির কিছু অংশ তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, ইহা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থান-মাকামে মাহমুদে।’ (সুরা ১৭ ইসরা, আয়াত ৭৯)।

২. সুরা ইখলাস পাঠ করা: সুরা পবিত্র আল কোরআনের ১১২ নম্বর সুরা হচ্ছে আল ইখলাস। এর আয়াত সংখ্যা ৪, শব্দ সংখ্যা ১৫ ও অক্ষর ৪৭। এই সুরাতে আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও সত্তার সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা রয়েছে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, যার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই এই সুরা ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান।’’ [বুখারি, আস-সহিহ: ৫০১৩] অন্য হাদিসে এসেছে, ‘‘যে ব্যক্তি সূরা ইখলাস ১০ বার শেষ করবে, তার জন্য জান্নাতে আল্লাহ্ একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন।’’ [আলবানি, সিলসিলা সহিহাহ: ৫৮৯; হাদিসটি সহিহ]

৩. সুবহানাল্লাহ্, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ও আল্লাহু আকবার—প্রতিটি ১০০ বার করে মোট চারশ’ বার পড়া।

রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
* যে ব্যক্তি ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলবে, সে ১০০ ক্রীতদাস মুক্ত করার সওয়াব পাবে।
* যে ব্যক্তি ১০০ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ বলবে, সে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের জন্য ১০০ টি সাজানো ঘোড়ায় মুজাহিদ প্রেরণের সওয়াব পাবে।
* যে ব্যক্তি ১০০ বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে, সে ১০০টি মাকবুল (কবুলকৃত) উট কুরবানির সওয়াব পাবে।
* যে ব্যক্তি ১০০ বার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে, সে এত সওয়াব পাবে, যার ফলে আসমান ও যমিন পূর্ণ হয়ে যাবে। [ইবনে মাজাহ, আস-সুনান: ২/১২৫২; আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৬/৩৪৪; হাদিসটি হাসান]

৪. একটি গুরুত্বপূর্ণ তাসবিহ কমপক্ষে ১০০ বার পড়ার চেষ্টা করা।

উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদুহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়্যিন ক্বাদির। আল হামদু লিল্লাহি, ওয়া সুবহানাল্লাহি, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ।’

অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তারই, যাবতীয় প্রশংসা তাঁরই, তিনিই সবকিছুর উপর শক্তিমান। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যই, আল্লাহ পবিত্র, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ মহান, গুনাহ থেকে বাঁচার এবং নেক কাজ করার কোনো শক্তি নেই আল্লাহর তাআলার তাওফিক ছাড়া।`

৫. কদরের রাতের বিশেষ দোয়াটি মনোযোগের সঙ্গে পড়া। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি বুঝতে পারি, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তাহলে ওই রাতে কী বলবো?’ নবিজি বলেন, তুমি বলো—.আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউ-উন কারীম, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা ফু আন্নি। [আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৬/১৮২; হাদিসটি সহিহ]

৬. হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, এই দোয়া ইখলাছের সঙ্গে পাঠ করলে সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ গুনাহ থাকলেও তা মাফ হয়ে যাবে। ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুমু, ওয়া আতুবু ইলাইহি।’ অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নাই, তিনি চিরঞ্জীব ও চিরন্তন; এবং আমি তার কাছে ফিরে আসি। (তিরমিজি, আবু দাউদ)

৭. বেশি বেশি সাইয়িদুল ইসতিগফার পড়া। হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে দিনের শুরুতে সাইয়িদুল ইসতিগফার পাঠ করবে, সে ওই দিনে ইন্তেকাল করলে জান্নাতি হবে, আর যদি সন্ধ্যায় পাঠ করে এবং এ রাতেই তার ইন্তেকাল হয়, তাহলে সে জান্নাতি হবে। (বুখারি : ৬৩০৬)

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা আন্তা রাব্বী লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আলা-আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতা-তু, আউযুবিকা মিন শাররি মা সানাতু আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়া ওয়া আবুউ বিযামবি ফাগফিরলি ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনুবা ইল্লা আনতা’।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি আপনার গোলাম। আমি আপনার ওয়াদা-প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আমি আমার ওপর আপনার অনুগ্রহ স্বীকার করছি। আবার আমার গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করে দিন। কারণ, আপনি ব্যতীত আর কেউ গুনাহসমূহ ক্ষমা করতে পারবে না।

৮. নিজের জন্য দোয়া করবেন এ রাতে। এছাড়া বাবা-মা এবং যেকোনো জীবিত ও মৃত মুসলিমের জন্য দোয়া করা উত্তম।

৯. গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপক অর্থবোধক একটি দোয়া বেশি করে পড়া। উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল ‘আ-ফিয়াতা ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আ-খিরাহ। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। [বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ: ১২০০; হাদিসটি সহিহ].

১০ উম্মে সালামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পড়তেন, তা হলো– ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব- সাব্বিত কালবি আলা দিনিক।[তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৫২২; হাদিসটি হাসান].

১১. কিছু দান-সদাকাহ্ করা। যদি সম্ভব হয়, তবে রাতেই করুন। এটাই উত্তম। এক টাকা দান করলে হাজার মাস ধরে এক টাকা দান করার নেকি পাবেন। এই রাতের প্রতিটি আমল এভাবেই বৃদ্ধি পাবে। কারণ আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ‘‘কদরের রাতটি (মর্যাদার দিক থেকে) হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’’ [সুরা ক্বাদর, আয়াত: ০৩]

১২. বেশি করে দরুদ পড়বেন রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর। শ্রেষ্ঠ দরুদ সেটিই, যা আমরা নামাজের শেষ বৈঠকে পড়ি।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে ইবাদাত-বন্দেগির জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এ ইবাদাত-বন্দেগি করতে হবে সঠিক পন্থায়। বেশি বেশি আমল করতে গিয়ে কোয়ালিটির দিকে উদাসীন হবেন না। আল্লাহর কাছে আন্তরিকতাপূর্ণ আমলের মূল্য অনেক বেশি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে