তারাবির রাকাআত সংখ্যা ও জরুরি কিছু মাসয়ালা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৪ ১৪২৮,   ২৩ রমজান ১৪৪২

তারাবির রাকাআত সংখ্যা ও জরুরি কিছু মাসয়ালা

শরীফ আব্দুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৮ ১৭ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৪:২০ ১৭ এপ্রিল ২০২১

রমজান মাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো তারাবির নামাজ।ছবি: সংগৃহীত

রমজান মাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো তারাবির নামাজ।ছবি: সংগৃহীত

রমজান মাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো তারাবির নামাজ। তারাবির রাকাআত সংখ্যা শরিয়তের বিশুদ্ধ দলিল-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত। গ্রহণযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বিশ রাকাআত তারাবি পড়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের আমলও তদ্রুপ ছিল।  

কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশ রাকাআত তারাবি বিষয়ক হাদিসটিকে সূত্রের বিচারে অনির্ভরযোগ্য প্রমাণ করলেও বিশুদ্ধ সূত্রে সাহাবায়ে কেরামের আমলই প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহাবায়ে কেরাম বিশ রাকাআতের শিক্ষা পেয়েছেন। আমিরুল মুমিনীন হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকাল থেকে অবিচ্ছিন্ন কর্মধারায় এখন পর্যন্ত মক্কা শরিফের মসজিদুল হারাম ও মদিনা শরিফের মসজিদে নববীসহ সকল মসজিদে বিশ রাকাআত তারাবি পড়া হয়। এ দীর্ঘ সময়ে কোথাও আট রাকাআত তারাবির প্রচলন ছিল না।

সর্বপ্রথম ১২৮৪ সালে ভারতবর্ষের আহলে হাদিস আলেম আট রাকাআতের ফতোয়া দিয়ে উম্মাহের ঐক্যমত্যপূর্ণ মাসয়ালায় বিভক্তি সৃষ্টি করেন। তখন অন্যান্য আহলে হাদিসরাও তার বিরোধিতা করেছে। অতঃপর আরবের কতিপয় বিচ্ছিন্ন আলেমও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কিন্তু আরব বিশ্বের আলেমদের বেশিরভাগই বিশ রাকাআত তারাবির আদায় করেন।

হজরত উমর (রা.)-এর যুগে সাহাবিদের আমল

১. ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা (রহ.) বলেন, সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে রমজান মাসে বিশ রাকাআত তারাবি পড়তেন। তিনি আরো বলেন যে, তারা নামাজে শতাধিক আয়াতবিশিষ্ট সুরাসমূহ পড়তেন এবং হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে দীর্ঘ নামাজের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠিসমূহে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। -আস সুনানুল কুবরা ও বাইহাকি, ২/৪৯৬/৪২৮

অপর সূত্রে সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, আমরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে বিশ রাকাআত এবং বিতর পড়তাম। -আস সুনানুল কুবরা, বাইহাকি- ১/২৬৭-২৬৮

২. তাবেঈ ইবনে আবি যুবাব (রহ.) বলেন, হজরত উমর (রা.)-এর যুগে রমজানের কিয়াম তথা তারাবি ছিল ২৩ রাকাআত। -মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৭৩৩। হাদিসটির সূত্র বিশুদ্ধ। এতে ২৩ রাকাআত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ২০ রাকাআত তারাবি ও তিন রাকাআত বিতর।

৩. তাবেঈ আবদুল আজিজ ইবনে রুফাই (রহ.) বলেন, উবাই ইবনে কাব (রা.) রমজানে মদিনায় লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত তারাবি এবং তিন রাকাআত বিতর পড়তেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৬

৪. তাবেঈ ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারি (রহ.) বলেন, উমর (রা.) এক ব্যক্তিকে আদেশ করেন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত পড়েন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৪

৫. তাবেঈ ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রহ.) বলেন, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে লোকেরা রমজানে তেইশ রাকাআত পড়তেন। -মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ৩৮০

হজরত আলী (রা.)-এর যুগে সাহাবিদের আমল

বিখ্যাত তাবেঈ ইমাম আবু আবদুর রহমান সুলামি (রহ.) বলেন, আলী (রা.) রমজানে হাফেজদের ডাকেন এবং তাদের একজনকে লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাআত পড়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি বলেন, আলী (রা.) তাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। -সুনানুল বাইহাকি: ২/৪৯৬-৪৯৭/৪২৯১

তাবেঈ আবুল হাসনা (রহ.) বলেন, আলী (রা.) এক ব্যক্তিকে আদেশ করেন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত তারাবি পড়েন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৩

উপরোক্ত বর্ণনাগুলোসহ আরও অন্যান্য বর্ণনাসমূহ এবং সাহাবি-তাবেঈনের সর্বসম্মতিক্রমে আমলের ভিত্তিতে এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা সম্মিলিত অবিচ্ছিন্ন কর্মের ভিত্তিতে আলেমদের অভিমত হলো বিশ রাকাআত তারাবি সুন্নতে মোয়াক্কাদা। বিনা ওজরে এর কম পড়লে সুন্নতে মোয়াক্কাদা ছেড়ে দেয়ার গোনাহ হবে।

যারা বর্তমানে আট রাকাআত তারাবির প্রচার করছে, তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হলো বোখারি শরিফের একটি হাদিস, যা আসলে তারাবি সম্বন্ধে নয়, বরং ওই হাদিসটি হলো তাহাজ্জুদ সংক্রান্ত একটি হাদিস। তাতে বর্ণিত হয়েছে, রমজানে ও রমজানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (সা.) চার রাকাআত করে আট রাকাআত পড়তেন। অথচ আমরা জানি, রমজানের বাইরে কোনো তারাবি নেই এবং তারাবির নামাজ হলো দু’রাকাআত করে। যদি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে আট রাকাআতই প্রমাণিত হতো, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ করে বিশ রাকাআত পড়তেন না। নাউজুবিল্লাহ!

তারাবির মাসায়ালা

মাসয়ালা: বিশ রাকাআত তারাবির নামাজ বালেগ পুরষ-মহিলা সবার ওপর সুন্নতে মোয়াক্কাদা। অসুস্থ ও রুগী ব্যক্তির ওপর তারাবি জরুরি নয়, তবে কোনো কষ্ট না হলে তাদেরও পড়া মুস্তাহাব। -রদ্দুল মুহতার: ১/৭৪২

মাসয়ালা: তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করা মুস্তাহাব, একাকি আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ১/২৯০

মাসয়ালা: কারো যদি তারাবির জামাত থেকে কিছু রাকাআত ছুটে যায় তাহলে বেতরের নামাজের পর তা পড়ে নিবে। -রদ্দুল মুহতার: ২/৪৪

মাসয়ালা: নাবালেগ হাফেজের পিছনে বালেগ পুরুষ নারী কারো জন্যই ইক্তিদা করা বৈধ নয়। -মাজমাউল আনহুর: ১/১৬৭, হেদায়া: ১/২৩৮, আল বাহরুর রায়েক: ১/৩৫৯

খতমে কোরআনের কতিপয় মাসয়ালা 

মাসয়ালা: ফরজ, নফল বা তারাবি যে নামাজেই প্রত্যেক সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ নিঃসন্দেহে পড়া সুন্নত। তবে বিসমিল্লাহ নিঃশব্দে পড়া সুন্নত। তাই তারাবির নামাজেও খতমে কোরআনের সময় প্রত্যেক সূরার শুরুতে নিঃশব্দে পড়া সুন্নত। তবে যেহেতু বিসমিল্লাহর রাহমানির রাহিমও কোরআনের একটি আয়াত; তাই মুসল্লিদের খতম পূর্ণ হওয়ার জন্য যেকোনো সুরার শুরুতে বিসমিল্লাহ স্বশব্দে পড়ে নিলে সবার খতম পূর্ণ হয়ে যাবে। প্রতি সুরার শুরুতে বিসমিল্লাহ স্বশব্দে পড়লেও কোনো সমস্যা নেই। উভয়ের ওপর আমল করার অবকাশ আছে। -রদ্দুল মুহতার: ১/৪৯০

মাসয়ালা: ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে নামাজের ভেতর লোকমা দেয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করা উচিত এবং ইমাম সাহেবের জন্য লোকমার অপেক্ষা না করে অন্য আয়াত পড়ে নামাজ শেষ করা উচিত। লোকমা দেয়ার সঠিক পদ্ধতি হলো- প্রথমে ইমাম সাহেবকে আয়াত পুনরাবৃত্তির সুযোগ দেয়া, এতদসত্ত্বেও ইমাম সাহেব শুধরে নিতে না পারলে সেক্ষেত্রে মুক্তাদি লোকমা দিলে কোনো ক্ষতি হবে না। তারাবি নামাজে খতমে কোরআনে যদি হাফেজ সাহেব লোকমার অপেক্ষা না করে, তাহলে লোকমা না দিলে কোনো অসুবিধা হবে না। তবে ভুলে যাওয়া আয়াত পরবর্তীতে সুরা ফাতেহার পর পড়ে নিতে হবে। -রদ্দুল মুহতার: ১/৬২৩

তারাবির নামাজে ভুল করলে
তারাবির নামাজে দ্বিতীয় রাকাআতে না বসে দাঁড়িয়ে গেলে তৃতীয় রাকাআতে সিজদা করার পূর্বে স্মরণ হলে বসে তাশাহহুদ ও সেজদায়ে সাহু আদায় করলে তেলাওয়াত ও নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। যদি তৃতীয় রাকাআতে সিজদা করে ফেলে, তবে চতুর্থ রাকাআত মিলিয়ে নিবে। এতে শেষের দুই রাকাআত তারাবির নামাজ হিসেবে ধর্তব্য হবে এবং শেষ বৈঠক না করার কারণে প্রথম দুই রাকাআত তারাবি হিসেবে গণ্য না হওয়ায় তেলাওয়াতসহ পুনরায় পড়তে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ১/২৮৯, রদ্দুল মুহতার: ২/৩৫, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১১৮

যদি কোনো ব্যক্তি তারাবির নামাজ চার রাকাআতের নিয়ত করে শুরু করে এবং ভুলে দুই রাকাআতের পর বৈঠক না করে চার রাকাআত শেষ করেই বৈঠক করে, তাহলে সে যদি নামাজ শেষে সেজদায়ে সাহু করে থাকে, তবে শুধু শেষের দুই রাকাআত তারাবি হিসেবে গণ্য হবে। -আল বাহরুর রায়েক: ২/১১৭

বসে তারাবির নামাজ 
মাটিতে বসে রুকু-সেজদার মাধ্যমে তারাবি নামাজ বৈধ। অনুরূপ তারাবির কেরাতের সময় চেয়ারে বসে রুকু সেজদা নামাজের নিয়মমাফিক আদায় করলে তাও বৈধ। কিন্তু বিনা ওজরে এরূপ করলে নামাজের পূর্ণ সওয়াব পাবে না, বরং অর্ধেক সওয়াব পাবে। তবে হ্যাঁ, নিয়মমাফিক রুকু সেজদায় সক্ষম ব্যক্তি চেয়ারে বসে ইশারায় রুকু সেজদার মাধ্যমে নামাজ পড়লে নামাজ শুদ্ধ হবে না। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১১৮

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে