কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও ফজিলত (শেষ পর্ব)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও ফজিলত (শেষ পর্ব)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৮ ১ এপ্রিল ২০২১  

কোরআন অধ্যয়নকারীকে আল্লাহ স্বরণ করেন ছবি: সংগৃহীত

কোরআন অধ্যয়নকারীকে আল্লাহ স্বরণ করেন ছবি: সংগৃহীত

আল-কোরআন এসেছে বিশ্ব মানবতাকে হিদায়াতের সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদের্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সূরা আল-বাকারা-১৮৫) হিদায়াতের এই কিতাব আল-কোরআন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ করা হয়েছে। 

মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এসকল নবী-রাসূলদেরকে গাইডবুক হিসেবে সহীফা ও কিতাব দিয়েছেন। এসব কিতাব সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কিতাব হচ্ছে আল-কোরআন। 

কোরআন অধ্যয়নকারীকে আল্লাহ স্বরণ করেন 
এই পৃথিবীতে সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে আল-কোরআন অধ্যয়ন করা এবং সে অনুযায়ী জীবনে আমল করা। যারা দুনিয়ায় আল-কোরআন অধ্যয়ন করবে, জেনে-বুঝে আমল করবে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাদেরকে স্বরণ করবেন এবং এই কোরআনের সংস্পর্শে থাকার কারণে তাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিবেন। 

এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আবু যার গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি একটি লম্বা হাদীস বর্ণনা করলেন। আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আামকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। কেননা ইহা তোমার সমস্ত আমলকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করবে। (আবু যার গিফারী বলেন) আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনি আমাকে আরো অতিরিক্ত কিছু উপদেশ দিন। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি কোরআন তিলাওয়াত করবে এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্বরণ করবে, তাহলে আসমানে তোমাকে স্বরণ করা হবে এবং দুনিয়ায় এটা তোমার জন্য আলোকবর্তিকা হবে।’ (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান)

তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আল-কোরআন অধ্যয়ন করা এবং আল-কোরআনের শিক্ষা মেনে চলা। এর মাধ্যমে পরিবার, সমাজ আলোকিত হবে এবং জাহিলিয়াতের অন্ধকার দূরীভূত হবে।

আল-কোরআনের সম্মোহনি শক্তি
আল-কোরআন যাতে মানুষ মেনে চলতে না পারে সেজন্য প্রথম যুগ থেকেই মক্কার কাফেররা কোরআন শ্রবণ থেকে মানুষদেরকে বিরত রাখার চেষ্টা করতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আর কাফিররা বলে, ‘তোমরা এ কোরআনের নির্দেশ শুন না এবং এর আবৃত্তিকালে শোরগোল সৃষ্টি কর, যেন তোমরা জয়ী হতে পার।’ (সূরা হা-মীম- আস-সাজদা-২৬)

কাফেরদের বাধাঁ অতিক্রম করে মক্কার সাধারণ মানুষ আল-কোরআনের তিলাওয়াত শুনতো এবং ইসলামের দিকে ধাবিত হতো। বর্ণিত আছে, একদা হজরত ওমর (রা.) বাইতুল্লাহর পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন সে সময় রাসূল (সা.) নামাজের মধ্যে কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন, তাঁর মধুর তিলাওয়াত শুনে ওমর মনে মনে ভাবছে মুহাম্মদ কি কবি হয়ে গিয়েছে নাকি? এসময় রাসূল (সা.) তিলাওয়াত করলেন, ‘আর এটি কোনো কবির কথা নয়। তোমরা কমই বিশ্বাস কর।’ (সূরা হাক্কাহ- ৪১)

ওমর কোরআনের এ আয়াত শুনে মনে মনে ভাবলেন, মুহাম্মদ আমার মনের কথা কীভাবে জানলো, তাহলে কি মুহাম্মদ গণক? এসময় রাসূল (সা.) তিলাওয়াত করলেন, ‘আর এটা কোন গণকের কথাও নয়। তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ কর।’ (সূরা হাক্কাহ- ৪২) একথা শুনে ওমর হতবাক হয়ে ভাবছে এটা কবির কথা নয়, আবার গণকের কথা নয়, তাহলে মুহাম্মদ যেটা তিলাওয়াত করছে এটা কি? এমন সময় রাসূল (সা.) তিলাওয়াত করলেন, ‘এটি জগতসমুহের রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।’ (সূরা হাক্কাহ- ৪৩) এর পরেই হযরত ওমর ইসলামের আলোতে আলোকিত হয়ে রাসূল (সা.) এর কাছে এসে ইসলামে দিক্ষিত হন।

কোরআনের একটি আয়াত হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে
আল-কোরআন শিক্ষা করা এবং সেটা মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়া মুসলিম উম্মাহর উপরে ফরজ করে দেয়া হয়েছে। এজন্য আল-কোরআন সঠিকভাবে অধ্যয়ন করে জানতে হবে এবং সে শিক্ষা সমাজের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আল-হাদীসে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনে ‘আস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে জনগণকে (আল্লাহর বিধান) পৌঁছে দাও, যদিও সেটা একটি আয়াত হয়। বনী-ইসরাইল থেকে (শিক্ষনীয় ঘটনা) বর্ণনা করতে পার, তাতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত-ভাবে আমার প্রতি মিথ্যা (বা জাল হাদিস) আরোপ করল, সে যেন নিজ আশ্রয় জাহান্নামে বানিয়ে নিলো।’ (সহীহ আল-বুখারী)

এটার মাধ্যমে আমাদের জন্য শিক্ষা হচ্ছে আল-কোরআন জানতে হবে এবং আল-কোরআনের শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বীনের এই দাওয়াত আল্লাহ আমাদের উপরে ফরজ করে দিয়েছেন। আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।’ (সূরা  আলে-ইমরান-১০৪)

আল-কোরআন অমান্যকারীর পরিণতি 
কোরআনের আয়াত অনুধাবন করে এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবন প্ররিচালনা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে অবধারিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তায়ালা রয়েছে?” (সূরা মুহাম্মদ-২৪) এ আয়াত আমাদেরকে বলে দিচ্ছে কোরআন অধ্যয়ন করে এর থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে হবে। তাহলে কোরআনের হক আদায় হবে এবং আল্লাহ এর প্রতিদান দিবেন। আর যারা দুনিয়ার জীবনে কোরআন মেনে চলবে না, বরং কোরআনকে অবজ্ঞা করে চলবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে অন্ধ করে উঠাবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য  হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন?’  (সূরা ত্বহা- ১২৪-১২৬)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি এখানে (কোরআনের অনুসরণে) অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট।’ (সূরা বনি ইসরাইল-৭২)

তাই একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আল-কোরআন জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমাদের সঙ্গে থাকবেন। 

শেষ জামানায় কোরআনের আমল থাকবে না 
রাসূল (সা.) ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটা সময় আসবে যখন আল-কোরআনের তিলাওয়াত থাকবে কিন্তু কোরআনের আমল সমাজের মানুষের মধ্যে থাকবে না। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে মনে হয় সেই সময় চলে এসেছে। এখন সারা পৃথিবীতে কোরআনের তিলাওয়াত আছে কিন্তু কোরআনের আমল নেই, কোরআনের হুকুম সমাজে বাস্তবায়ন নেই।

এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ভবিষ্যতে মানুষের সামনে এমন একটা যুগ আসবে যখন নাম ব্যতিরেকে ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, আল-কোরআনের আক্ষরিক তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাদের মসজিদ গুলো হবে বাহ্যিক দিক দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ। তবে প্রকৃতপক্ষে তা হবে হেদায়াত শূণ্য। আর তাদের আলেমরা হবে আকাশের নিচে জমিনের উপরে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ তাদের মধ্য থেকে ইসলাম/দ্বীন সম্পর্কে ফিতনা প্রকাশ পাবে। অতঃপর সেই ফিতনা তাদের দিকেই প্রত্যাবতন করবে।’ (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান অধ্যায়)

বর্তমান সময়ের মুসলামানগণ এই কোরআনকে তিলাওয়াত সর্বস্ব কিতাবে পরিণত করেছি। এ কথার দ্বারা এটা মনে করার সুযোগ নেই যে, কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। বরং কোরআন তিলাওয়াত করলে আপনি অবশ্যই প্রতি হরফে ১০টি করে নেকি পাবেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন,  ‘যে ব্যক্তি আল-কোরআন তিলাওয়াত করবে প্রতিটি হরফের তার জন্য রয়েছে ১০টি করে সওয়াব।’ (আল-বুরহান ফি উলুমিল কোরআন)

তবে কোরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সে অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করা, পরিবার ও সমাজ পরিচালনা করাই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। যদি আমি এই উদ্দেশ্য ভুলে শুধু তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকি অথচ আল-কোরআন সমাজে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা না করি তাহলে এটা তিলাওয়াত সর্বস্ব হিসেবে গণ্য হবে।

পরিশেষে বলা যায়, আল-কোরআনের হক হচ্ছে তাকে তিলাওয়াত করতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে, বাস্তব জীবনে কোরআনের বিধান মেনে চলতে হবে। কারণ এই আল-কোরআনই কিয়ামতের দিন আপনার-আমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল-কোরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে।’ (আহকামুশ-শরীয়াহ) তাই আসুন আমরা সবাই আল-কোরআন শিক্ষা করি এবং কোরআন অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে