কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও ফজিলত (২য় পর্ব)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও ফজিলত (২য় পর্ব)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২২ ৩১ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১২:২৯ ৩১ মার্চ ২০২১

কোরআন শেখা এবং তার আলোকে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা করা একজন মুসলমানের প্রধান দায়িত্ব

কোরআন শেখা এবং তার আলোকে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা করা একজন মুসলমানের প্রধান দায়িত্ব

মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এসকল নবী-রাসূলদেরকে গাইডবুক হিসেবে সহীফা ও কিতাব দিয়েছেন। এসব কিতাব সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কিতাব হচ্ছে আল-কোরআন। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপরে ঈমান আনা এবং আল-কোরআনকে মেনে চলা মুসলিমদের উপরে আল্লাহ তায়ালা ফরজ করেছেন। 

আল-কোরআন এসেছে বিশ্ব মানবতাকে হিদায়াতের সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘রমযান মাস, যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদের্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সূরা আল-বাকারা-১৮৫) হিদায়াতের এই কিতাব আল-কোরআন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ করা হয়েছে। 

আল-কোরআন শিক্ষা করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনার আজ থাকছে ২য় পর্ব-

আল-কোরআনের মধ্যে রয়েছে সকল সমস্যার সমাধান 
বিশ্ব মানবতার জীবন পরিচালনার জন্য যা দরকার আল্লাহ তায়ালা আল-কোরআনের মধ্যে সব দিয়ে দিয়েছেন। মানুষের জন্য এমন কিছু নাই যার প্রয়োজন আছে অথচ কোরআনে তা বলা হয়নি, বরং সব কিছুকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিস্কার করে আল-কোরআনে বলে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।’ (সূরা আন-নাহল- ৮৯) 

এ কিতাব থেকে যদি কেউ তার জীবনের চলার গাইড হিসেবে সম্পূর্ণটা মেনে চলে তাহলে সে সকল ক্ষেত্রে পূর্ণতা লাভ করবে। আর যদি কিছু মানে আবার কিছু অস্বীকার করে তাহলে সে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে।’ (সূরা আল-বাকারা- ৮৫)

তাই আমাদের উচিত আল-কোরআন শিক্ষা করা,কোরআনের সকল বিধান সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আল-কোরআন মেনে চলা, তাহলেই দুনিয়া ও পরকালীন জীবনে মুক্তি পাওয়া যাবে।

আল-কোরআনের আমলকারীর মর্যাদা 
আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.) এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত সকল বাতিল দ্বীনের উপরে দ্বীন ইসলামকে বিজয় করার জন্য। আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’ (সূরা আস-সফ-৯)

আল-কোরআন বিশ্ব মানব সভ্যতার দরবারে সবচেয়ে সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ কিতাব। এ কিতাবের আমলকারীকে এবং কিতাবের বিধান প্রতিষ্ঠাকারীকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং পরিবারের লোকদের জন্য জান্নাতের শুপারিশ করার অধিকার দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন অধ্যয়ন করবে এবং কোরআনকে প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করবে। কোরআনে বর্ণিত হালালকে হালাল হিসেবে মেনে নেবে, হারামকে হারাম হিসেবে মেনে নেবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং পরিবারের দশজনের জন্য সুপারিশ করার অধিকার দিবেন যাদের সকলের ব্যাপারে জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে গিয়েছিল।’ (সূনান আত-তিরমিযি)

পরকালীন জীবনে জান্নাত পাওয়ার জন্য এবং আল্লাহর কাছে উচ্চ মাকাম বা (উচ্চ মর্যাদা) পাওয়ার জন্য আমাদের সকলের আল-কোরআন অধ্যয়ন করা, নিজের জীবনে মেনেচলা এবং এই দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

আল-কোরআন শিক্ষার পথ হচ্ছে জান্নাতের পথ
আল-কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব এতই বেশি দেয়া হয়েছে যে, কুরআন শিক্ষার জন্য বা দ্বীন শিক্ষার জন্য যদি কেউ রাস্তায় বের হয় সে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে গেলো। এবং যতক্ষণ সে এ কাজ থেকে ফিরে না আসলো ততক্ষণ আল্লাহর রাস্তায় থাকলো। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দ্বীন শিক্ষা করার জন্য বের হলো, সে আল্লাহর রাস্তায় বের হলো যতক্ষণ না সে ফিরে আসলো।’ (সূনান আত-তিরমিযি)

দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের পথ হচ্ছে জান্নাতের পথ। তাই জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো ব্যক্তি রাস্তায় চলতে থাকলে এ পথে চলতে চলতে সে এক সময় জান্নাতের সন্ধান পেয়ে যাবে। আর এ পথে থাকা অবস্থায় যদি তার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে জান্নাত দিয়ে দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন পথে গমন করে; যাতে সে বিদ্যা অর্জন করে, আল্লাহ তাআালা তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন।’ (সহীহ মুসলিম ও তিরমিযী)

একাজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, আল-কোরআন শিক্ষার জন্য যেখানে যাওয়া প্রয়োজন যেতে হবে, যত কষ্টই হোক সে কষ্ট করতে হবে, এর পরেও আল-কোরআন শিক্ষা করতে হবে।

কোরআন বিহীন শরীর বিরান বাড়ির মত 
আল-কোরআন এসেছে বিশ্ব মানবতার জীবনকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করতে। সত্যের সন্ধান দেয়ার জন্য, অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য। তবে যে ব্যক্তি কোরআন অধ্যয়ন করবে না, কোরআনকে বোঝার চেষ্টা করবে না, কোরআন নিয়ে গবেষণা করবে না অর্থাৎ যে দেহের মধ্যে আল-কোরআনের আলো নেয় সেটা উজাড় বাড়ির মতো, ছাড়া বাড়ির মতো। একটা ছাড়া বাড়িতে যেমন সাপ, বিচ্ছু, তেলাপোকা ইত্যাদি পোকা-মাকড় বসবাস করে। ঠিক তেমনি যে দেহের মধ্যে কোরআন নেই সেই দেহে শয়তান বাস করে। আল-হাদীসে এর সমর্থনে বর্নিত হয়েছে, ‘হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যেই দেহের মধ্যে আল-কোরআনের কোনো শিক্ষা নেই সেই দেহটা হচ্ছে উজাড় বাড়ির মতো।’ (সূনান আত-তিরমিযি) 

আল-কোরআনের কথা সঠিক কথা
আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলদেরকে পৃথিবীতে পঠিয়েছিলেন সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আর আল-কোরআন হচ্ছে সেই ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার একমাত্র মানদ-। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,‘নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদ- নাযিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা হাদীদ-২৫)

আল-কোরআনই হচ্ছে সত্য কিতাব এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ বলেন, ‘এটি (আল্লাহর) কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।’ (সূরা আল-বাকারা-২) তাই সত্য কথা বলতে হলে, নেক আমল করতে হলে, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আল-কোরআন জানতে হবে, আল-কোরআন বুঝতে হবে, আল-কোরআনকে মেনে চলতে হবে, আল-কোরআন দিয়ে বিচার-ফয়সালা করতে হবে। তাহলে উত্তম প্রতিদান পাওয়া যাবে। 

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কোরআন দিয়ে যে কথা বলে সে সত্য কথা বলে, কোরআন থেকে যে আমল করে সে তার প্রতিদান পাবে, কোরআন দিয়ে যে বিচার-ফয়সালা করে সে ন্যায় বিচার করে এবং যে কোরআনের দিকে মানুষকে আহবান করে সে সঠিক পথের সন্ধান পায়।’ (সূনান আত-তিরমিযি)

তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, আল-কোরআন শিখে তার আলোকে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা করা, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সর্বপরি জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল-কোরআনকে মেনে চলা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে