পাপ মোচনকারী আমলসমূহ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৯ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ২৪ ১৪২৭,   ২৪ রজব ১৪৪২

২য় পর্ব

পাপ মোচনকারী আমলসমূহ

মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৪ ২৮ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:৩৪ ২৮ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গোনাহ এমন একটি বিষয়, যা একের পর এক করতে থাকলে মুমিন নারী-পুরুষের ঈমানী নূর নিভে যেতে থাকে। যা এক সময় তাকে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে। আর শয়তান সেটাই চায়। সে চায় আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাকে দ্বীনের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে তার পথে পরিচালিত করতে। এজন্য সে সদা একাজে নিয়োজিত থাকে। এর সঙ্গে আছে তার দোসর ও অসংখ্য মানবরূপী শয়তান, যারা আল্লাহর দেয়া শরীয়াত ও তাঁর আদেশ-নিষেধকে সর্বাবস্থায় অমান্য করতে থাকে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে? ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউই নিরাপদ  হ’তে পারে না’ (আ‘রাফ ৭/৯৯)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) পাপের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন, إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ فَإِنَّهُنَّ يَجْتَمِعْنَ عَلَى الرَّجُلِ حَتَّى يُهْلِكْنَهُ  ‘তোমরা তুচ্ছ-নগণ্য পাপ থেকেও বেঁচে থাক। কেননা তা যার মধ্যে একত্রিত হ’তে থাকবে তা তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে।’ (মুসনাদে আহমাদ; সহিহুল জামে‘ হা/২৬৮৭।

ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হিঃ) পাপের অশুভ পরিণতি ও তার বহুবিধ ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করেছেন, যা প্রত্যেক মুসলমানের জানা দরকার। যা পাপকর্ম থেকে বেঁচে থাকতে সহায়ক হবে। আজ থাকছে ২য় পর্ব। নিম্নে ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হলো- 

আরো পড়ুন: পাপ মোচনকারী আমলসমূহ ১ম পর্ব

জামাতের সঙ্গে সালাত আদায় করা

ওসমান ইবনু আফফান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি উত্তম রূপে ওজু করে ফরজ সালাতের জন্য পায়ে হেঁটে মসজিদে এসে ইমামের সঙ্গে সালাত আদায় করে তার গোনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়’।  (ইবনু খুযায়মাহ হা/১৪৮৯; সহিহহ আত-তারগীব হা/৩০০, ৪০৭, হাদিছ সহিহ)।

সালাতে সশব্দে আমিন বলা

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সা) বলেছেন, ‘ইমাম যখন আমিন বলে, তোমরাও তখন আমিন বলবে। কেননা যার আমিন বলা ফেরেশতাগণের আমিন বলার সঙ্গে মিলে যাবে তার পূর্বেকার গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে’।  (বুখারি হা/৭৮০; মুসলিম হা/৪১০; মিশকাত হা/৮২৫)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ (সালাতে) আমিন বলে এবং আকাশের ফেরেশতারাও আমিন বলেন। অতঃপর উভয়ের আমিন একই সঙ্গে হলে তার পূর্ববর্তী সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি হা/৭৮১; মুসলিম হা/৪১০)।

‘আললাহুম্মা রববানা ওয়ালাকাল হাম্দ’ বলা

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইমাম যখন সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ বলেন, তখন তোমরা আল্লাহুম্মা রাববানা লাকাল হাম্দ বলবে। কেননা যার এ উক্তি ফেরেশতার উক্তির সঙ্গে মিলে যাবে, তার পূর্বেকার সব গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’ (বুখারি হা/৭৯৬; আহমাদ হা/৯৯৩০)।

বেশি বেশি সিজদা করা

মাদান ইবনু আবু ত্বালহা আল-ইয়ামাবী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আযাদকৃত গোলাম সাওবানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। আমি বললাম, আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিন যা করলে আল্লাহ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। অথবা আমি তাকে প্রিয় ও পসন্দনীয় কাজের কথা জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তিনি চুপ থাকলেন। আমি পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তখনও চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর জন্য অবশ্যই বেশি বেশি সিজদা করবে। কেননা তুমি যখনই আল্লাহর জন্য একটি সিজদা করবে, মহান আল্লাহ এর বিনিময়ে তোমার মর্যাদা এক ধাপ বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার একটি গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন’। (মুসলিম হা/১১২১; তিরমিযী হা/৩৮৮; ইবনু মাজাহ হা/১৪২৩)।

আরো পড়ুন: আমানত রক্ষা করা ঈমানী দায়িত্ব, খেয়ানতকারীর জন্য ভয়ঙ্কর শাস্তি

জুমার দিন মনোযোগ সহকারে খুৎবা শ্রবণ করা ও সালাত আদায় করা

সালমান ফারিসী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে এবং যথাসাধ্য ভালোরূপে পবিত্রতা অর্জন করে ও নিজের তেল হতে ব্যবহার করে বা নিজ ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে। অতঃপর বের হয় এবং দু’জন লোকের মাঝে ফাঁকা করে না। অতঃপর তার নির্ধারিত সালাত (ইমাম খুৎবায় দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত যথাসাধ্য) আদায় করে এবং ইমামের খুৎবা দেয়ার সময় চুপ থাকে, তাহলে তার সে জুমা হতে অপর জুমার মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়’। (বুখারি হা/৮৮৩; মিশকাত হা/১৩৮১)।

ক্বিয়ামে রামাজান তথা তারাবিহ বা তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে রামাজান সম্পর্কে বলতে শুনেছি, مَنْ قَامَهُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘যে ব্যক্তি রামাজানে ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় ক্বিয়ামে রামাজান অর্থাৎ তারাবিহ বা তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করে তার পূর্ববর্তী গোনাহ সমূহ মাফ করে দেয়া হয়’। (বুখারি, হা/২০০৮)।

কদরের রাত্রিতে ইবাদত করা

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ. ‘যে ব্যক্তি রামাজানে ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াব লাভের আশায় ছিয়াম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াব লাভের আশায় লায়লাতুল ক্বদর (ক্বদরের রাত) জেগে সালাত আদায় করে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়’।  (বুখারি হা/২০১৪)।

হজ ও ওমরা একত্রে আদায় করা

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, تَابِعُوْا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّ الْمُتَابَعَةَ بَيْنَهُمَا تَنْفِى الْفَقْرَ وَالذُّنُوْبَ كَمَا يَنْفِى الْكِيْرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ ‘তোমরা হজ ও ওমরা পরপর একত্রে আদায় কর। কেননা এ হজ ও ওমরা দারিদ্র্য ও গোনাহ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়। একটি কবুল হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়’। (ইবনু মাজাহ, হা/২৮৮৭; তিরমিযী হা/৮১০ মিশকাত হা/২৫২৪-২৫, হাসান সহিহ)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ করল, যার মধ্যে সে অশ্লীল কথা বলেনি এবং অশ্লীল কার্য করেনি, সে হজ হতে ফিরে আসবে সেদিনের ন্যায় (নিষ্পাপ অবস্থায়), যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল’। (বুখারি হা/১৫২১)।

অসচ্ছল ও অভাবীকে অবকাশ দেয়া

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘জনৈক ব্যবসায়ী লোকদের ঋণ দেয়। কোনো অভাবগ্রস্তকে দেখলে সে তার কর্মচারীদের বলত, তাকে ক্ষমা করে দাও, হয়তো আল্লাহ তায়ালা আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। এর ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (বুখারি হা/২০৭৮; আহমাদ হা/৭৫৮২)।

হুযাইফাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করিম (সা.)-কে বলতে শুনেছি, مَاتَ رَجُلٌ، فَقِيلَ لَهُ قَالَ كُنْتُ أُبَايِعُ النَّاسَ، فَأَتَجَوَّزُ عَنِ الْمُوسِرِ، وَأُخَفِّفُ عَنِ الْمُعْسِرِ، فَغُفِرَ لَهُ ‘একজন লোক মারা গেল, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কি বলতে? সে বললো, আমি লোকদের সঙ্গে বেচা-কেনা করতাম। ধনীদেরকে অবকাশ (সুযোগ) দিতাম এবং গরীবদেরকে হ্রাস (সহজ) করে দিতাম। কাজেই তাকে মাফ করে দেয়া হয়।’ (বুখারি হা/২৩৯১)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক ব্যক্তির রূহের সঙ্গে ফেরেশতা সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কোনো নেক কাজ করেছ? লোকটি উত্তর দিল, আমি আমার কর্মচারীদের আদেশ করতাম যে, তারা যেন অসচ্ছল ব্যক্তিকে অবকাশ দেয়। রাবী বলেন, রাসূল (সা.) বললেন, অতঃপর তাকে ক্ষমা করে দেয়া হলো।’ (বুখারি হা/২০৭৭)।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে