কারো মনে আঘাতকারী প্রকৃত মুমিন নয় 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১৪ ১৪২৭,   ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

২য় পর্ব

কারো মনে আঘাতকারী প্রকৃত মুমিন নয় 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৩ ১২ জানুয়ারি ২০২১  

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

হযরত আবু মুসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, প্রকৃত মুসলমান সে, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। অর্থাৎ না তার মুখে কেউ কষ্ট পায় না তার হাতে। 

এ হাদিসে রাসূল (সা.) মুসলমানদের পরিচয় দিয়েছেন। যা মধ্যে এ গুণ পাওয়া যাবে সেই প্রকৃত মুসলমান। অতএব যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে না সে মুসলমান বলার উপযুক্ত নয়। যে ব্যক্তি নামায পড়ে না তাকে যেমন কোনো মুফতি কাফের হওয়ার ফতওয়া দেয় না, বলে না-সে কাফের হয়ে গেছে, তবে সে মুসলমান বলার উপযুক্ত নয়। কারণ সে আল্লাহ প্রদত্ত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরয আদায় করেনি। এমনিভাবে যে ব্যক্তির মুখ ও হাতে অন্য মানুষ কষ্ট পায়, যদিও কোনো মুফতি তাকে কাফের বলবে না তবে সে প্রকৃত মুসলমান বলার উপযুক্ত নয়। কারণ সে মুসলমানের কাজ করছে না।

প্রথম পর্বের পর... 

চিন্তা করে কথা বলো  
ঠাট্টা করার পূর্বে সামান্য চিন্তা করে নাও। আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি, তার ফলাফল কী হবে? অন্যের উপর তার কী প্রভাব পড়বে? এটাও চিন্তা করো- আমি যে কথা অন্যকে বলতে চাচ্ছি অন্য কেউ যদি সে কথাটি আমাকে বলে কেমন লাগবে আমার? ভালো লাগবে না মন্দ লাগবে? রাসূল (সা.) আমাদের এ শিক্ষা দিয়েছেন- নিজের জন্য যা পছন্দ কর অন্যের জন্য তা-ই পছন্দ করো।  

মুখ একটি বড় নেয়ামত  
এ জবান আল্লাহ তায়ালার একটি বড় নেয়ামত। যা আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ফ্রি দিয়েছেন। তার মূল্য আদায় করতে হয় না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ সরকারি মেশিন চলছে। ‘আল্লাহ না চাহে’ যদি এ নেয়ামত ছিনিয়ে নেয়া হয় তখন জানা যাবে এ নেয়ামতের মূল্য কত! যদি প্যারালাইসিস হয়ে যায়, জবান বন্ধ হয়ে যায়, বলতে চায়, মনের ভাব অন্যের কাছে ব্যক্ত করতে চায়, জবান চলে না। ব্যক্ত করতে পারে না। তখন জানা যাবে এ বাকশক্তি কত বড় নেয়ামত। আমরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একে কেঁচির মতো ব্যবহার করছি। চিন্তা করি না মুখ থেকে কি শব্দ বের হচ্ছে। এ পদ্ধতি ঠিক নয়। সঠিক পদ্ধতি হলো- প্রথমে চিন্তা করো, তারপর বলো। যদি এভাবে আমল করতে পারি, তাহলে এ জবান আমাদের জন্য যে দোজখের উপকরণ তৈরি করছে তা ইনশাআল্লাহ বেহেশতের গমনের উপকরণ তৈরি করবে এবং আখেরাতে সওয়াবের ভাণ্ডার জমাকারী হয়ে যাবে। 

চিন্তা করে বলার অভ্যাস গড়তে হবে   
এক হাদিসে নবী কারীম রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, সর্বাধিক মুখ থুবড়ে মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপকারী জিনিস হলো জবান। এ জন্য যখনই জবান ব্যবহার কর, একটু চিন্তা করে নাও। কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- তবে কি মানুষ কথা বলার পূর্বে ৫ মিনিট চিন্তা করবে? এরপর মুখ থেকে বের করবে? তখন তো বেশ সময় ব্যয় হয়ে যাবে। আসল কথা হলো, মানুষ যদি শুরুতে চিন্তা করে কথা বলার অভ্যাস করে, তাহলে আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাবে। এরপর চিন্তা করতে সময় লাগবে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কোন কথা মুখে বলবে আর কোনটা বলবে না। এরপর আল্লাহ তায়ালা মুখে ভারসাম্য সৃষ্টি করে দেন। ফলে মুখ থেকে শুধু সত্য কথাই বের হয়। ভুল ও যে কথা আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে এবং অন্যকে কষ্ট দেয়-বের হবে না। সরকারি মেশিন নিয়ম-নীতির সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়- এ অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত এভাবে চিন্তা করবে। 

অমুসলিমদেরকেও কষ্ট দেয়া জায়েজ নেই  
হাদিসে বলা হয়েছে- ‘মুসলমান সে যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ মানুষ কখনো এটা বুঝতে পারছে না এ হাদিসে শুধু মুসলিমদেরকে কষ্ট থেকে রক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব অমুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়া থেকে নিষেধাজ্ঞা এ হাদিসে নেই। এ কথা ঠিক নয়। কারণ হাদিসে মুসলমান উল্লেখ করার কারণ হলো- মুসলমান যে পরিবেশে বাস করে সাধারণত সেখানে মুসলমানদের সঙ্গেই উঠাবসা হয়। এই জন্য বিশেষভাবে মুসলমানদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যথায় এ নির্দেশ মুসলমান অমুসলমান সকলের জন্য সমান। কোনো অমুসলিমকেও নিরাপত্তাকালে কষ্ট দেয়া জায়েজ নেই। তবে যদি কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে, যুদ্ধ তো তাদের শক্তি খর্ব করার একটি মাধ্যম। এতে তাদেরকে কষ্ট দেয়া জায়েজ আছে। আর যে সকল কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ চলে না, তাদেরকে কষ্ট দেয়া জায়েজ নেই।

না জায়েজ হওয়ার প্রমাণ  
হযরত মূসা (আ.) ফেরাউনের রাজত্বে মিশরে অবস্থান করছিলেন। হযরত মূসা (আ.) ছাড়া পুরো জাতি কুফুর ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল। সেই সময়কার ঘটনা-এক ইসরাঈলী ও কিবতীর মধ্যে ঝগড়া হয়ে গেল। মূসা (আ.) কিবতীকে একটি ঘুষি মারলেন। ফলে তার মৃত্যু হয়ে গেল। কিবতী যদিও কাফের ছিল, তবে হযরত মূসা আ. এ মৃত্যুকে নিজের জন্য গুনাহ সাব্যস্ত করে বলেন- তাদের জন্য আমার একটি গুনাহ হয়ে গেল। যে কারণে আমার আশংকা হয় আমি তাদের কাছে গেলে তারা আমাকে হত্যা করবে।

হযরত মূসা আ. এ কাফেরের হত্যাকে গুনাহ দ্বারা ব্যক্ত করেছেন। এখন প্রশ্ন জাগে সে তো কাফের ছিল। আর হত্যা করা জিহাদের একটি অংশ। তবুও তিনি একে গুনাহ সাব্যস্ত করে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন কেন? উত্তর হলো-ওই কিবতি যদিও কাফের ছিল, নিরাপদ অবস্থায় ছিল। যদি মুসলমান ও কাফের এক সঙ্গে বসবাস করে ও নিরাপদ অবস্থায় থাকে, তখন মুসলমানদের মতোই অধিকার রাখে কাফেররা। যেভাবে মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়া জায়েজ নেই, অনুরূপ কাফেরদেরকেও কষ্ট দেয়া জায়েজ নেই। কারণ এটা মানবাধিকার। আর মানুষের প্রথম কর্তব্য হলো সে মানুষ হবে। মুসলমান হওয়া, সূফী-সাধক হওয়া তো পরের কথা। মনুষত্বের হক বা মানবাধিকার হলো নিজ থেকে কাউকে কষ্ট দেবে না। এতে মুসলিম ও অমুসলিম সমান।

জবানের কষ্ট দেয়ার একটি হলো অঙ্গিকার ভঙ্গ করা  
কোন কোন কাজ এমন যাকে মানুষ মুখের মাধ্যমে কষ্ট দেয়ার মধ্যে গণ্য করে না। অথচ সে কাজটি জবান দিয়ে কষ্ট দেয়ার হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। যেমন অঙ্গিকার ভঙ্গ করা। কেউ অঙ্গিকার করলো-  অমুক সময় আমি তোমার কাছে আসব বা অমুক সময় আপনার কাজ করব, তবে সময় মতো অঙ্গিকার পুরো করেনি। ফলে তার কষ্ট হয়েছে। এতে একদিকে অঙ্গিকার ভঙ্গের গুনাহ হয়েছে, অন্যদিকে অপরকে কষ্ট দেয়ার গুনাহ হয়েছে। এটি জবানে কষ্ট দেয়ার নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।

কোরআন তেলাওয়াতের সময় সালাম দেয়া  
কোনো কোনো সময় মানুষ টেরও পায় না সে তার যবান দিয়ে অন্যকে কষ্ট দিচ্ছে। বরং সে মনে করে সে সওয়াবের কাজ করছে। বাস্তবে সে পাপ করছে, অন্যকে কষ্ট দিচ্ছে। যেমন সালাম দেয়া। কত ফজিলত ও সওয়াবের কাজ! তবে শরীয়ত অন্যকে কষ্ট না দেয়ার কথা ভেবে সালাম দেয়ারও বিধান নির্দিষ্ট করেছে। সর্বদা সালাম দেয়া জায়েজ নেই। বরং কখনো সালাম করলে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে। কারণ সালামের মাধ্যমে তুমি অন্যকে কষ্ট দিয়েছ। যেমন এক ব্যক্তি কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত রয়েছে। তাকে সালাম দেয়া জায়েজ নেই। কারণ একদিকে তোমার সালামের কারণে তার কোরআন তেলাওয়াত বিঘ্নিত হবে। অপরদিকে তেলাওয়াত ছেড়ে তোমার প্রতি মনযোগ দেয়ার কষ্ট হবে। এমন সময় সালাম দেয়া জবানে কষ্ট দেয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে। এমনিভাবে কেউ যদি মসজিদে বসে যিকিরে মশগুল থাকে, মসজিদে প্রবেশকালে তাকে সালাম দেয়া জায়েজ নেই। কারণ সে আল্লাহ তায়ালার স্মরণে ব্যস্ত আছে। আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে তার সম্পর্ক জুড়ে আছে। যিকির দিয়ে সচল তার জবান। তোমরা সালামের কারণে তার যিকির বিঘ্নিত হবে। তার মনযোগ সরানোর কষ্টও হবে। 

বৈঠকে সালাম করা  
ফেকাহবিদগণ লিখেছেন-কোন ব্যক্তি কথাবার্তায় ব্যস্ত। অন্য ব্যক্তি তার কথা মনযোগ দিয়ে শুনছে। যদিও পার্থিব কথাই হোক, এমতাবস্থায় ওই বৈঠকে গিয়ে সালাম করা জায়েজ নেই। কারণ তারা কথা বলা ও শোনায় ব্যস্ত ছিল। তোমার সালামের কারণে তাদের কথায় ছেদ পড়ল। যে কারণে তাদের কথায় অরুচি সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে সালাম করা জায়েজ নেই। এই কারণে যখন তুমি কোন বৈঠকে অংশগ্রহণ কর, সেখানে কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়, তখন সেখানে সালাম দেয়া ছাড়া বসে যাও। তখন সালাম করা যবানে কষ্ট দেয়ার সমার্থক। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় শরীয়ত অন্য থেকে কষ্ট দূর করা বা কষ্ট না দেয়ার ব্যাপারে কত গুরুত্বারোপ করেছে।

খাবার গ্রহণকারীকে সালাম করা  
এক ব্যক্তি খানা খাওয়ায় ব্যস্ত। তখন তাকে সালাম করা তো হারাম নয়, তবে মাকরুহ অবশ্যই যখন আশংকা হয় সালামের ফলে সে অস্থির হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো সে তো খানা খাওয়ায় ব্যস্ত। না সে এবাদত করছে, না যিকিরে মশগুল। তুমি যদি সালাম কর তার উপর পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে না। তবে সালামের ফলে সে অস্থির হওয়া বা অপছন্দনীয় হওয়ার আশংকা রয়েছে। এ কারণে ওই সময় সালাম করবে না। এভাবে এক ব্যক্তি তার কোন কাজের জন্য দ্রুত যাচ্ছে, তোমার কাছে মনে হচ্ছে তার তাড়া আছে। তুমি আগে বেড়ে তাকে সালাম করে মুসাফাহার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছ। এটা তুমি ঠিক করোনি। তার দ্রুত চলা থেকে অনুমান করা উচিত ছিল, তার তাড়া আছে। এখন সালাম ও মুসাফাহা করার উপযোগী সময় নয়। এমন সময় তাকে সালাম না করে যেতে দাও। এসব বিষয় যবানের মাধ্যমে কষ্ট দেয়ার অন্তর্ভুক্ত।

পরের পর্ব জানতে ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকুন... 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে