পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয় (পর্ব-২)

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৬ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১২ ১৪২৭,   ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২

পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয় (পর্ব-২)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৯ ২১ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৬:৩১ ২১ অক্টোবর ২০২০

যখন কাউকে পাপে জড়িত দেখ, তার প্রতি সহানুভূতিশীল হও। তার জন্য দোয়া করো ও চেষ্ট করো যেন পাপ থেকে বেঁচে থাকে।

যখন কাউকে পাপে জড়িত দেখ, তার প্রতি সহানুভূতিশীল হও। তার জন্য দোয়া করো ও চেষ্ট করো যেন পাপ থেকে বেঁচে থাকে।

পাপীকে ভর্ৎসনা করো না:

قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : من عير أخاه بذنب قد تاب منه، لم يمت حتى يعمله

পাপের লজ্জা দেয়ার শাস্তি:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের এমন পাপের ওপর ভর্ৎসনা করে যার থেকে সে তাওবা করেছে, ভর্ৎসনাকারী ওই পাপে জড়ানো পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না।

আরো দেখুন >>> পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়  (পর্ব-১)

উদাহরণ স্বরূপ, কারো ব্যাপারে জানা আছে- সে গুনাহ করেছে ও গুনাহ থেকে তাওবা করেছে। ওই গুনাহর কারণে তাকে হেয় করা ও ভর্ৎসনা করা যে, তুমি তো অমুক গুনাহ করেছ, এভাবে লজ্জা দেয়াও একটি গুনাহর কাজ। কারণ যে ব্যক্তি তাওবার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার কাছে স্বীয় পাপ ক্ষমা করিয়ে নিয়েছে। তাওবার মাধ্যমে শুধু গুনাহ মাফ হয় না বরং আমল নামা থেকে মিটিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ তায়ালা যে গুনাহ আমল নামা থেকে মুছে দিয়েছেন, তুমি সে গুনাহর কারণে তাকে হেয় মনে করছ, ভর্ৎসনা করছ, ভালো-মন্দ বলছ। এ কাজ আল্লাহ তায়ালার কাছে খুবই অপছন্দনীয়।

পাপী একজন রুগ্ন ব্যক্তির মতো:

এ তো ওই ব্যক্তির ব্যাপারে যার সম্পর্কে জানা আছে সে গুনাহ করে তাওবা করেছে। আর যদি জানা না থাকে, সে তাওবা করেছে কি না, তবে একজন মুমিনের ব্যাপারে সম্ভাবনা তো এটাই, সে তাওবা করে থাকবে অথবা ভবিষ্যতে করবে। এ জন্য কেউ যদি গুনাহ করে ফেলে, তার তাওবার ব্যাপারে জানা না থাকে, তবুও তাকে তুচ্ছ মনে করার কোনো অধিকার নেই। 

জানা তো নেই-হয়ত সে তাওবা করে নিয়েছে। মনে রেখ, পাপকে ঘৃণা করা চাই, পাপীকে নয়। ঘৃণা করাও একটি পাপ ও অন্যায়। তবে যে ব্যক্তি পাপ করেছে তাকে ঘৃণা করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দেননি। বরং পাপী তো দয়া পাওয়ার উপযুক্ত। বেচারা একটি রোগে আক্রান্ত। যেমন কোনো ব্যক্তি রোগে আক্রান্ত হলে রোগকে ঘৃণা করতে হবে, রোগীকে নয়। তার রোগ দূর করার চিন্তা করবে। তার জন্য দোয়া করবে। তবে রুগ্ন ব্যক্তি ঘৃণার পাত্র নয় বরং দয়ার পাত্র যে আল্লাহর বান্দা কি বিপদে আছে!

কুফুর ঘৃণার যোগ্য, কাফের নয়:

যদি কোনো ব্যক্তি কাফের হয়, তার কুফুরকে ঘৃণা করো, তাকে নয়। বরং তার ব্যাপারে দোয়া করো, আল্লাহ তায়ালা তাকে হেদায়াত দান করুন। কাফেররা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কত কষ্ট দিয়েছে! তীর নিক্ষেপ করেছে, পাথর বর্ষিত হচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে তাঁর দেহ মোবারক।

ওই সময়ও তাঁর মুখে ছিল এ বাণী- হে আল্লাহ! আমার সম্প্রদায়কে হেদায়াত করো, কারণ তারা জানে না। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাদের পাপ কুফুর, শিরিক ও জুলুম থাকা সত্তেও তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেননি। বরং সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, হে আল্লাহ! এরা বাস্তব অবস্থার ব্যাপারে অবগত নয়। এ কারণে তারা আমার সঙ্গে এ আচরণ করছে। তুমি তাদেরকে হেদায়াত দান করো।

অতএব, যখন কাউকে পাপে জড়িত দেখ, তার প্রতি সহানুভূতিশীল হও। তার জন্য দোয়া করো ও চেষ্ট করো যেন পাপ থেকে বেঁচে থাকে। তাকে দাওয়াত দাও, তবে হেয় মনে করো না। কারণ হতে পারে আল্লাহ তাকে তাওবার সুযোগ দেবেন, তখন সে তোমরা চেয়েও আগে বেড়ে যাবে।

হজরত থানবি রহ. কর্তৃক অন্যকে শ্রেষ্ঠ মনে করা:

হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ.) এর  এ বাণী। বাণীটি হলো ‘আমি প্রত্যেক মুসলমানকে বর্তমানে এবং কাফেরকে সম্ভাবনামূলক নিজেরচে’ উত্তম মনে করি’। সম্ভাবনামূলক এর অর্থ হলো, যদিও এখন সে কুফুরে লিপ্ত, তবে জানা তো নেই, আল্লাহ তায়ালা তাকে তাওবার তাওফিক দিয়ে দেবেন। সে কুফুরের পাপ থেকে বের হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন আর সে আমার চেয়েও আগে বেড়ে যাবে।

আর যে ব্যক্তি মুসলমান, ঈমানওয়ালা, আল্লাহ তায়ালা তাকে ঈমানের দৌলত দান করেছেন। আমার তো জানা নেই আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা গভীর। এ জন্য আমি প্রত্যেক মুসলমানকে নিজের চেয়ে উত্তম মনে করি। তিনি কখনো বলেন, গুনাহ বা পাপের কারণে কাউকে ছোট মনে করা জায়েজ নেই।

এ রোগ কাদের মধ্যে পাওয়া যায়:

ছোট মনে করার রোগটি বিশেষভাবে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়, যারা নতুন দ্বীনদার হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ শুরুতে তার মাঝে দ্বীনদারি ছিল না, পরে দ্বীনের প্রতি এসেছে। নামাজ রোজা নিয়মিত আদায় করছে। বাহ্যিক পোশাক আশাক শরীয়ত মোতাবেক তৈরি করেছে। মসজিদে আসতে থাকে, জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতে থাকে, এরূপ লোকদের অন্তরে শয়তান এ কথা ঢুকিয়ে দেয় এখন তো তুমি সরল সঠিক পথে আছ, আর পাপে জড়িত সব মানুষ ধ্বংসের পথে আছে।

ফলে সে পাপীদেরকে হেয় ও তুচ্ছ মনে করে এবং তাদেরকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দেখে। এবং কষ্টদায়ক পদ্ধতিতে তাদের ওপর আপত্তি করতে থাকে। এরই ফলশ্রুতিতে অহংকার, দাম্ভিকতা, আত্মতুষ্টিতে লিপ্ত হয়ে যায়। মানুষের ভেতর সৃষ্ট এ রোগ তার কর্মকে নিষ্ফল করে দেয়। এ জন্য যখন মানুষের দৃষ্টি এদিকে যায়-আমি বড় ভালো আর অন্যরা মন্দ, এতে মানুষ এ আক্রান্ত হয়। যার ফলে তার সব আমল নষ্ট হয়ে যায়।

কারণ গ্রহণযোগ্য আমল সেটি, যা ইখলাসের সঙ্গে আল্লাহর জন্য করা হয় এবং যে আমলের পর মানুষ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে যে, আল্লাহ তায়ালা আমাকে আমলের তওফিক দান করেছেন। এ জন্য কারো প্রতি তাচ্ছিল্যের আচরণ করা উচিত নয়। এবং কোনো কাফের, ফাসেক, পাপীকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়।

রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখলে এ দোয়া পড়বে:

হাদিস শরিফে এসেছে, যখন মানুষ কোনো রোগীকে দেখবে, এ দোয়া পড়বে,

الحمد لله الذي عافاني مما ابتلاه به، و فضلني على كثير ممن خلق تفضيلا

‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে এ রোগ থেকে সুস্থতা দিয়েছেন যাতে সে জড়িত এবং অনেক লোকের ওপর তিনি আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, অর্থাৎ অনেক লোক আছে অসুস্থ, তিনি আমাকে সুস্থতা দিয়েছেন। কোনো রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখে এ দোয়া পড়া সুন্নত। 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।

কাউকে পাপে লিপ্ত দেখলে এ দোয়াই পড়বে:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুগ্নকে দেখে যে দোয়া পড়তে শিক্ষা দিয়েছেন, কোনো পাপে জড়িত ব্যক্তিকে দেখলে এ দোয়াই পড়বে। যেমন রাস্তায় চলাকালে কখনো যদি দেখেন মানুষ সিনেমা দেখার জন্য অথবা তার টিকেট ক্রয়ের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, তাদেরকে দেখে এ দোয়াই পড়বেন এবং আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করবেন যে, তিনি আমাকে এ পাপ থেকে হেফাজত করেছেন।

এ দোয়া পড়ার কারণ হলো, যেভাবে রুগ্ন ব্যক্তি দয়া পাওয়ার উপযুক্ত, অনুরূপ পাপে জড়িত ব্যক্তিও দয়া পাওয়ার উপযুক্ত। সে বিপদে আছে, তার জন্য দোয়া করা চাই- হে আল্লাহ! তাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করো। কারণ আজ যে ব্যক্তি পাপের লাইনে আছে, যাকে তুমি হেয় মনে করছ, হতে পারে আল্লাহ তাকে তাওবার তাওফিক দেবেন আর সে অনেক কাজে তোমার চেয়েও আগে বেড়ে যাবে।

এ জন্য গর্ব করার কিছু নেই। আল্লাহ তায়ালা যখন তোমাদরেকে পাপ থেকে বাঁচার তাওফিক দিয়েছেন, তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো। তাদের যখন গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফিক হয়নি, তাদের ব্যাপারে তোমরা দোয়া করো-হে আল্লাহ! তাদেরকে হেদায়াত দান করো। তাদেরকে এ রোগ থেকে নাজাত দান করো।

অতএব, কুফুরকে ঘৃণা করো। পাপ, গুনাহ ও অবাধ্যতাকে ঘৃণা করো। তবুও মানুষকে ঘৃণা করো না বরং তার সঙ্গে ভালোবাসা ও দয়ার আচরণ করো। যখন তাকে কোনো কথা বলতে হয়, নম্রতা ও সহানুভূতিশীলতার সঙ্গে বলো। সহমর্মিতা ও ভালোবাসার সঙ্গে বলো। যাতে অন্তরে দাগ কাটে। আমাদের সব বুযুর্গদের নিয়মিত আমল এমনই ছিল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে