ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয় ও অপব্যয় (পর্ব-২)

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৯ ১৪২৭,   ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২

ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয় ও অপব্যয় (পর্ব-২)

অপচয় ও অপব্যয়ের ক্ষতিকর দিক সমূহ

মুহাম্মাদ আকবার হোসাইন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৪৬ ১৯ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ২১:০২ ১৯ অক্টোবর ২০২০

ইসলামের মূল সৌন্দর্যই হলো মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। ইসলাম যেভাবে অপচয়কে নিষেধ করেছে তেমনি কৃপণতাকেও নিষেধ করেছে।

ইসলামের মূল সৌন্দর্যই হলো মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। ইসলাম যেভাবে অপচয়কে নিষেধ করেছে তেমনি কৃপণতাকেও নিষেধ করেছে।

অপব্যয়ের আরেকটি কারণ হচ্ছে কেয়ামতের ভয়াবহ অবস্থা ও শাস্তি সম্পর্কে উদাসীনতা। যেকোনো ব্যক্তি পরকালের কঠিন পরিণতির কথা চিন্তা করলে সে অবশ্যই অপব্যয় থেকে বেঁচে থাকবে।

অপচয় ও অপব্যয়ের ক্ষতিকর দিক সমূহ :

অপচয় ও অপব্যয়ের অনেক ক্ষতিকর দিক রয়েছে, যেগুলো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি আন্তর্জাতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। অযথা খরচ দুনিয়ার ব্যবস্থাপনাকে যেমন বিশৃঙ্খল করে, তেমনি ব্যক্তির আখেরাতকেও নষ্ট করে। নিম্নে অপচয় ও অপব্যয়ের কিছু ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হলো।

আরো পড়ুন >>> ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয় ও অপব্যয় (পর্ব-১)

১. অপব্যয় হারাম উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করে : অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে অনেক সময় মানুষ অর্থসংকটে পড়ে যায়। তখন সংসারের আবশ্যকীয় ব্যয় নির্বাহ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সে হারাম উপার্জনের দিকে ধাবিত হয়। অথচ হারাম খাদ্যে গঠিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

كُلُّ جَسَدٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ النَّارُ أَوْلَى بِهِ 

‘প্রত্যেক ওই শরীর যা হারাম দ্বারা গঠিত তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত স্থান’। (সহিহুল জামে‘ হা/৪৫১৯)

২. অপচয়ের মাধ্যমে পাপের চর্চা হয় : অপচয়ের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। সে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যবহার করে এবং তাঁর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলে সে হারাম পথে অর্থ ব্যয় করতে উদ্যত হয়। যেমন মদ, জুয়া, লটারী, ধূমপান সহ সব ধরনের নেশাকর দ্রব্য পান, যাত্রা, আনন্দমেলা, সিনেমা দেখা ইত্যাদি। এর মাধ্যমে সময় ও অর্থের অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাপের চর্চা হয় অবারিত।

উপরন্তু ইসলামের নির্দেশনার বাইরে অতি ভোজনের মাধ্যমে বরং সে নিজেই নিজের ক্ষতিই ডেকে আনে। অথচ ইসলাম অপচয় না করে পরিমিত খাদ্য গ্রহণের সুন্দর নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَا مَلأَ آدَمِىٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ حَسْبُ الآدَمِىِّ لُقَيْمَاتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ فَإِنْ غَلَبَتِ الآدَمِىَّ نَفْسُهُ فَثُلُثٌ لِلطَّعَامِ وَثُلُثٌ لِلشَّرَابِ وَثُلُثٌ لِلنَّفَسِ 

‘আদম সন্তান তার পেটের তুলনায় অন্য কোনো খারাপ পাত্র ভর্তি করে না। মানুষের জন্য তো কয়েক লোকমা খাদ্যই যথেষ্ট, যা তার মেরুদন্ডকে সোজা করে রাখবে। আর যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তাহলে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় আর এক-তৃতীয়াংশ নিঃশ্বাসের জন্য রাখবে’। (তিরমিযী হা/২৩৮০; ইবনু মাজাহ হা/৩৩৪৯; সহিহাহ হা/২২৬৫)

৩. পরকালে সম্পদ সম্পর্কে হিসাব দিতে হবে : পরকালে মহান আল্লাহর সামনে প্রত্যেককে স্বীয় সম্পদের হিসাব দিতে হবে যে, সম্পদ কোথা থেকে সে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

لاَ تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاَهُ وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ 

‘কেয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় তার রবের নিকট হতে একটুকুও নড়বে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, কীভাবে তা অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে তা বিনাশ করেছে? তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে? আর সে যতটুকু জ্ঞানার্জন করেছিল সে অনুযায়ী আমল করেছে কি-না’।  (তিরমিযী হা/২৪১৬; মিশকাত হা/৫১৯৭; সহিহাহ হা/৯৪৬)

৪. অপচয় ও অপব্যয় সম্পদ বিনষ্টের নামান্তর : অপব্যয় ও অপচয়ের মাধ্যমে সম্পদ নষ্ট হয়। যা আল্লাহ অপসন্দ করেন। রাসূল (সা.) বলেন,

إِنَّ اللهَ كَرِهَ لَكُمْ ثَلاَثًا قِيلَ وَقَالَ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ 

‘আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন- (১) অনর্থক কথাবার্তা বলা (২) সম্পদ নষ্ট করা এবং (৩) অত্যধিক প্রশ্ন করা’। (বুখারি হা/১৪৭৭; মুসলিম হা/৫৯৩)

আরো পড়ুন >>> রাসূল (সা.) চাটুকারদের অভিশাপ দিয়েছেন যে কারণে

৫. বরকতশূন্য হওয়া ও দারিদ্রের কবলে পড়া : অপচয়-অপব্যয় করার কারণে সম্পদে বরকত থাকে না। ফলে সম্পদ এক সময় নিঃশেষ হয়ে যায়। আর ওই ব্যক্তি তখন ঋণ করতে থাকে। অবশেষে সে অভাব-অনটনের মধ্যে পতিত হয়।

অপচয় ও অপব্যয় :

ইসলামে হারাম খাদ্য গ্রহণ নিষেধ করা হয়েছে এবং খাদ্যের আদব রক্ষার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান যুগে পানাহারে অতিভোজন ও অপচয় যেন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে খাদ্য ও পানীয়ের কোম্পানীগুলো ভোক্তার অর্থ ধ্বংস করে চলেছে। অতিভোজনের জন্যই দু’দিন পরপর নানা রকমের বিলাসী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। বস্ত্তবাদী ধ্যান-ধারণায় পুষ্ট লোকদের অন্ধ অনুকরণের পেছনে মুসলিমরাও ছুটছে। অপচয় করাটাই যেন তাদের বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

ডাস্টবিনগুলোর অবস্থা থেকেই অনুমিত হয় দৈনিক কত খাদ্য আমরা অপচয় করে চলেছি। আর এভাবেই পশু চরিত্র আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করছে। অথচ গরীব-মিসকীনরা দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতে গলদঘর্ম হচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালায় তারা ধুঁকে ধুঁকে মরছে। আমরা প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ খাবার অপচয় করি, তা যদি দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হতো তাহলে অনেক অনাহারীর ক্ষুধার জ্বালা মেটানো সম্ভব হতো।

অপচয় ও অপব্যয়ের প্রতিকার :

ইসলামের মূল সৌন্দর্যই হলো মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। ইসলাম যেভাবে অপচয়কে নিষেধ করেছে তেমনি কৃপণতাকেও নিষেধ করেছে। এজন্যই পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিস মুসলমানদের পানাহার, পোষাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান, সৌন্দর্য, যোগাযোগের মাধ্যম, বিবাহ-শাদি সবকিছুতেই সীমারেখা চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। নিম্নে অপচয় ও অপব্যায়ের প্রতিকারে কতিপয় প্রস্তাবনা পেশ করা হলো।

১. মধ্যপন্থা অবলম্বন : এটি হলো অপচয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি অবস্থা। কিন্তু অধিকাংশ লোক এই নীতির প্রতিফলন ঘটায় না। অথচ ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার বান্দাদের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন,

وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا 

‘তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না বা কৃপণতা করে না। বরং তারা এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে’। (সূরা: ফুরকান ২৫/৬৭)

মহানবী (সা.) বলেন,

كُلُوا وَاشْرَبُوا وَتَصَدَّقُوا وَالْبَسُوا غَيْرَ مَخِيلَةٍ وَلاَ سَرَفٍ 

‘তোমরা খাও, পান কর, দান-সাদাক্বাহ কর এবং পরিধান কর, তবে অহংকার ও অপচয় ব্যতীত’। (আহমাদ হা/৬৬৯৫, সনদ হাসান)

২. সৌন্দর্য : সৌন্দর্য অবলম্বন করা অবশ্যই বৈধ। তবে এজন্য অপচয় করা বৈধ নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَا بَنِي آدَمَ خُذُوْا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِيْنَ

‘হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোষাক পরিধান কর। তোমরা খাও ও পান কর। কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালবাসেন না’। (সূরা: আ‘রাফ ৭/৩১)

নবী করিম (সা.) বলেন,

إِنَّ اللهَ يُحِبَّ أَنْ يُرَى أَثَرُ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ 

‘আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্যে তাঁর দেয়া নেয়ামতের প্রভাব দেখতে ভালোবাসেন’। (তিরমিযী হা/২৮১৯; মিশকাত হা/৪৩৫০; সহিহুল জামে‘ হা/১৭১২) তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষণীয় যে, তা যেন সীমা ছাড়িয়ে না যায়। যেন অপচয়ের পর্যায়ে না পড়ে।

৩. অহংকার না করা : অহংকার প্রদর্শনের জন্য সম্পদ ব্যয়কে ইসলাম অনুমোদন করে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ

‘হে বিশ্বাসীগণ! খোটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানগুলোকে বিনষ্ট করো না। সেই ব্যক্তির মতো, যে তার ধন-সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর জন্য এবং সে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না। ওই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ প্রস্তরখন্ডের মতো, যার ওপরে কিছু মাটি জমে ছিল। অতঃপর সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হলো ও তাকে পরিষ্কার করে রেখে গেল। এভাবে তারা যা কিছু উপার্জন করে, সেখান থেকে কোনোই সুফল তারা পায় না। বস্ত্ততঃ আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’। (সূরা: বাকারা ২/২৬৪) চলবে...

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে