ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৫)

ঢাকা, শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৭,   ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৫)

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৯ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৮:২১ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

মানুষ সর্বদা স্বার্থ উদ্ধার এবং প্রবৃত্তি পূরণে ব্যস্ত থাকবে। কাজটি হালাল না হারাম, এটি জান্নাতের পথ, না জাহান্নামের পথ, এ পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে, না অসন্তুষ্টি আছে এগুলো চিন্তা করার মতো মন-মানসিকতা এবং অবসর থাকবে না।

মানুষ সর্বদা স্বার্থ উদ্ধার এবং প্রবৃত্তি পূরণে ব্যস্ত থাকবে। কাজটি হালাল না হারাম, এটি জান্নাতের পথ, না জাহান্নামের পথ, এ পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে, না অসন্তুষ্টি আছে এগুলো চিন্তা করার মতো মন-মানসিকতা এবং অবসর থাকবে না।

ফেতনার যুগের জন্য তৃতীয় নির্দেশ: অন্য একটি হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

سَتَكُونُ فِتَنٌ القَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ القَائِمِ وَالقَائِمُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ المَاشِي

ফেতনার যুগে দাঁড়ানো ব্যক্তি উত্তম হবে চলন্ত ব্যক্তির চেয়ে আর দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে উপবিষ্ট ব্যক্তি। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানুত তিরমিজি)।

আরো দেখুন >>> ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৪)

হাদিসের অর্থ হলো, ফেতনামূলক কর্মকাণ্ডে কোনোভাবেই অংশগ্রহণ করবে না। ফেতনার বিষয়ে আগ্রহ রাখা এবং তা দেখার উদ্দেশ্যে গমন করাও বিপদজনক হবে। তাই স্থির দাঁড়িয়ে থাকাই সমীচীন হবে, তারচেয়েও ভালো হবে দাঁড়িয়ে না থেকে বসে যাওয়া, তারচেয়েও ভালো হবে শুয়ে পড়া। এককথায় এরূপ পরিস্থিতিতে ঘরে বসে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনোপকরণ সংগ্রহের জন্য ফিকির কর এবং ঘর থেকে বের হয়ে দলীয় বা নির্দলীয় কোনো প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ কর না।

ফেতনার যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ:

অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একটা সময় আসবে যখন মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হবে তার বকরির পাল। সে তা নিয়ে শহুরে জীবন ত্যাগ করে পাহাড়ের চূড়ায় চলে যাবে এবং বকরির পালের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করবে। এরূপ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ হবে। কারণ শহরগুলোতে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ ফেতনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। 

ফেতনার যুগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ:

উপরিউক্ত হাদিসগুলোতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কথাটি বিশেষভাবে বলতে চেয়েছেন তা হলো, ফেতনার যুগ দলীয় ও সমষ্টিগত কাজের জন্য অনুকূল হবে না। কারণ সব দলই হবে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ। কোনো দলের ওপরেই আস্থা রাখা যাবে না। কোনো দলের দাবি সঠিক তা বুঝার উপায় থাকবে না। এ সময় নিজেকে সব ধরনের ফেতনা থেকে বাঁচিয়ে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে নিয়োজিত রেখে ঈমান নিয়ে কবরে যাওয়াই হবে প্রধান কাজ। সে যুগে ফেতনা থেকে বাঁচার এটিই একমাত্র রাস্তা।

আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, যদি তোমরা হেদায়েতের ওপর থাক তাহলে কেউ গোমরাহ হয়ে গেলে তাদের গোমরাহি তোমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে না। রেওয়ায়েতে আছে যে, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, মানুষ শুধু নিজের ফিকির করবে, অন্য কারো ফিকির করবে না; যদি কোনো ব্যক্তি ভুল পথে চলে তাহলে তাকে চলতে দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে না। অথচ আমরা জানি, সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা এবং অন্যদেরকে নেক আমলের দিকে দাওয়াত দেয়া ও তার কাছে দ্বীন পৌঁছানো আমাদের কর্তব্য। তাহলে উপরিউক্ত কথা দুটি সাংঘর্ষিক নয়?

ফেতনার যুগের চার আলামত:

উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করার যে বিধান শরীয়তে আছে তা স্বস্থানে সঠিক। তবে এক সময় আসবে যখন নিজের সংশোধনের ফিকির করাই মানুষের দায়িত্ব হবে। এটি হলো ওই সময় যখন মুসলিম সমাজে চারটি আলামত প্রকাশ পাবে। তা হলো,

১. ওই যুগে মানুষ ধন-সম্পদ উপার্জনের পেছনে লেগে থাকবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটিই চিন্তা হবে, আরো বেশি পয়সা কীভাবে আসবে? মাল-সম্পদ উপার্জনের উদ্দেশ্যেই সব কাজ করা হবে।

২. মানুষ সর্বদা স্বার্থ উদ্ধার এবং প্রবৃত্তি পূরণে ব্যস্ত থাকবে। কাজটি হালাল না হারাম, এটি জান্নাতের পথ, না জাহান্নামের পথ, এ পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে, না অসন্তুষ্টি আছে এগুলো চিন্তা করার মতো মন-মানসিকতা এবং অবসর থাকবে না।

৩. লোকেরা দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেবে অর্থাৎ আখেরাতের বিলকুল চিন্তা করবে না। দুনিয়া নিয়ে এত বেশি চিন্তা করবে যে, একদিন মরতে হবে, অন্ধকার কবরে থাকতে হবে, আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে, এসব বিষয় বুঝানোর পর উত্তরে সে বলবে, কি করব, যুগটাই এরকম। আমাদেরকে তো সবার সঙ্গে মিলেমিশে দুনিয়াতে থাকতে হবে। সব নসিহত ও উপদেশকে এক কথায় উড়িয়ে দেবে।

৪. প্রত্যেক মানুষ নিজের বুঝ-বুদ্ধি ও ভাবনাকে সঠিক জ্ঞান করবে এবং তা নিয়ে আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত হবে। অন্যের কথা শোনার জন্য একবারেই প্রস্তুত থাকবে না। নিজের মতামতকেই সঠিক মনে করবে এবং অন্যদের কথাকে ভুল জ্ঞান করবে। আজকাল এটাই দেখা যায় যে, প্রায় প্রতিটি মানুষ দ্বীনি বিষয়েও নিজস্ব মতামত পোষণ করে এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে হালাল ও হারামের বিচার বিশ্লেষণ করে। অথচ সারাজীবন কখনো কোরআন ও হাদিস বুঝার জন্য একদিন সময়ও ব্যয় করেনি। কিন্তু যখনি তার সামনে কোনো শরীয়তের হুকুম বর্ণনা করা হয় তখন বলে উঠে, আমার মতে এটি সঠিক নয়। এরপর নিজের মতামত তুলে ধরে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে বলেছেন যে, প্রত্যেকে নিজস্ব মত নিয়ে দম্ভ করবে।

মোটকথা, যে যুগে উপরিউক্ত চারটি আলামত প্রকাশ পাবে অর্থাৎ মানুষ মালের পেছনে ছুটবে এবং নফসানি খাহেশাতের পেছনে পড়বে, দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেবে এবং প্রায় প্রতিটি মানুষ নিজস্ব মত ও বুঝ নিয়ে দম্ভ করবে, তখন নিজেকে বাঁচানোর ফিকির কর এবং সাধারণ মানুষদের ফিকির বাদ দাও। কারণ যদি সাধারণ লোকদের ফিকিরের জন্য বাইরে বের হও তাহলে ফেতনা তোমাকে নিজের দিকে টেনে নেবে। তাই শুধু নিজের ফিকির কর এবং নিজের সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় মেহনত কর। ঘর থেকে বের হয়ো না, ঘরের দরজা বন্ধ করে ভেতরে বসে থাক। কোনো ঘটনা দেখার জন্যও ঘর থেকে বের হয়ো না, এমনকি জানালা দিয়ে উঁকিও দিয়ো না।

মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের কর্মপন্থা:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর সাহাবিদের যুগ শুরু হয়। খেলাফতে রাশেদার শেষযুগে হজরত আলি এবং হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর মাঝে মারাত্মক মতপার্থক্য সৃষ্টি হয় এবং তা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। হজরত আলি (রা.) এবং হজরত আয়শা (রা.) এর মাঝেও মতবিরোধ দেখা দেয় এবং এক্ষেত্রেও যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়। পারস্পরিক মতবিরোধ দেখা দিলে তখনকার কর্মপন্থা কি হবে, আগত উম্মতের জন্য আল্লাহ তায়ালা সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এ বিষয়ে নির্দেশনা রেখেছেন। সে যুগের সাহাবি ও তাবেয়িদের মধ্যে যারা মনে করতেন হজরত আলি (রা.) হকের ওপরে আছেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নেযুক্ত হাদিসের ওপরে আমল করেছেন,

تلزم جماعة المسلمين وامامهم

বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী ও তাদের ইমামের সঙ্গে জামাতবদ্ধ হয়ে থাক। যেহেতু হজরত আলি (রা.) তখন বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইমাম ছিলেন তাই অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ি হজরত আলি (রা.)-কে সমর্থন দিয়েছিলেন আর যেসব সাহাবি ও তাবেয়ি মনে করতেন হজরত মুয়াবিয়া (রা.) হকের ওপর আছেন, তারা হজরত মুয়াবিয়া (রা) এর পক্ষে অবস্থান নেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তৃতীয় আরেকটি দল ছিল যারা বলতেন, আমরা বুঝতে পারছি না কে হকের ওপরে আছে, তাই তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামের দ্বিতীয় নির্দেশ অনুসারে নিরপেক্ষ থাকেন; কোনো পক্ষ অবলম্বন করেননি।

হজরত ইবনে ওমর (রা.) এর কর্মপন্থা:

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর ছেলে ছিলেন। তিনি অনেক উঁচু স্তরের সাহাবি ও ফকীহ ছিলেন। তিনি তখন উভয় পক্ষ থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। একবার এক ব্যক্তি তাকে বলল, বাইরে হক ও বাতিলের লড়াই চলছে আর আপনি ঘরে বসে আছেন? হজরত আলি এবং হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর মাঝে যে লড়াই চলছে, হজরত আলি (রা.) এর অবস্থান হকের পক্ষে, আপনার তাঁর পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। উত্তরে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, ‘যখন মুসলমানদের দু’পক্ষ পরস্পর লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় এবং হক ও বাতিলকে সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য করা না যায় তখন নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে নিভৃতে জীবনযাপন কর এবং ধনুক ও হাতিয়ার ভেঙ্গে ফেল।’ যেহেতু আমি হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করতে পারছি না তাই হাতিয়ার ত্যাগ করে নিজ ঘরে নিভৃতে জীবনযাপন করছি। লোকটি বলল, আপনি ভুল করছেন। কারণ কোরআন শরিফে ইরশাদ হয়েছে,

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ

‘ফেতনা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তোমরা লড়াই কর।’ (সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ৯৩)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) লোকটির উত্তরে বড় সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন,

وَقَاتلنا حَتَّىٰ لَمْ تَكُنْ فِتْنَةٌ وقاتلتم حتي كانت الفتنة

‘আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে লড়াই করেছি এবং আল্লাহ তায়ালা ফেতনাকে নির্মূল করেছেন আর এখন তোমরা লড়াই করছ, এতে ফেতনা নির্মূল হচ্ছে না বরং তোমরা ফেতনা আরো উসকে দিচ্ছ। তাই আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার ওপর আমল করে নিভৃত জীবনযাপন করছি।

শান্তি ও ফেতনার সময় আমাদের কর্মপন্থা কী হবে?

এ সম্পর্কে একজন মুহাদ্দিসের একটি উক্তি আমার নজরে পড়ে। আমি কথাটি পড়ে বিস্মিত হই। তিনি বলেন,

اقتدوا بعمر رضي الله عنه في الامن وبابنه في الفتنة

শান্তির সময় তোমরা হজরত ওমর (রা.)-কে অনুসরণ কর এবং ফেতনার সময় তার ছেলেকে অনুসরণ কর। অর্থাৎ শান্তির সময় হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)  এর কর্মপন্থা কি ছিল তা খুঁজে দেখ এবং তার ওপর আমল কর এবং ফেতনার সময় তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর কর্মপন্থা অবলম্বন কর। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ফেতনার সময় অস্ত্র ত্যাগ করে নিজ ঘরে নিভৃতে জীবনযাপন করেন।

চলবে... 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে