যে রোগ মাঝপথেই থামিয়ে দেয় ‘গতি’

ঢাকা, রোববার   ০২ অক্টোবর ২০২২,   ১৭ আশ্বিন ১৪২৯,   ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

Beximco LPG Gas

হিমোফিলিয়া

যে রোগ মাঝপথেই থামিয়ে দেয় ‘গতি’

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫২ ১৭ এপ্রিল ২০২২   আপডেট: ১৫:৫৪ ১৭ এপ্রিল ২০২২

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

রক্তক্ষরণজনিত রোগ হিমোফিলিয়া। এটি একটি বংশগত রোগ, যা জিনের মাধ্যমে উত্তর প্রজন্মে পরিবাহিত হয়। চট্টগ্রামে দিনদিন এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও এখনো দুর্লভ রয়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থা। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগে স্বল্প পরিসরে করা হয় এ রোগের চিকিৎসা। তবে রোগটি নির্ণয়ে ছুটতে হয় ঢাকায়। অনেকে আবার চলে যান দেশের বাইরেও। এছাড়া রোগটির চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় মাঝপথে গতি হারায় অনেক পরিবার।

তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর ১৩০ মিলিয়ন শিশু জন্মগ্রহণ করে যার মধ্যে ২০ হাজার শিশু জন্মগতভাবে হিমোফিলিয়া নিয়ে জন্মায়। বিশ্বে দশ হাজারে একজন এ রোগে ভুগছে। যারা ৭৫ ভাগই সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।

চট্টগ্রামের চিত্র অনুযায়ী, হিমোফিলিয়া রোগের চিকিৎসা নিতে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলা থেকে রোগীরা ছুটে আসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগে। তবে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিভাগে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল। প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও হয় না এ রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা। ফলে সেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই ফিরে যেতে হয় রোগীদের। তবে এ বিভাগটিতে চিকিৎসক ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে ১১ জেলার রোগীরা সহজেই চিকিৎসাসেবা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আজ ১৭ এপ্রিল, সারাদেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবস। ‘চিকিৎসা সবার অধিকার’ এ প্রতিপাদ্যে পালিত হওয়া এবারের দিবসটি ঘিরে নানা কর্মসূচি নিয়েছে হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম শাখা। রোববার চমেক হাসপাতালে সাইন্টিফিক সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, যে হারে হিমোফিলিয়া রোগী বাড়ছে, সেভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি চট্টগ্রামে। চমেক হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগে রোগটির চিকিৎসা দেওয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ রোগ শনাক্তের জন্য কোনো যন্ত্রপাতি নেই। ফলে এ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো দুর্লভ বলা চলে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

হিমোফিলিয়া সোসাইটির তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় এখন পর্যন্ত সোসাইটির আওতাধীন ৭২৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলাতেই রয়েছেন দেড় শতাধিক। এছাড়া চমেক হাসপাতালে তিন শতাধিক রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিলেও বাকিদের যেতে হয় ঢাকায়। আবার ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে হিমশিম খান অনেকে। তাই জেলা পর্যায়েও এ রোগের চিকিৎসাসেবা দিতে ক্লিনিক চালুর উদ্যোগ রয়েছে সোসাইটির।

রক্তক্ষরণজনিত এ রোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা ও নানা পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলজের হেমাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাফরুহা আক্তার। নিচে তুলে ধরা হলো তার বিস্তারিত।

হিমোফিলিয়া কী?

হিমোফিলিয়া রক্তের একটি বিশেষ রোগ। সাধারণত জিনগত বা জন্মগতভাবে মানুষ এ রোগ বহন করে। শরীরের কোথাও কেটে গেলে কিংবা রক্তপাত হলে স্বাভাবিকভাবেই তা জমাট বাঁধে, রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। কিন্তু হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধতে সময় লাগে। অনেক সময় ধরে রক্তক্ষরণ চলতে থাকে। এর কারণ- রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ প্রোটিন ফ্যাক্টর। হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে এ প্রোটিনের ঘাটতি থাকে।

কী কারণে হয়?

সাধারণত ছেলেরাই হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত হয়। আর মেয়েরা হিমোফিলিয়ার জন্য দায়ী জিন বহন করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে X-linked disease, যা মানুষের শরীরের এক্স ক্রোমোসোমের মাধ্যমে বংশপরম্পরায় চলতে থাকে। তাই মা যদি তার এক্স ক্রোমোসোমে এ জিন বহন করেন, তবে তার ছেলেসন্তানরা হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। আর মেয়েসন্তানরা এর বাহক হতে পারে। তাই পারিবারিক ইতিহাস জানা জরুরি।

ধরন ও তীব্রতা

হিমোফিলিয়া সাধারণত দুই ধরনের হয়। ‘হিমোফিলিয়া-এ’ ও ‘হিমোফিলিয়া-বি’। হিমোফিলিয়া-এ এর কারণ শরীরের প্রোটিন ফ্যাক্টর এইট-এর ঘাটতি। আর হিমোফিলিয়া-বি এর কারণ ফ্যাক্টর নাইন-এর ঘাটতি। তবে রোগের তীব্রতা অনুযায়ী একে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

মৃদু হলে এক্ষেত্রে তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে কোথাও কেটে গেলে বা আঘাত পেলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। মাঝারি ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে মাংসপেশি, হাড়ের সংযোগস্থল ও অন্যান্য টিস্যুতে রক্তক্ষরণ হয়। আর মারাত্মক পর্যায়ে গেলে আঘাত ছাড়াই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এছাড়া মাংসপেশি, হাড়ের সংযোগস্থল বিশেষত হাঁটু, কনুই, পায়ের গোড়ালি ফুলে যেতে পারে ও ব্যথা হতে পারে। এমনকি ত্বকের নিচে ও মাড়িতে রক্তক্ষরণ হতে পারে। শিশু অবস্থাতেই এসব লক্ষণ প্রকাশ পায়।

চিকিৎসা পদ্ধতি

শুরুতেই জরুরি হলো হিমোফিলিয়া শনাক্ত করা। এ জন্য রোগীর যথাযথ পারিবারিক ইতিহাস ও লক্ষণ জানার পর রক্তের স্ক্রিনিং পরীক্ষা করাতে হয়। এরপর তার এপিটিটি ও নির্দিষ্ট ফ্যাক্টরের মাত্রা নিরূপণ করে হিমোফিলিয়া নির্ধারণ করা হয়। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এ পরীক্ষাগুলো করা যায়।

হিমোফিলিয়া বংশগত রোগ। তাই এটি থেকে কখনোই পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনভর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ থাকতে হয়। এ রোগের চিকিৎসা হলো- নিয়মিত ফ্যাক্টর ইনজেকশন দেওয়া। শরীরে প্লাজমা পরিসঞ্চালন করা। কিছু ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে রক্ত পরিসঞ্চালন করতে হয়। এর ফলে সৃষ্ট অন্যান্য শারীরিক অসুবিধাগুলোর আলাদা করে চিকিৎসা করাতে হয়।

হঠাৎ রক্তক্ষরণ হলে

হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির হঠাৎ রক্তক্ষরণ হলে বিশ্রাম নিতে হবে। প্রয়োজন হলে আক্রান্ত স্থান উঁচু করে রাখতে হবে। যেখান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, সেই জায়গা চেপে ধরে রাখতে হবে। জায়গাটিতে প্রয়োজনে বরফ কিংবা শীতল পানি দেওয়া যেতে পারে। বেশি ব্যথা হলে প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর

English HighlightsREAD MORE »