বগুড়ায় ‘তুচ্ছ ঘটনায় ছুরিকাঘাতে’ বাড়ছে হতাহত

ঢাকা, রোববার   ০৩ জুলাই ২০২২,   ১৯ আষাঢ় ১৪২৯,   ০৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

বগুড়ায় ‘তুচ্ছ ঘটনায় ছুরিকাঘাতে’ বাড়ছে হতাহত

মাসুম হোসেন, বগুড়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৩৫ ১২ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৯:৩৬ ১২ জানুয়ারি ২০২২

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সম্প্রতি ‘ছুরিকাঘাত’ বগুড়ায় একটি বহুল আলোচিত শব্দ। জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে ছুরিকাঘাতের ঘটনা। ছুরিকাঘাতের শিকার হয়ে জেলায় বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বাগবিতণ্ডা থেকে ছুরিকাঘাতের অধিকাংশই ঘটনা ঘটছে। 

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বগুড়ার জেলা পুলিশেও শুরু হয়েছে রদবদল।

শনিবার রাতে বগুড়া সদর উপজেলায় পূর্ব শত্রুতার জেরে দুজনকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। ঐদিন রাত ৮টার দিকে সদরের মালগ্রাম চাপড়পাড়া এলাকায় ৪০ বছর বয়সী সোহাগ নামে একজনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তার কোমরের নিচে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত সোহাগ বগুড়া সদরের ঝোপগাড়ী এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম আনোয়ার হোসেন।

ঐদিনই রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহরের সূত্রাপুর এলাকায় ৩৫ বছর বয়সী দুলাল হোসেন নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করা হয়। তার হাতে ও পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়। বর্তমানে তিনিও শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আহত দুলাল সূত্রাপুর এলাকার মনসুর আলীর ছেলে।

গত ৭ ডিসেম্বর (শুক্রবার) রাতে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আশেকপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামে পূর্ব শক্রতার জেরে নাজমুল হাসান নামে এক যুবককে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। নাজমুল ঐ গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম মহসীন আলী।

গত বছরের ২৯ নভেম্বর (সোমবার) রাতে বগুড়া সদরের খান্দার এলাকায় ছুরিকাঘাতে খুন হন উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার্থী মোহন। তিনি বগুড়া শহরের জাহাঙ্গীরাবাদ ফুলতলা এলাকার শুকুর আলীর ছেলে।

আরো পড়ুন: স্ত্রীর মৃত্যুশোক না কাটতেই স্বামীকে রাখা হলো পাশের কবরে

জানা গেছে, ২৯ নভেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে খান্দার এলাকায় পূর্ব শক্রতার জেরে ছুরিকাঘাতের শিকার হন মোহন। মোহন খান্দার এলাকা থেকে তার দুই বন্ধু লিখন ও বাপ্পিকে নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে জাহাঙ্গীরাবাদ ফুলতলায় (বাড়ি) ফিরছিলেন। পথে খান্দার সিএন্ডবি গোডাউনের সামনে তাদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করা হয়। ওই সময় পূর্ব শক্রতার জেরে লাঠিসোটা দিয়ে মোহন, বাপ্পি ও লিখনকে মারধর শুরু করা হয়। এরই একপর্যায়ে মোহনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। মোহনের কোমরের নিচে ও উরুতে চারটির মতো ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে মোহনসহ আহত তিনজনকে অটোরিকশায় করে বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন অভিযুক্তরা। শজিমেক হাসপাতালে ঘণ্টাখানেক চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মোহনের মৃত্যু হয়। আর আহত বাপ্পি ও লিখন প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) রাত ১১টার দিকে শহরের জহুরুল নগর এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষে ছাত্রলীগের চার নেতা-কর্মীকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া সংঘর্ষে তারা ছুরিকাঘাতের শিকার হন। ছুরিকাঘাতের শিকার হওয়া চারজন হলেন- ছাত্রলীগ নেতা শুভ, তার কর্মী আকশ, হদয় ও আমির।

জানা গেছে, ১৬ ডিসেম্বর রাতে জহুরুলনগর এলাকায় স্থানীয় রাস্তায় বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ছাত্রলীগ নেতা শুভর কয়েকজন অনুসারী বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক দুই মোটরসাইকেল যোগে ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। স্থানীয় যুবকরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের রাস্তা থেকে সরে যেতে বলেন। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বাগবিতণ্ডা রূপ নেয় সংঘর্ষে। পরে কলেজ ছাত্রলীগের চার নেতা-কর্মী ছুরিকাঘাতের শিকার হন।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) পূর্ব শক্রতার জেরে বগুড়া পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বেতগাড়ী এলাকায় হোসেন আলী নামে এক যুবককে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। এ ঘটনার দেড় মাস আগেও দিনদুপুরে তার বাড়িতে ঢুকে ছুরিকাঘাত ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা চেষ্টা করা হয়। হোসেন আলী বেতগাড়ী এলাকার বাসিন্দা।

আহত হোসেন আলীর ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম শহিদ জানান, হোসেনের শরীরে ছয়টির মতো ছুরিকাঘাত করা হয়। তার দুই উরুতে চারটি, হাতে একটি ও মাথার পেছনে আরও একটি ছুরিকাঘাত করা হয়।

গত বছরের ১৬ নভেম্বর (মঙ্গলবার) দুপুরে হোসেন আলীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। হামলার শিকার হওয়ার পর গত ২১ নভেম্বর শাজাহানপুর থানায় ১৪ জনকে আসামি করে মামলা করেন হোসেন।

জেলা পুলিশে রদবদল

বগুড়ায় জেলা পুলিশের একসঙ্গে ১০ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। তবে তাদেরকে জেলার বিভিন্ন পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে, ফাঁড়ি ও থানাতে রদবদল করা হয়েছে। এক সূত্রে জানা গেছে, জেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বা নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশে প্রয়োজন অনুযায়ী রদবদল শুরু করা হয়েছে।

রোববার ১০ পুলিশ কর্মকর্তার রদবদলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরী। এর আগে শনিবার এসপি সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী স্বাক্ষরিত এ আদেশ জারি করা হয়।

আরো পড়ুন: ‘স্বামী হত্যার বিচার না পেলে আমি আত্মহত্যা করব’

বদলি হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে বগুড়া স্টেডিয়াম ফাঁড়ির চারজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে এসআই খোরশেদ আলমকে সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দনবাইশা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে, হারুন অর রশিদকে গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে, এএসআই হাসান আলীকে নন্দীগ্রাম কুমিড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ও নবির উদ্দিনকে সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে।

বদলি হওয়া অন্যদের মধ্যে গাবতলী মডেল থানার এসআই শামীম আহম্মেদ, চন্দনবাইশা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের রুবেল সরকার ও গাবতলী মডেল থানার এএসআই মিলন মিয়াকে বগুড়া স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়িতে বদলি করা হয়েছে।

এছাড়াও গাবতলী মডেল থানার এএসআই কাজেম আলীকে সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে, আমিনুল হককে নন্দীগ্রাম কুমিড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ও রেজেক আলীকে নন্দীগ্রাম থানায় বদলি করা হয়েছে। রোববার তাদেরকে ছাড়পত্র দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরী জানান, ১০ পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলির আদেশ দেওয়া হয়নি। তাদেরকে নিয়মিত বদলি করা হয়েছে। এরকম বদলি প্রতিদিনই চার-পাঁচজনকে করা হয় এবং বদলি হওয়া পুলিশ সদস্যদের খুব দ্রুত যোগদান করতে বলা হয়েছে।

বগুড়ার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে কথা হয় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আব্দুর রশিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, বগুড়ায় ছুরিকাঘাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে জেলা পুলিশ। এলাকার শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী পুলিশকে গুছিয়ে নিচ্ছেন, কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে তা বিশেষভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম

English HighlightsREAD MORE »