দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)  

ঢাকা, সোমবার   ১৪ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১ ১৪২৮,   ০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)  

মূলঃ আলবেয়ার কামু  

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:৪৬ ১৫ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৩:১৫ ৬ মে ২০২১

দ্য প্লেগ

দ্য প্লেগ

এই ডাইরিতে বর্ণিত ঘটনাগুলো ঘটেছিল ১৯৪-  সনে। ওরান নামক শহরে। তখন শহরটির সবাই বিশ্বাস করত যে, তাদের শহরে সংঘটিত  সেইসব  অসাধারণ ও অদ্ভুত ধরণের ঘটনাগুলো ঘটার কোন যৌক্তিকতা ছিল না। কারণ, তাদের অভিজ্ঞতায়  ওরান  আসলেই ছিল খুব সাধারণ ধরণের একটা শহর এবং  এই শহর সম্পর্কে  উল্লেখ করার মত বিষয় ছিল একটাই। তা হলো শহরটি ছিল আলজেরিয়ান উপকূলের একটি পোতাশ্রয় এবং এতে স্থাপন করা হয়েছিল একটি  ফরাসী প্রতিষ্ঠানের সদরদপ্তর। 

খুব সুন্দর ধরণের শহর না হলেও কিছুদিন যদি আপনি এই শহরে বাস করতেন, তাহলে বুঝতেন যে, শহরটির  বাতাস ছিল যথেষ্টই পরিচ্ছন্ন, যা সারাক্ষণ মৃদু বা হালকাভাবে প্রবাহিত হতো। এবং সম্ভবত একারণেই শহরটিতে  স্থাপিত বিজনেস সেন্টারগুলোর পরিবেশও  পৃথিবীর অন্য সকল অংশে স্থাপিত বিজনেস সেন্টারগুলো থেকে ভিন্নতর ছিল।

আপনি যদি আগাগোড়া অবসবাসযোগ্য একটি শহরের কথা কল্পনা করেন, যেখানে কবুতর, গাছপালা অথবা বাগান কোনকিছুই নেই অথবা যেখানে কেউ কোনদিন পাখার আঘাতের শব্দ অথবা পাতার মর্মরধ্বনি শুনতে পায়নি, তাহলে ওরান ছিল সেই ধরণের একটি শহর। ওরান শহরে বছরের ঋতুগুলোকে আলাদা করে বোঝা যেত শুধুমাত্র আকাশ থেকে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বাতাসের অনুভব বলে দিত যে, বসন্তের আগমন সমাসন্ন। অথবা উপশহর থেকে আগত ফেরিওয়ালাদের ফুলের ঝুড়িগুলো থেকে সবাই বুঝতে পারত বাজারে বসন্তের সমারোহ শুরু হয়েছে। ওরানের গ্রীষ্মকাল ছিল খুবই প্রখর। সূর্যের তাপে ঘরগুলো পুড়ে শুকনো হাড়ের মত হয়ে যেত। ধূসর বর্ণের ধুলিতে আবৃত হয়ে যেত দেয়ালগুলো। এই অগ্নিদগ্ধ দিনগুলোতে বদ্ধ ঘরে কপাট বন্ধ করে বেঁচে থাকা ছাড়া কারো আর কিছুই করার থাকত না। শরৎকাল এখানে কাদামাটির প্লাবন বয়ে আনত। শুধুমাত্র শীতকালেই কিছুটা প্রশান্তির আবহাওয়া বিরাজ করত। ফলে, এই শহরের সাথে পরিচিত হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল এর নাগরিকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষন করে দেখার ভেতর  দিয়ে। কিভাবে তারা কাজ করে, পরস্পরকে ভালবাসে এবং পরিশেষে মরে যায়।

ছোট্ট এই শহরে জলবায়ুর কারণে তিন ঋতুতেই প্রতিনিয়ত উষ্ণ ও জ্বরাক্রান্ত বাতাস বইত। ফলে নাগরিকদের  সবাই খুব পরিশ্রান্ত থাকত। তারপরেও তারা সর্বক্ষণ কাজকর্মের মধ্যে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখত। তাদের  কঠোর পরিশ্রমের উদ্দেশ্য ছিল একটাই – ধনী হওয়া এবং জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যবসা-বানিজ্য করা। তারা  ভালবাসা, সহবাস, সিনেমা দেখতে যাওয়া - এই ধরণের সাধারণ আনন্দগুলোকে উপভোগ করত না। তবে সবাই সযত্নে শনিবার বিকেল ও রবিবারকে অবসর যাপনের দিন হিসেবে আলাদা করে রাখত এবং সপ্তাহের অবশিষ্ট দিনগুলোতে ব্যস্ত থাকতো অর্থ উপার্জনের নিমিত্তে। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে তারা নির্ধারিত এক ঘন্টার জন্যে ক্যাফেতে যেত। একই মহাসড়ক ধরে হাঁটাহাঁটি করত। অথবা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাতাস সেবন করত। শহরের যুবক-যুবতীদের আবেগ ছিল উন্মত্ত ধরণের এবং সাময়িক। বয়স্কদের দোষগুলো মাদকাসক্তি, ভোজনোৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান অথবা ক্লাবের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল। তাস বা জুয়ার মাধ্যমে  তারা  বড় অংকের অর্থ এক  হাত হতে অন্যহাতে বিনিময় করত। তবে এই অভ্যাসগুলো শুধুমাত্র এই শহরের লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। অন্য শহরগুলোর পরিস্থিতিও প্রায় একই রকমের ছিল। সবগুলো শহরেই সাধারণ সংস্কৃতি ছিল একইরকম।  নাগরিকেরা সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করার পর তাসের টেবিলে অথবা ক্যাফেতে বসত এবং অবশিষ্ট সময়ে  ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলাপচারিতায় নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখত। 

এরপরেও সেই সময়ে অনেক দেশ বা শহর ছিল যেগুলোর নাগরিকেরা অপেক্ষাকৃত ভালো ও ভিন্ন ধরণের আচরণ করত। কিন্তু উরানের নাগরিকেরা তাদের মতো  ছিল না। এই শহরের  পুরুষ ও নারীরা সল্পতম সময়ের ভেতরে পরস্পরকে নিঃশেষ করে ফেলত। ‘সহবাস’ অথবা মৃদু ধরণের দাম্পত্য সম্পর্কে নিজেদেরকে আবদ্ধ করত। চরম ধরণের এই দুটো কাজের কোন গড় কখনই খুঁজে পাওয়া যেত না। কাজেই  নিজের শহর বলে একে ভালবাসতেই হবে এমন বাধ্যতা আমার ছিল না। 

পৃথিবীর অন্য সকল জায়গার মত ওরানেও চিন্তাভাবনার সময়ের ঘাটতি ছিল। লোকজন পরস্পরকে ভালবাসত ভালবাসা সম্পর্কে তেমন কিছু না জেনেই। সবচেয়ে ব্যতিক্রম ছিল মৃত্যুর সময়কালের কষ্টকর অভিজ্ঞতা। কষ্টকর শব্দটা এখানে হয়ত যৌক্তিক না হয়ে অস্বস্তি বা আরামহীনতা শব্দটাই যৌক্তিক হবে। পৃথিবীতে তখনো  অনেক শহরই ছিল, যেখানকার মানুষেরা অসুস্থদের পাশে এসে দাঁড়াত।তাদেরকে সামান্য হলেও মনোযোগ দিত। কিন্তু ওরানের চরম উষ্ণ তাপমাত্রা, ব্যবসার জরুরী প্রয়োজন, চারদিকের অনুপ্রেরণাহীন পরিবেশ, রাত্রির আকস্মিক আগমন এবং আনন্দময়তার প্রকৃতির কারণে এইসব সহমর্মিতার বিষয়গুলো অনুপস্থিত ছিল। ফলে একজন অসুস্থ্য মানুষই খুবই একাকী অনুভব করত। সহমর্মিতার অভাবে।

এই শহরে একজন মৃত্যুমুখী মানুষের অবস্থা ছিল এরকম। প্রচন্ড গরমের ভেতরে চারদেয়ালের ভেতরে বন্দী হয়ে যখন সে একাকী মৃত্যু বরণ করত, তখন অন্যরা টেলিফোনে কথা বলত, জাহাজে মাল চালানের কথা আলোচনা করত, বিল অফ লেডিং, ডিসকাউন্ট ইত্যাদি নিয়ে নিজেদেরকে ব্যাপৃত রাখত। ওরান ছিল এমনই এক আধুনিক শহর। 

এই ধরণের বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষন আপনাকে শহরটি  সম্পর্কে সম্যক একটা ধারণা দেবে। তবে আমাদের কখনই অতিরঞ্জন করা উচিৎ হবে না। আমি এগুলো আপনাদেরকে বলেছি শুধুমাত্র শহরের অবয়ব ও জীবনকে বোঝানোর জন্যে। তারপরেও আপনি ইচ্ছে করলেই এই শহরে সমস্যাহীনভাবে বসবাস করতে সক্ষম হতেন। অভ্যাসের কারণে। কারণ অভ্যাসই ছিল একমাত্র জিনিস, যা এই শহর পছন্দ করত। 

আমাদের শহর ওরান কোন উত্তেজনাপূর্ণ শহর ছিল না। তবে এখানে সামাজিক অস্থিরতা বলেও  কোন কিছু ছিল বলে আমরা জানি না। শহরের নাগরিকেরা ছিল  স্পষ্টভাষী অথচ নম্র ও পরিশ্রমী। তারা বহিরাগত অতিথিদেরকে যথেষ্টই সম্মান করত। ফলে দিনশেষে বৃক্ষহীন, গ্ল্যামারহীন, আত্নাহীন ওরান শহরকে  প্রশান্তিময় জায়গা বলেই মনে হত এবং যে কেউই সেখানে আত্নপ্রসাদের সাথে ঘুমাতে পারত। 

আরও একটা কথা এপ্রসঙ্গে যোগ করা যৌক্তিক হবে বলে আমি মনে করি। সেটা হল ওরান শহরকে গড়ে তোলা হয়েছিল অনন্য ধরণের একটা ভূমির উপরে। এটার কেন্দ্রস্থলে ছিল একটা মালভূমি। চারদিকে ছিল উজ্জ্বল সব পাহাড়ের সারি। এবং শহরটি অবস্থিত ছিল একটি যথার্থ আকৃতির উপসাগরের উপরে। যদিও একটু খারাপ লাগতে পারে এই ভেবে যে, শহরের পেছনটা উপসাগরের দিকে মুখ করে ছিল। সামনের দিকটা নয়। ফলে শহর থেকে কখনই সাগর দৃশ্যমান হত না।  উপসাগরটিকে সব সময়েই খুঁজে নিতে হত। 

ওরানের স্বভাবিক জীবনের এই বর্ণনা আমাদেরকে বুঝতে সহায়তা করবে কি কারণে ওরানের জনগণ বিন্দুমাত্র ধারণাও করতে পারেনি সেই বছর বসন্তকালে সেই ঘটনাটি কেন ঘটেছিল। সেই দুর্যোগময় ঘটনাসমূহের  বর্ণনা আমি আপনাদেরকে দেব। কিছু কিছু মানুষের কাছে বর্ণনাটিকে   মনে হবে স্বাভাবিক।  অন্যদের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে। কিন্তু একজন বর্ণনাকারী এই মতপার্থক্যকে বিবেচনায় নিতে পারেন না। তার কাজ হল শুধুমাত্র বলা, ”এটাই হল সত্যিকারের ঘটনা।” কারণ, এই বর্ণনা থেকে ভবিষ্যতের মানুষেরা জানবে সেখানে  কি ঘটেছিল এবং  কিভাবে সেই ঘটনা সমগ্র জনপদের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। শুধু তাই নয়।  ঘটনার আরও সহস্র স্বাক্ষীরা তাদের হৃদয়ে সেই সত্যের মুখোমুখি হবেন।

আমরা জানি যে, এই ধরণের একটি কাজ সম্পাদন করার জন্যে বর্ণনাকারী (যার পরিচয় আপনাদেরকে যথাসময়ে দেয়া হবে) কোন সময়েই যথেষ্ট যোগ্যতা ধারণ করেন না। কারণ, এধরণের ঘটনা সম্পর্কিত সংবাদ সংগ্রহ করার অবকাশ সকলের হয় না। যদি না ভাগ্য তাকে অকুস্থলে টেনে নিয়ে যায় এবং নিবিড়ভাবে বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট রাখে। ইতিহাসবিদ হিসেবে বর্ণনাকারীর দায়িত্ব সম্পাদনের যৌক্তিকতাও এটাই।

সাধারণত একজন ইতিহাসবিদ (যিনি সৌখীনও হতে পারেন) সকল সময়েই তথ্য বা ডাটা (সেগুলো ব্যক্তিগত অথবা  সেকেন্ডারি হতে পারে) দ্বারা নির্দেশিত হয়ে থাকেন। এই বিশেষ ক্ষেত্রে আমাদের বর্ণনাকারীর কাছে তিন ধরণের তথ্য বা ডাটা ছিল। প্রথমত, তিনি যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য (বর্ণনাকারীকে ধন্যবাদ যে তিনি সাক্ষীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিগুলোকে অক্ষুণ্ণভাবে তুলে আনতে সমর্থ হয়েছেন)। তৃতীয়ত, ঘটনা পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত নথিপত্রগুলো। উল্লেখ্য, বর্ণনাকারী এই নথিপত্রগুলোকে বিভিন্ন সময়ে টেনে এনেছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী। সেগুলোকে তিনি ব্যবহার করেছেন সবচেয়ে ভাল ভাবে। যদিও সময়াভাবের কারণে তিনি প্রিলিমিনারিজ (preliminaries) এবং সতর্কতামূলক মন্তব্যের অংশটি মূল বর্ণনার সাথে দিতে পারেননি। অবশ্য ঘটনাসমূহের প্রথম দিককার দিনকাল সমূহের বর্ণনা বিস্তারিতভাবে দিতে পেরেছেন।

(এই পর্বের সমাপ্তি)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ