মৃত্যুর আগে রায়হানের শেষ চিৎকার ‘আমি চোর না, আমারে মাইরেন না’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৮ ১৪২৭,   ০৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

মৃত্যুর আগে রায়হানের শেষ চিৎকার ‘আমি চোর না, আমারে মাইরেন না’

সিলেট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:০৮ ১৪ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ২১:১৭ ১৪ অক্টোবর ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‘আমি চোর না, আমারে মাইরেন না’। বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্যাতনে মারা যাওয়ার আগে সিলেটের রায়হান উদ্দিন আহম্মেদ শেষবার চিৎকার করেছিলেন এভাবেই। নিজের জীবন বাঁচাতে পুলিশের কাছে এভাবেই আকুতি জানিয়েছিলেন। তবু বাঁচতে পারেননি তিনি।

ফাঁড়িতে ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের নির্যাতনে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয় রায়হানের। মৃত্যুর আগে রায়হানের শেষ চিৎকার শুনেছিলেন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পার্শ্ববর্তী কুদরত উল্লাহ বোর্ডিংয়ের এক ব্যক্তি। নাম হাসান আহমেদ। তিনিই জানালেন সেই রাতের ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা।

হাসান বলেন, আমি কুদরত উল্লাহ বোর্ডিংয়ের ১০২ নম্বর রুমে থাকি। সেই রাতে এক আত্মীয়কে ঢাকার বাসে তুলে দিতে কদমতলী টার্মিনালে গিয়েছিলাম। গভীর রাতে ফিরে আসার সময় শুনতে পাই ফাঁড়ির ভেতরে কেউ চিৎকার করে বলছে ‘আমি চোর না, আমারে মাইরেন না’।

তিনি আরো বলেন, মনে হচ্ছিল লোকটি কারো কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইছে। পরদিন সকালে পত্রিকায় রায়হানের মৃত্যুর খবর দেখি।

রোববার সকালে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান নামে ওই যুবকের মৃত্যু হয়। তিনি নগরীর আখালিয়া নেহারিপাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে।

নিহতের পরিবারের দাবি, ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করে রায়হানকে হত্যা করেছে পুলিশ। তবে, পুলিশের দাবি, নগরীর কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন রায়হান।

এ ঘটনায় রোববার রাতে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করেছেন তিনি।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রতিদিনের মতো শনিবার বিকেলে রায়হান নিজ কর্মস্থল স্টেডিয়াম মার্কেটের ডা. গোলাম কিবরিয়া ও ডা. শান্তা রাণীর চেম্বারে যান। পরদিন ভোরে ০১৭৮৩৫৬১১১১ নম্বর থেকে রায়হানের মা সালমা বেগমের মোবাইলে একটি কল আসে। কলটি রিসিভ করেন রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ।

ওই সময় মোবাইলের অন্যদিক থেকে রায়হান আর্তনাদ করে বলেন, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন। ছাড়া পেতে ১০ হাজার টাকা লাগবে। হাবিবুল্লাহ তাৎক্ষণিক ৫ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে গেলে এক পুলিশ সদস্য বলে, ’১০ হাজার চাওয়া হয়েছিল, পাঁচ হাজার কেন?’ ওই সময় রায়হানের খোঁজ জানতে চাইলে ওই পুলিশ সদস্য বলে, ‘সে ঘুমিয়ে গেছে। পুরো ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকালে আসেন’।

কথামতো ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফাঁড়িতে গেলে হাবিবুল্লাহকে জানানো হয়, রায়হানকে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর হাসপাতালে গিয়ে হাবিবুল্লাহ জানতে পারেন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে রায়হানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা হাসপাতালের মর্গে গিয়ে রায়হানের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ দেখতে পান।

নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বলেন, আমার স্বামীকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে হাত-পায়ে আঘাত ও নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। রাতভর নির্যাতনেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আকবর হোসেনসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরো তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বরখাস্তের পর থেকেই এসআই আকবর লাপাত্তা।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া বাকি তিন পুলিশ সদস্য হলেন- এএসআই তৌহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ, হারুনুর রশিদ। প্রত্যাহার হয়েছেন, এএসআই আশিক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী, কনস্টেবল সজীব হোসেন।

রায়হান হত্যা মামলা সিলেট মহানগর পুলিশের কাছ থেকে পিবিআইকে হস্তান্তর করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার সকল নথি পিবিআইকে হস্তান্তর করে এসএমপি। বুধবার তদন্তে নেমে বন্দরবাজার ফাঁড়ি পরিদর্শন, কাষ্টঘর এলাকায় গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলা ও নিহত রায়হানের বাড়িতে যায় পিবিআই।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর