সিলেট বন্দরের ‘ত্রাস’ আকবরের ভয়ংকর কাহিনি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১২ ১৪২৭,   ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সিলেট বন্দরের ‘ত্রাস’ আকবরের ভয়ংকর কাহিনি

সিলেট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:২৭ ১৪ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ২০:৪৭ ১৪ অক্টোবর ২০২০

সিলেট বন্দরের ‘ত্রাস’ আকবরের ভয়ংকর কাহিনি-ফাইল ছবি।

সিলেট বন্দরের ‘ত্রাস’ আকবরের ভয়ংকর কাহিনি-ফাইল ছবি।

সুদর্শন চেহারা থাকায় সিলেটের একটি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলে অভিনয় করতেন বরখাস্তকৃত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন। সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার চরিত্রে সাবলীল ছিলেন তিনি। এতে অনেকের কাছে সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে পরিচিতি পান আকবর। কিন্তু বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ১০ হাজার টাকার জন্য রায়হান উদ্দিন নামে এক যুবককে হত্যার অভিযোগের পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। সততার আড়ালে ভয়ংকর রূপি আকবর বন্দরবাজার এলাকায় গড়েছিলেন ত্রাসের রাজত্ব। সেই রাজত্বে একচ্ছত্র রাজা ছিলেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, বন্দরবাজার এলাকা ঘিরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন এসআই আকবর। অপরাধ চক্রের সহযোগিতায় বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। নিজেকে একচ্ছত্র রাজা মনে করে ত্রাস সৃষ্টি করতেন আকবর হোসেন। 

অভিযোগ রয়েছে, আকবরের সঙ্গে কথা বললেই টাকা প্রয়োজন। টাকা ছাড়া তিনি কথা বলেন না। কাজিরবাজার মাদরাসার শিক্ষক ফুয়াদ আদনান বলেন, আমার এক বন্ধু একটি কাজের জন্য একবার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে গিয়েছিলেন। এসআই আকবর তাকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বসেন। কাজটি করে দেয়ার জন্য আকবর ১ লাখ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় এসআই আকবর বন্ধুকে ফোন করে হুমকি দেন। হুমকি পেয়ে আমার বন্ধু স্ট্যাটাসটি মুছে ফেলে।

সিলেট নগরীর মহাজনপট্টির ব্যবসায়ীরা জানান, লকডাউনের সময় বাংলাদেশ পুলিশ মানবিক কাজে নিজেদের নিয়োজিত ছিল। কিন্তু আকবর ওই সময় চাঁদাবাজিতে লিপ্ত ছিলেন। লকডাউনের সময় মহাজনপট্টিতে দোকান খুলতে এসআই আকবরের অনুমতি লাগত। দোকানের শাটার খোলার ক্ষেত্রে চাঁদা নির্ধারণ ছিল। এক শাটার খুললে এক হাজার টাকা ও দুই শাটার খুললে দুই হাজার টাকা। নিজেকে রাজা ভেবেই কঠিন সময়ে দোকান খোলার অনুমতি দিয়ে টাকা নিতেন আকবর।

সিলেট নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় ছিল এসআই আকবরের চাঁদা বাণিজ্যের পরিধি। তার চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পায়নি হকাররাও। এছাড়া অসামাজিক কাজের জন্য হোটেল থেকে মাসোহারা আদায়, জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে চাঁদা আদায় করা তার নিয়মিত কাজ ছিল।

শুধু এ রকম চাঁদাবাজিই নয়, রাতে সড়ক থেকে নিরীহ লোকজনদের ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে যেতেন। মাদক ও অবাঞ্ছিত নারীদের দিয়ে আটক দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা ছিল তার নিয়মিত ঘটনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার নেতা জানান, বন্দরবাজার ফাঁড়ির আওতাভুক্ত এলাকায় সড়ক ও ফুটপাথে বসেন ৮০০-৯০০ ভাসমান হকার। প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০-৫০ টাকা করে চাঁদা নিতেন এসআই আকবর। তার পক্ষে কনস্টেবল জিয়াও এ চাঁদা তুলতেন। জিয়া এখন শিবেরবাজার ফাঁড়িতে বদলি হয়েছেন।

সিলেট নগরীতে ছয়টি হোটেল থেকে ২০ হাজার টাকা করে চাঁদা তুলতেন বরখাস্ত হওয়া এসআই আকবর। এর মধ্যে রয়েছে সুরমা মার্কেটের দুটি, মহাজনপট্টি ও কালিঘাটের দুটি ও জিন্দাবাজারের দুটি হোটেল।

এছাড়া জুয়াড়িদের কাছ থেকে সপ্তাহ মেয়াদে চাঁদা আদায় করতেন আকবর। বিশেষ করে কাস্টঘর, কিনব্রিজের নিচ ও কালিঘাট এলাকায় মাদক কারবারি ও জুয়াড়িদের কাছ থেকে চাঁদা তুলতেন তিনি। এছাড়া বন্দরবাজারকেন্দ্রিক একাধিক ছিনতাইকারী চক্রকেও শেল্টার দিতেন এসআই আকবর।

রাতে নিরীহ মানুষকে ধরে ফাঁড়িতে এনে টাকা আদায়ের নিয়মিত কাজের অংশে পড়ে যান সিলেট নগরীর নেহারিপাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান উদ্দিন। নির্যাতনের ফলে রায়হানের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাই রায়হানকে ছিনতাইকারী সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন আকবর।

তিনি দাবি করেছিলেন, নগরীর কাস্টঘরে ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এ রকম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বন্দরবাজার ফাঁড়ির লাগোয়া কুদরত উল্লাহ বোর্র্ডিংয়ের বর্ডার ব্যবসায়ী হাসান আহমদ বলেন, ঘটনা দিন রাতে এক আত্মীয়কে ঢাকার বাসে তুলে দিতে কদমতলী টার্মিনালে যাই। বোডিংয়ে ফিরে আসার পর ফাঁড়ির ভেতরে কারো চিৎকার শুনতে পাই। কেউ আকুতি জানিয়ে বলছে, ‘আমি চোর-ডাকাত না, আমাকে আর মেরো না।’ পরে তিনি সকালে জানতে পারেন, আগের রাতে ফাঁড়িতে রায়হান উদ্দিনকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে।

এদিকে, রায়হানের মৃত্যুর পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেনসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরো তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রায়হানের মৃত্যুর জন্য আকবরসহ ফাঁড়িতে কর্মরত সদস্যদের দায়িত্বহীনতা দায়ী ছিল বলে জানিয়েছেন এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার।

অন্যদিকে ঘটনার পর লাপাত্তা হয়েছেন বরখাস্তকৃত এসআই আকবর হোসেন। এ ঘটনার তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আলিশান বাড়ির সন্ধান মিলেছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ