কৌশিক থেকে নড়াইল এক্সপ্রেস, মাশরাফীর অজানা ছোটবেলা

ঢাকা, সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

কৌশিক থেকে নড়াইল এক্সপ্রেস, মাশরাফীর অজানা ছোটবেলা

আসাদুজ্জামান লিটন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:১১ ৫ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৩:১৬ ৫ অক্টোবর ২০২০

মাশরাফীর ছোটবেলার কিছু ছবি

মাশরাফীর ছোটবেলার কিছু ছবি

শুরু হয়েছে ২০০৭ বিশ্বকাপ। আগের দিনই জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার মারা যাওয়ার খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলাদেশে। ক্যারিবীয় দ্বীপে অবস্থান করা টাইগারদের মনের অবস্থাও ভালো না। বিমর্ষ চিত্তে সবাই বসে আছে, এর ভেতর চোখ লাল করে ফেলা একজন এসে বললেন, ধরে দিবানে।

হালকা জ্বর নিয়েও পরদিন ঠিকই কলার উঁচু করে ব্যাটসম্যানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বল হাতে ছুটে আসেন তিনি। দারুণ গতিতে শুরুতেই আউট করেন ভারতের বীরেন্দ্র শেবাগকে। শুরুর এই ধাক্কা আর নিতে পারেনি দলটি, ম্যাচটি জিতে যায় বাংলাদেশ। এরপর আরো বহুবার ছুটে এসেছেন এভাবে। নিজে হেসেছেন, জিতিয়েছেন দলকে।

একটা সময় জোরে বল করতে পারা বোলারের জন্য হা-হুতাশ করতো বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। অপেক্ষা ও আক্ষেপের পালা পেরিয়ে ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব হয় উপরে বর্ণনা দেয়া বোলারটির, যার ডাক নাম কৌশিক। তার গতির সামনে পরাস্ত হতে থাকে বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যান। সবার কাছে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নামে পরিচিত এই অতিমানবের পরের গল্পটা প্রায় সবারই জানা। তবে মাশরাফীর নড়াইল এক্সপ্রেস হয়ে ওঠার আগের গল্প কয়জন জানেন?

মায়ের সঙ্গে মাশরাফীমাশরাফী নামটা শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে কলার উঁচু করে তে সামনে তাকিয়ে থাকা এক অনুপ্রেরণার নাম। সকল বাধা বিপত্তিকে ছাপিয়ে দুর্বার গতিতে যিনি এগিয়ে আসেন, হাতের গোলার সাহায্যে ভেঙ্গে দেন উইকেট।

১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবরের কোনো এক সময়ে নড়াইলে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। নানী বিশ্বাস করতেন, মাশরাফীর মা তখনো বাচ্চা লালন-পালনের উপযুক্ত হতে পারেননি। ফলে নিজেই শুরু করেন মাশরাফীর দেখা শোনা।

আসলে মাশরাফীর মায়ের কাজের চাপ কমাতেই তার নানী এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিজেদের বাসা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দুরত্বে নানা বাড়ি। ফলে শিশু কৌশিকের তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি।

মাশরাফীর বাবা ছিলেন বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা। বয়স যখন ছয় মাস তখন চাকুরির কারণে নড়াইল ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন তার বাবা। অবশ্য মাশরাফী থেকে যান নানির কাছেই। প্রিয় ছেলেকে দেখতে পনেরো দিন পর পর নড়াইল আসতেন মা। দু’বছর এভাবে চলার পর চাকরি ছেড়ে নড়াইল এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন মাশরাফীর বাবা।

কিশোর মাশরাফীছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি মাশরাফীর অনেক আগ্রহ ছিল। বাড়ির পাশেই ছিল স্কুল মাঠ, সেখানে ক্রিকেট খেলতেন বড়রা। বলা যায় তখনই ক্রিকেটের প্রতি মাশরাফীর আকর্ষণ তৈরি হয়। খেলার জন্য প্রায়ই উইকেটকিপারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন জাতীয় দলের সফলতম এই অধিনায়ক। কিন্তু আহত হওয়ার ভয়ে বড়রা সরিয়ে দিত তাকে।

মাশরাফীর অন্য নাম যে কৌশিক তা প্রায় সবাই জানে। তবে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নামকরণের পেছনে রয়েছে মজার এক ঘটনা। তার জন্মের আগে ১৯৮০ সালের দিকে কৌশিক চ্যাটার্জি নামে একজন ভারতের একটি অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করতেন। তখনই ওই নামের প্রেমে পড়ে যান মাশরাফীর মা হামিদা মোর্ত্তজা। সেখান থেকে পরিবারের বড় ছেলের নাম রাখেন কৌশিক। অন্য দিকে তার চাচা নাম রাখেন মাশরাফী বিন মোরসালিন।

সবই ঠিক ছিল, কিন্তু বাধ সাধল এত বড় নাম নিয়ে। স্কুলের শিক্ষকরাও বললেন, নামটা বেশি বড় হয়ে যায়। এ নিয়ে শুরু হলো আলাপ আলোচনা। মাশরাফী ও মোরসালিন দুটোই ইসলামী নাম, তাই কোনোটাই কেউ বাদ দিতে চাচ্ছিল না।

এসময় নড়াইল এক্সপ্রেসের কাকা বললেন, তাহলে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা রাখেন। মাশরাফীর নামের সঙ্গে থাকা মোরসালিন অংশটি যুক্ত হয় দ্বিতীয় সন্তানের নামে। এ কারণেই মাশরাফীর ছোট ভাইয়ের নাম মোরসালিন বিন মোর্ত্তজা।

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাছোট থেকেই ক্রিকেটের প্রতি মাশরাফীর অগাধ ভালোবাসা ছিল। ক্রিকেটের প্রেমে পড়ার পর তিনি মূলত ব্যাটসম্যান হতে চেয়েছিলেন। ব্যাট হাতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর অনেক ম্যাচেই রেখেছেন জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার। ছোটবেলায় তার কাজ ছিল মূলত দুটি। পড়াশোনা আর ক্রিকেট খেলা। অবশ্য চিত্রা নদীতে সাঁতার কাটাও তার প্রিয় কাজগুলোর একটি ছিল।

এভাবেই চলতে থাকে মাশরাফীর দিন কাল। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন ছোট্ট কৌশিক। নব্বইয়ের দশকে নড়াইলের ক্রিকেটার ও সংগঠক শরীফ মোহাম্মদ হোসেন উঠতি তরুণদের যত্ন নিতেন। তার মাধ্যমেই বলা যায় ক্রিকেটার হওয়ার পথে পা বাড়ান মাশরাফী। মাত্র ১১ বছর বয়সের মাশরাফীকে নিজের দল নড়াইল ক্রিকেট ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেন শরীফ। প্রথম থেকেই গতি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মাশরাফী।

১৯৯১ সালের দিকে মাগুরায় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় বিকেএসপির কোচ বাপ্পির সান্নিধ্যে এসে বোলিংয়ের অনেক মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হন মাশরাফী। পরের বছর নড়াইলে এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালাচ্ছিলেন জাতীয় কোচ ওসমান খান। তখন খুলনায় খেলার জন্য আমন্ত্রণ পান ম্যাশ। খুলনায় গতি ও সুইং দিয়ে হইচই ফেলে দেন এই পেসার। সেই সূত্রে সুযোগ পেয়ে যান খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে।

কলার উঁচু করেই সবসময় বল হাতে দৌড়ে এসেছেন মাশরাফীঅল্প সময়ের মাঝেই জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পান মাশরাফী। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তৎকালীন কোচ অ্যান্ডি রবার্টস তাকে দেখেই বলে দিয়েছিলেন, এর যত্ন নিও। ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে। জহুরি ভুল বলেননি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিজেকে দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

অনুর্ধ্ব-১৯ দলে থাকা অবস্থায় দারুণ পারফরম্যান্সের কারণে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পান মাশরাফী। সে সময় অবশ্য এ নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। কারণ ঢাকার কোন সিনিয়র ডিভিশন লিগেও খেলেননি মাশরাফী। তবে বল হাতেই সমালোচকদের সব কথার জবাব দিয়েছিলেন নড়াইল এক্সপ্রেস। সেই সিরিজে এক ম্যাচেই চার উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।

এরপর মাশরাফীকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। নড়াইল এক্সপ্রেস খেতাব পেয়ে যান পরের নিউজিল্যান্ড সিরিজেই। অবশ্য মাঝে মাঝে যে পিছনে তাকাতে হয়নি তা নয়। ইনজুরি নামের এক শত্রু বারবার ছিটকে দিতে চেয়েছে তাকে। তবে চিত্রাপাড়ের ছেলেটি যে অন্য ধাতুতে গড়া। তাই ঘাড়ের রগ বাঁকা করে বারবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, ছুটে এসেছেন বল হাতে।

মাশরাফী নামই যেন এক অনুপ্রেরণালাল সবুজের জার্সি গায়ে ৩৬ টেস্টের ৫১ ইনিংসে ৭৯ উইকেট, ২২০ ওয়ানডে ম্যাচে ২৭০ উইকেট বা টি-টোয়েন্টিতে ৫৩ ইনিংসে ৪২ উইকেট মাশরাফীকে বোঝাতে সক্ষম নয়। ব্যাট হাতে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ২৯৬১ রানও দলে তার গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম নয়। যার নেতৃত্বে বদলে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট, পরিসংখ্যানের ঠুনকো এসব সংখ্যা তাকে মাপার কোনো যোগ্যতাই রাখে না।

জাতীয় দলে এখন শুধু ওয়ানডে ফরম্যাটে খেলে যাচ্ছেন মাশরাফী। বয়স বিবেচনায় সামনে আর কতটা সুযোগ পাবেন তা প্রশ্ন করার অবকাশ রয়েই যায়। তবে যতদিন এ দেশের ক্রিকেট থাকবে, মাশরাফী নামটা থাকবে কিংবদন্তির কাতারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএল