পর্যটকে পেট চলে যাদের

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১০ ১৪২৭,   ০৭ রবিউস সানি ১৪৪২

পর্যটকে পেট চলে যাদের

মুমিন মাসুদ, কক্সবাজার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫৮ ১৮ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৮:৪৬ ১৮ আগস্ট ২০২০

পর্যটকের অপেক্ষায় বিক্রেতারা

পর্যটকের অপেক্ষায় বিক্রেতারা

কক্সবাজারের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সুগন্ধা পয়েন্ট। পড়ন্ত বিকেলের রোদ মাথায় নিয়ে পর্যটকদের দিকে তাকিয়ে আছে সড়কের ধারের কিছু মানুষ। সামনে আছে বিভিন্ন পুঁতির মালা, ঝিনুকের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র, হরেক রকমের আচার ও বেলুন। অনেকেই হরেক রকম পিঠা সাজিয়ে বসেছেন ক্রেতার অপেক্ষায়।

করোনার কারণে বন্ধ থাকার পর অবশেষে কক্সবাজার খুললেও দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর এসব মানুষের দিকে ফিরে তাকান না কোনো পর্যটক। তবু তারা তাকিয়ে থাকে ভাগ্যের আশায়। হয়তো দিন শেষে ভাগ্যলক্ষ্মী ধরা দেবে।

তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট সোহেল। জুলাইতে তার বয়স ১৬ শেষ হয়েছে। কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগরে বাড়ি হলেও সারাদিনই কাটে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে। পুঁতির মালার ব্যবসা করেন তিনি। একটি অস্থায়ী ট্রে বা ভ্যানে সুন্দরভাবে সাজানো ঝকঝকে পুঁতির মালা বিক্রেতাদের অনেককেই দেখা গেছে। এমনই একটি ট্রে’র পাশে দাঁড়িয়ে ক্রেতা ডাকতে ডাকতে দিন কেটে যায় সোহেলের।

ডালা সাজিয়ে পুঁতির মালা বিক্রি

বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতে চোখেমুখে আঁধার নামিয়ে বললেন, মা-বাবাসহ আমরা ছয় ভাই-বোনের সংসার। বাবা এখন কোনো কাজ করেন না। বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে। তার আলাদা সংসার। মেজ ভাই আর আমি মিলে সংসারে জোগান দেই। মেজ ভাই রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন।

তিনি বলেন, পর্যটকের আগমনেই আমাদের ব্যবসা জমে ওঠে। কিন্তু করোনার কারণে এবারের ব্যবসা তেমন হয়নি। স্বাভাবিক সময়ে এখানকার একেকজন ব্যবসায়ী এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করেন।

করোনার প্রভাব ও লকডাউনের কথা জিজ্ঞেস করলে সোহেল বলেন, এবারের আয় পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে৷ বেশি আয়ের সম্ভাবনা নেই। নতুন ডিজাইনের কোনো পণ্য আনতে পারিনি।

প্রায় একই কথা বলেছেন সোহেলের আরেক বন্ধু রিয়াজ। দুই ভাই ও তিন বোনের পরিবারে তিনি প্রধান আয়ের উৎস। সবার বড় হওয়ায় পরিবারের খরচ জোগানের দায়িত্বও তার।

রিয়াজ বলেন, পুঁতির মালাগুলো ঢাকার চকবাজার থেকে পাইকারিতে কিনে আনা হয়। এখানে যারাই মালার ব্যবসা করেন সবাই একসঙ্গে অর্ডার দেই। কিন্তু লকডাউনে ব্যবসা করতে পারিনি। নতুন পণ্য আনার মতো মূলধনও নেই।

বিক্রির আশায় কলা-বেলুন নিয়ে ঘোরাঘুরি

বিভিন্ন রঙয়ের পুঁতি নিপুণ গাঁথুনির সাহায্যে তৈরি হয় প্রতিটি মালা। কানের দুল, নাকের ফুল, চুল বাঁধার ব্যানসহ বিভিন্ন রকমের ব্রেসলেটও তাদের কাছে পাওয়া যায়। সুলভ মূল্যে তারা এ ব্যবসা করছেন প্রায় ছয় থেকে সাত বছর। আবার কারো ব্যবসার বয়স এক যুগও পেরিয়ে গেছে।

প্রায় ১৪ বছর ধরে মালা ব্যবসা করছেন সিরাজ উদ্দিন। মালা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও ক্যাপ বিক্রি করেন তিনি। পরিবারে স্ত্রীসহ আরো পাঁচ সদস্য রয়েছেন।

লকডাউনের সময়গুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে ৪৩ বছর বয়সী সিরাজ বলেন, বিভিন্ন সময়ে বন্যা বা দুর্যোগ দেখেছি। তখন পর্যটক কমলেও এমন হয়নি। আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। বিচে দেয়া এ দোকান থেকে আমার প্রতি মৌসুমে প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা আয় হয়। কিন্তু এ বছর আর তেমন হবে না।

একই ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন সমুদ্র সৈকতে পানি বিক্রেতা নাসির, বাদাম বিক্রেতা নুরুল আমিন এবং ঝালমুড়ি বিক্রেতা কবির হোসেন। তারা বলেন, আমরা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ। একদিন বন্ধ থাকলে বাড়ির চুলায় আগুন জ্বলে না। আমাদের ব্যবসা হলো নির্দিষ্ট সময় ও পর্যটক নির্ভর৷ এবার করোনার কারণে আমাদের ব্যবসাও বন্ধ ছিল।

এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘ পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর সোমবার সকাল থেকে কক্সবাজারে পর্যটন কেন্দ্রিক হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, বার্মিজ দোকানসহ সব ধরনের পর্যটন ব্যবসা খুলেছে। এরইমধ্যে অনেক হোটেল-মোটেলে বেড়াতে আসার জন্য রুম বুকিং দিতে শুরু করেছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর