‘হিজড়াদের হাতে জিম্মি আমরা’

ঢাকা, সোমবার   ১৪ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১ ১৪২৮,   ০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

‘হিজড়াদের হাতে জিম্মি আমরা’

শাহজাদা এমরান, কুমিল্লা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪০ ২ মার্চ ২০২০  

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

কুমিল্লা সদরসহ জেলার সর্বত্র হিজড়াদের চাঁদাবাজির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। তাদের চাঁদাবাজির কারণে অনেক জায়গায়ই লাঞ্চিত হচ্ছে অনেক ভদ্র পরিবার। লোক-লজ্জার ভয়ে অনেক সময় নীরবে সহ্য করেন অনেকে। আবার অনেকে প্রতিবাদও করেন।

প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে হিজরাদের আচরণ হয়ে যায় একেবারেই অশালীন। বিশেষ করে বিয়েসহ যেকোনো অনুষ্ঠান হলেই সে স্থানে তাদের আগমন হয়ে যায় এক প্রকার ক্যাডারের মতো। এসব অনুষ্ঠানে হাজার টাকার নিচে দিলেই শুরু হয় বচসা।

জানা যায়, সাধারণ মানুষের সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সহায়তার উপর নির্ভর করেই চলে হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবন-যাপন। তবে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে দোকানিদের ওপর হামলে পড়া, বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠান, বাসাবাড়িতে নবজাতকের আগমনের খবরে দলবলে হাজির হয়ে পরিবারের থেকে টাকা আদায়, যৌন প্রতারণা, যেকোনো বিনোদনস্থানে কাউকে জিম্মি করে সর্বস্ব লোপাট- এমন বহু অভিযোগ হিজড়াদের কয়েকটি দলের বিরুদ্ধে রয়েছে।

হিজড়ারা বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নামে বিভক্ত হয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি করছেন। গেল কয়েক মাস ধরে তাদের মাত্রাতিরিক্ত অসদাচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসী। 

কুমিল্লা নগরীর পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সামনে, রাস্তার পাশে দোকানে, ফুটপাতের দোকানে জোর করে তারা চাঁদাবাজি করছে। বাসা-বাড়িতে গিয়ে হিজড়ারা চাঁদা চায়, টাকা না দিলে হুমকিসহ নানা ধরনের অশ্লীল ভাষা ও অঙ্গভঙ্গি করে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে টাকা-পয়সা দিতে বাধ্য করছে তারা।

নগরীর দক্ষিণ চর্থা এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম জানান, চাঁদা দিতে হয়। নয়তো তারা অপমান করে। কোনো একটা অনুষ্ঠান করতে গেলে দলবল নিয়ে চলে আসে তারা। বলতে লজ্জা হয় তারপরেও বলছি, মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা হিজড়াদের হাতে জিম্মি হয়ে আছি। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজর দেয়া উচিত। 

দিশাবন্দ গ্রামের নারগিস বেগম জানান, প্রায়ই বাসায় এসে চাঁদা দাবি করে। নয়তো জামা কাপড় নিয়ে যায়। ভাঙচুর করে। তাই বাধ্য হই চাঁদা দিতে। নয়তো বড় কোনো ক্ষতি করে ফেলে। 

সদর দক্ষিণের পদুয়ার বাজার সংলগ্ন বিশ্বরোড এলাকার ব্যবসায়ী রাসেল আহম্মেদ জানান, বিশ্বরোডে যে কোনো বাস থামলেই তারা গ্রুপ নিয়ে উঠে যান। টাকা না দিলে উলঙ্গ হয়ে যায়। মানুষ তো লজ্জায় তাদের টাকা দিতে বাধ্য। দোকানে এসেও চাঁদাদাবি করে, যখন যা পারি তা দিয়ে বিদায় করি। কিছু তো করার নেই। পুলিশের সামনেই চাঁদাবাজি করে। তারা তো নিষেধ করে না।

এ বিষয়ে পদুয়া বাজারে বিশ্বরোড এলাকায় রন্টি নামে একজন হিজড়া জানান, আমরা চাঁদাবাজি করি না। কিছু হিজড়া আছে তারা চাঁদাবাজি করে। আমরা মানুষের কাছে হাত পাতি। তারা যা দেয় তাই নিই।

কুমিল্লা রেলস্টেশন এলাকার হিজড়াদের নেতা আয়েশা জানান, সরকার যে টাকা দেয় সেটা খুবই কম। আল্লাহ হিজড়া বানাইছে। কোনো কর্মে আমাদের নেয়া হয় না। সাধারণভাবে জীবন-যাপন করতে গেলেও মানুষ তাকিয়ে থাকেন। হাসাহাসি করেন। পরিবার থেকেও আলাদা, কি করবো বলেন? বেঁচে থাকার জন্য তো ভাত-কাপড় প্রয়োজন। তাই জোড় করি না, যে যা দেয় খুশি হয়ে তাই নিই। তবে সব জায়গায় যেমন ভালো নেই ঠিক তেমনি আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যেও সবাই ভালো না। তবে কিছু চাঁদাবাজ হিজড়ার জন্য তো আমরা সবাই দোষী হতে পারি না।

সমাজসেবা অধিদফতর কুমিল্লা জেলার উপ-পরিচালক জেড এম মিজানুর রহমান জানান, সরকারি হিসেবে কুমিল্লার ১৮টি উপজেলায় দুই শতাধিক হিজড়া রয়েছেন। তাদের সরকার দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। কুমিল্লায় তাদের জন্য কম্পিউটার, সেলাই, পার্লারের কাজ, বাটিকের কাজ শিখানো হয়েছে। সরকারি হিসাবে যারা আছেন তাদের ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
 
এদিকে হিজড়াদের নিয়ে কাজ করেন এমন একটি সংস্থার কর্মী জানান, সরকারিভাবে কুমিল্লায় দুই শতাধিক হিজড়ার কথা বলা হলেও এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণের কিছু বেশি হতে পারে। তিনি দাবি করেন, আমাদের সমাজে হিজড়াদের সেভাবে এখনো গ্রহণ করে না। তাদের যদি স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা যায় তবে এসব চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম