Alexa জীবনযুদ্ধে নওগাঁর ৫ জয়িতা

ঢাকা, বুধবার   ১৭ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৪ জ্বিলকদ ১৪৪০

জীবনযুদ্ধে নওগাঁর ৫ জয়িতা

নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১২:১৮ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার | আপডেট: ১২:৩২ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সফল জয়িতা হিসেবে ‘জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ’ এর সম্মাননা পেয়েছেন নওগাঁর ৫ নারী। আন্তর্জতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন উপলক্ষে তারা এ সম্মাননা পেয়েছেন। ৯ ডিসেম্বর ২০১৮ সাপাহার উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা ও মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উদ্যোগে তাদের এ সম্মাননা দেয়া হয়। 

নারী প্রতিবন্ধকতা ও সফলতা ক্যাটাগরিতে উপজেলার ওড়নপুর গ্রামের আসমা বেগম জীবন সংগ্রাম করে আর্থিকভাবে সফল হয়েছেন। ২০১৪ সালে ব্র্যাক থেকে ১০,০০০টাকা ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগি পালনের কাজ শুরু করেন। হাঁস-মুরগি পালনের সফলতা আসায় টেইলারিং এর কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তার এই আত্ম-কর্মসংস্থান মূলক কাজে ২,০০,০০০/- টাকার পুঁজি রয়েছে। অন্যরাও এতে উৎসাহিত হচ্ছেন। প্রবল মানসিক ইচ্ছাশক্তিতে বলিয়ান হয়ে আর্থিকভাকে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে নারী প্রতিবন্ধকতা ও সফলতা ক্যাটাগরিতে সদরের করলডাঙ্গা গ্রামের অনিতা রায় ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতায় বড় হয়েছেন। তারা দুইবোন। ২০১৭ সালে দিনমজুর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুতে অনিতা রায় আজও প্রতিকূলতা থেকে বের হতে পারেনি। তার বেতনে চলে ছোটবোনের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ। অনিতা রায় ছোটবেলা থেকেইে দেখেছে বাবা মজুরির টাকা মায়ের হাতে দিতেন। মা এই টাকা দিয়ে তাদের লেখা-পড়া ও সংসারের অন্যান্য খরচ চালাতেন। অনিতা ২০০৫ সালের একটি ঘটনার কথা ভুলতে পারেন না। তখন ৮ম শ্রেণিতে। তিনি জানতেন মাস শেষ হলে তার বাবার চিন্তা আরো বেরে যায়, কিভাবে দুটো মেয়ের প্রাইভেটের বেতন দিবেন। একদিন তার বাবা গায়ে জ্বর নিয়ে কাজে গেলেন। অনিতা রায় প্রায়দিনই বাবার সকালের খাবার দিয়ে স্কুলে যেতেন। সেদিনও খাবার নিয়ে গেলেন। বাবার কপালে হাত দিয়ে দেখেন গায়ে জ্বর আছেই। কাজ করতে নিষেধ করলেন। তার বাবা শুনলেন না এবং বললেন, কটা দিন পরেইতো মাস শেষ হবে। তোর প্রাইভেটের বেতন দিতে হবেরে মা। মাঠে কাজ করলে এরকম গা গরম থাকেই। তুই কোন চিন্তা করিসনে। আমি ঠিক আছি, আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। কাজ শেষে গোসল করলে গায়ের এই গরম আর থাকবেনা। তুই স্কুলে যা।

বাবার এমন কষ্ট অনিতাকে খুব ভাবাতো। প্রতিবেশীরাও তার বাবাকে বলতো মেয়েকে বিয়ে দিতে। তাদের কথা শুনতেন না। কিন্তু সবার পরামর্শে একদিন তার বাবা হার মানলেন। বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়ে অনিতা রায়কে বিয়ে দিবেন। অনিতা রায় তখন অষ্টম শ্রেণিতে। অনিতা তাতে রাজী হলেন না। বাবা-মাকে বললেন, তোমরা আমাকে নিয়ে কোন চিন্তা কর না। আমার মনোবল আছে। আমি দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে পারবো, যা তোমরাই শিখিয়েছ। অন্যের কথায় কান দিও না।

‘সফল জননী নারী’ প্রতিবন্ধকতা ও সফলতা ক্যাটাগরিতে সদরের (সাপাপাড়া)র আলো রানী সাহা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এইচএসসি পাশের পর তার বিয়ে হয়। স্বামী বেকার। তিনি বলেন, বিয়ের পর তাদের অভাবের সংসারে এক ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। আলো রানী সাহা তখন থেকেই ভাবতে থাকেন তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাবা ও স্বামীর দারিদ্রতা তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। এ লক্ষ্যে তার স্বামীর মনোযোগ তৈরি করেন আত্ম-কর্মসংস্থানের প্রতি। চালু করেন সামান্য পুঁজির এক পানের দোকান। প্রতি দিনের পান বিক্রি থেকে যে লাভ হতো তা দিয়ে চালিয়ে নিত তাদের দৈনন্দিন খরচ। আলো রানী সাহা ছিল আত্মনির্ভরশীল। সন্তানের পড়া লেখার খরচের জন্য স্বামীর প্রতি নির্ভরশীল ছিলেন না। তিনি টিউশনি করতেন। যে টাকা পেতেন তা দিয়ে তিনি একমাত্র ছেলে অনিকের লেখা-পড়ার খরচ চলত। তিনি নিজেও তার ছেলেকে পড়াতেন। কিন্তু আলো রানী সাহার সংসারে আর্থিক সংকট লেগেই থাকতো। তাদের সংসার চলত কঠিন নিয়মের এক ছকে। 

তিনি বলেন, বর্তমানেও তাদের সংসারে অভাব অনটন লেগেইে আছে। অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে আলো রানী সাহা সমস্ত প্রতিকুলতাকে জয় করে তার সন্তানের লেখা পড়া চালিয়ে গেছেন এবং সন্তানকে স্বপ্ন দেখাতেন। অনিক এখন মা-বাবার স্বপ্ন পূরণের মহাসড়কে। বর্তমানে তার একমাত্র ছেলে অনিক রাজশাহী মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে পড়ছেন। 

‘নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী’ প্রতিবন্ধকতা ও সফলতা ক্যাটাগরিতে উপজেলার শিয়ালমারী গ্রামের জবেদা খাতুন নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যেমে জীবন শুরু করেছেন। তার আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। বিয়ের পর থেকে স্বামী তাকে যৌতুকের জন্য শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। তালাকের পর চরম দারিদ্রতা মোকাবেলা করেছেন। সমাজের কিছু লোকের অনেক কটুকথা ও সমালোচনার শিকার হন।

‘সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী’ প্রতিবন্ধকতা ও সফলতা ক্যাটাগরিতে সফল জননী ফাহিমা বেগম ছোটবেলা থেকেই বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজ করতেন। ১৯৮৫ সালে নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলায় তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর সমাজসেবা কাজে স্বামীর উৎসাহ পেয়েছেন। দু:খের বিষয় তার স্বামী ১৯৯৭ সালে স্ট্রোক করেন। ১২ বছর চিকিৎসাধীন থেকে ২০০৯ সালে মারা যান। বিবাহের পর থেকে সাপাহার উপজেলার সদর ইউপিতে যৌতুক প্রথা নিরোধ, আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন, সমাজের অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাড়ানোসহ সমাজ সংস্কারে বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ায় এক শ্রেণির মানুষ তার কাজের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। 

২০০৩ সালে সাপাহার ইউপি নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে তিনি প্রথম জয়ী হন। ২০০৮ সালে ইউপি নির্বাচনেও একই পদে ২য় বার জয়লাভ করেন। ফাহিমা ২০০৩ সালে ইউপি মেম্বার পদে ভোটের মনোনয়ন জমা দেয়ার পর পারিবারিক ও পারিপার্শিক বাধার সম্মুখীন হন। প্রথম নির্বাচনে তার স্বামী ও শ্বশুর-শ্বাশুরীকে পাড়া প্রতিবেশীর নানান কটু কথা শুনতে হয়েছে। তার শ্বাশুরী বলে ছিলেন, ঘরে অসুস্থ স্বামী, সংসারে অভাব অনটন লেগেই আছে। বউমা ভোট করবে কি দিয়ে। সংসারটা শেষ হয়ে যাবে। আর এলাকার বউ মানুষ এ-গ্রাম ও-গ্রাম ছুটে বেরাবে, কত রকম লোকের সাথে কথা বলবে তার নেই শেষ।

২০০৩ হতে ২০১৫ পর্যন্ত একটানা ১২ বছর ইউপির সংরক্ষিত আসনে সদস্য ছিলন। স্বামীহারা এই নারীর রয়েছে প্রবল আত্মবিশ্বাস ও জনসাধারণের অশেষ ভালবাসা। তিনি দেখে দিয়েছেন কোন বাধাই তাকে থামাতে পারেননি। জনসাধারণের অশেষ ভালবাসায় ফাহিমার আগ্রহ ও প্রত্যাশা আরো বেড়ে যায়। ২০১৭ সালে নওগাঁ জেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংরক্ষিত (সাপাহার-পোরশা-নিয়ামতপুর) আসনে জয়লাভ করেন। বর্তমানে তিনি নওগাঁ জেলা পরিষদের সদস্য। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম