Alexa বাস্তবের ওয়ান্ডার ওমেন যার বিচরণ জলে, স্থলে ও বাতাসে 

ঢাকা, রোববার   ১৮ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৩ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

বাস্তবের ওয়ান্ডার ওমেন যার বিচরণ জলে, স্থলে ও বাতাসে 

ফিচার ডেস্ক

ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত : ১১:৪০ এএম, ১২ জুলাই ২০১৯ শুক্রবার | আপডেট: ০৪:১৫ পিএম, ১৪ জুলাই ২০১৯ রোববার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গল্পের বইয়ে কিংবা রূপালী পর্দায় ওয়ান্ডার ওম্যানের দুর্দান্ত সব অ্যাকশন দেখেছেন নিশ্চয়ই! তবে এ কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। এক বাস্তব ওয়ান্ডার ওমানের কাহিনি, যার নাম কিটি ও’নিল। তাকে শুধু ওয়ান্ডার ওমেন বলে জানলেই হবে না। তবে ১৯৭০ দশকের বিখ্যাত টিভি সিরিজ ওয়ান্ডার ওম্যানের প্রধান চরিত্র লিন্ড্রা কার্টারের স্টান্ট রুপে কাজ করে এ আখ্যা পান তিনি। তবে কিটির কৃতিত্ব কেবল ওটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থলে, জলে এবং বাতাসে তিনি গতিশীলতা এ অসাধারণ সব রেকর্ড গড়ে ওঠে, তাকে ভূষিত করা হয় ‘বিশ্বের দ্রুততম নারী’ হিসাবে। সর্বমোট ২২ টি বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন তিনি। 

অথচ বিস্ময়ের কথা কি জানেন? ছোটবেলা থেকেই তিনি শারীরিকভাবে শতভাগ সুস্থ ছিলেন না। বধির ছিলেন তিনি। তবুও এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জীবন চলার পথ বাঁধার কারণ হয়ে উঠবে। কেননা তিনি নিজেই বলতেন, ‘আমি জানি আমি বধির। কিন্তু তারপরও আমি স্বাভাবিক। যেভাবে আমি বিষয়টা চিন্তা করি, প্রতিবন্ধী হওয়া কোন ত্রুটি নেই। মানুষ আমাকে বলে, আমি নাকি কিছু করতে পারি। আমি তাদের বলি, আমি চাই যে সবকিছুই আমি করতে পারি।

যেভাবে বধির হলেন
কিটির জন্ম ১৯৪৬ সালে, টেক্সাসের করপাস ক্রিসটি। মাত্র চার মাস বয়সে একবার হাম, গুটিবসন্ত হয় তার। এর ফলে প্রচণ্ড জ্বর আসে। জ্বরের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত তার। কিন্তু দুই বছর বয়স পর্যন্ত তার বাবা-মা বুঝতে পারছেন যে, সেই জ্বরে শ্রবণশক্তি হারিয়েছে সে! তার ছোটবেলার আরো একটি বড় ট্র্যাজেডি ছিল বিমান দুর্ঘটনায় বাবা হারানো।

প্রতিবন্ধকতা জয় খেলা আটকে রাখা
বাবার আকস্মিক মৃত্যুর তার মা একাই তাকে বড় হয়ে যায়। মা-ই জোর করে লিপ রিডিং শিখিয়েছেন তাকে, যেন মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেন তিনি। তবে অন্য একটি বিষয় তাকে জোর করা হয়েছে। সেটি হল খেলাধুলা। বধির হওয়ার কারণেই, অন্তত তার নিজের এটাই বিশ্বাস, তিনি ছোটবেলা থেকেই খুব ইতিবাচক মানসিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মনে করেন, মানুষের কাছ থেকে সহানুভূতির কোনো প্রয়োজন নেই, বরং মানুষকে দেখানো দরকার যে তিনিও আর দশটা সাধারণ বাচ্চার মতই সবকিছু করতে সক্ষম। নিজেকে প্রমাণের লক্ষ্যে প্রথমে ডাইভিং শুরু করেন তিনি। অভাবিত সাফল্যও পাওয়া যাচ্ছে। তার কোচ স্যামি লির ভাষ্যমতে, ‘ক্ষুধার্ত মাছের মতো’ একটার পর এক ট্রফি জিততে শুরু করে তিনি। কিন্তু ১৯৬৪ সালে অলিম্পিক গেমসের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কব্জি ভেঙ্গে যায়, আর সেখান থেকে আক্রান্ত স্প্যানাল মেনিনজাইটিস।

ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়া এবং এথলেটিক্সকে বিদায়
এক পর্যায়েও মনে করেন, তিনি হয়তো আর কোনোদিন হাঁটতে পারবেন না। কিন্তু সেই অবস্থা থেকেও সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন তিনি। তবে দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়েনি। বয়স বিশের কোঠায় থাকতেই দু’বার ক্যান্সারের মুখোমুখি হতে হবে। প্রবল বিক্রমে তিনি জয় করেন ক্যান্সারকেও। কিন্তু ডাক্তাররা সাফ জানিয়ে দেয়, শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া তার পক্ষে এবং এথলেটিক্স ক্যারিয়ারে অগ্রগতি সম্ভব নয়।

এবার শুরু রেসিং
কিটির রক্তে যে খেলাধুলা আর প্রতিযোগিতার নেশা ঢুকছে। তখন চাইলেও সেগুলো ছেড়ে দিয়ে সাধারণ কর্মজীবন বেছে নেয়া তার সম্ভব নয়। তাই তিনি ঠিক করেন, রেসিং শুরু করবেন। বিভিন্ন মোটরবাইক এবং কার রেসিং প্রতিযোগিতা অংশ নিতে শুরু করেন তিনি। এর মধ্যে ছিল অফ রোড রেস মিনিট ৪০০-ও। একবার এক মোটরবাইক রেস মাঝের পর্যায়ে হাতে ভীষণ জোরে আঘাত পায়। রেস শেষ করে গ্লাভস খোলা, ভিতরে দুটি হাত ভেঙ্গে গেছে। তারপর তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন অন্য রেসার, যার নাম ডাফি হ্যামব্লটন। ডাফিই তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

স্ট্যান্ট দলে যোগদান

৭০ দশকের মাঝামাঝি সময় কি কি যোগদান হেল নিধামের স্টান্টস আনলিমিটেড দল। সেখানে মোট ৪০ জন এলিট স্টান্টম্যান ছিলেন। তবে কিটিই ছিল সেখানে চুক্তিবদ্ধ হওয়া প্রথম নারী। বধির হওয়ায় একটি অতিরিক্ত সুবিধা পেতেন সে, সেটি হল- নিজের কাজে অন্যদের তুলনায় বেশি মনোনিবেশ করা যায়। ১৯৭৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পরিণত হন দ্রুততম নারীতে। সেদিন তিনি ৪৮ হাজার হর্সপাওয়ার বিশিষ্ট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডে চলা তিন চাকার একটি রকেট কার চালান, যার নাম ছিল মোটিভেটর। 

ওয়ান্ডার ওম্যান স্ট্যান্ট ডাবল
কিটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় ওয়ান্ডার ওম্যানের স্টান্টের মাধ্যমে। লাল বাসটিয়ার এবং নীলের উপর ফোঁটা ফোঁটা সাদা তারকা সমৃদ্ধ হট প্যান্ট পরে, ৫ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার ৪৪ কেজি ওজনের এই নারী ১৯৭৯ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যালি হিল্টন ১২৭ ফুট উঁচু ব্যালকনি থেকে। তিনি নিচে রাখা একটি এয়ার কুশন উপর রাখা। কুশনটির ঠিক মাঝামাঝি যদি না পড়ে, সেদিনেই তার মৃত্যু হতে পারত। তবে তার নিশানা ব্যর্থ হয়নি। সর্বাধিক উচ্চতা থেকে লাফ দেয়ায় রেকর্ড গড়েন তিনি। এর কিছুদিন পর অন্য স্টান্ট দিতে তিনি হেলিকপ্টার থেকে ১৮০ ফুট উচ্চতায় ঝাঁপ দিয়েও রেকর্ড গড়েন।

অবসর গ্রহণ
১৯৪২ সালে, ৩৬ বছর বয়সে একটু তড়িঘড়ি করেই অবসর গ্রহণ করেন কিটি। তবে তার সামনে আর কোনো রাস্তাও খোলা ছিল না। স্টান্ট করতে গিয়ে তার কিছু সহকর্মী মারা যায়, এজন্য প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভুগতে শুরু করেন তিনি। লোকচক্ষুর অড়ালে চলে যাওয়ার ফলে তাকে নিয়ে মানুষের আগ্রহে ভাঁটা পড়ে। কিন্তু একজন মানুষের জীবন তো কেবল তারকাখ্যাতি দিয়েই চলে না। তার নিজেরও আছে একটি জীবন, যেমন ছিল কিটোরও। সেই জীবন কাহিনিও কোনো অংশে কম চমকপ্রদ নয়। সে শেষ হেসেছিল তিনি ত্যাগ করলেন ২০১৮ সালের ২8 শে নভেম্বর, ইউরেইয়া, নিউমোনিয়া সংক্রামিত হয়ে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস