Alexa আগের রাতে পাঁচজনের সন্দেহজনক ঘোরাফেরা!

ঢাকা, শনিবার   ১৭ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ২ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

দ্বেবীদ্বারে চারজনকে কুপিয়ে হত্যা

আগের রাতে পাঁচজনের সন্দেহজনক ঘোরাফেরা!

শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা

ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত : ০৯:০১ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৯ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ১০:০১ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৯ বৃহস্পতিবার

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

কুমিল্লার দেবিদ্বারে মা-শিশুসহ চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় এখনো কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। 
তবে ঘটনার আগের রাতে ঘাতক মোখলেছুর রহমানের বাড়িতে অপরিচিত পাঁচজনকে এবং ঘটনার দিন সকালে বোরকা পরিহিত এক মহিলাকে বাড়ির লোকজন দেখতে পায়। ওই ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে এলাকায় চলছে নানা গুঞ্জন।

এ সম্পর্কে নিহত মোখলেছুরের স্ত্রী রাবেয়া আক্তার জানান, ঘটনার দিন সকালে আমি ঢাকা থেকে এসেছি। রাতে বা সকালে বাড়িতে কে এসেছিল আমার জানা নেই।

নিহত আনোয়ারার বড় মেয়ে আকলিমা ও ছোট মেয়ে নিপা আক্তার জানান, ঘাতক মোখলেছের বাড়িতে ঘটনার আগের রাতে অপরিচিত কিছু লোককে দেখতে পায় তার বাড়ির লোকজন। ওই লোকজনের পরিচয় পাওয়া গেলে ঘটনার রহস্য জানা যেতে পারে। 

সুলতানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঘাতক মোখলেছ একজন সাধারণ রিকশাচালক হওয়ার পরও তার বাড়িতে পাকা বিল্ডিং! এর পিছনে রহস্য আছে। রিকশা চালানোর পেছনে মাদক ব্যবসায় জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া ঘটনার আগের রাতে তার ঘরে নারী-পুরুষসহ কয়েকজন  অপরিচিত লোকও এসেছিল। ওরা কারা? কী প্রয়োজনে এসেছিলেন? তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে তার স্ত্রী ও বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এ ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে। এদিকে মা-ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা নিহত আনোয়ারা বেগম আনুর দশম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে নিপা আক্তার। কান্না-জ্ঞান হারানোর মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে দিন।

বৃহস্পতিবার তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় কান্না করছে নিপা। তিনি বলছেন, চোখের সামনেই মা ও ছোট ভাইকে কুপিয়ে মারল। প্রথমে আমার ছোট ভাই হানিফকে কুপিয়ে মারে। খানিক পরে দৌড়ে গিয়ে পাশের বাড়ির বৃদ্ধা মাজেদা বেগমকে কোপায়।  আমার দিকে ইশারা দিয়ে বলছে ‘ আয় আয় সামনে আয়’ আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ভয়ে আগাইনি, আমি যদি আগাতাম ওই ঘাতক আমাকেও মেরে ফেলতো। আমার মা, আমার ভাইয়ের মরদেহ আনতে গেলে পিচ্ছিল রাস্তায় পড়ে যায়, পড়ে যাওয়ার পর পিছন থেকে আমার মাকে কোপায়। মা যদি পিছলে না পড়ত তাহলে আমার মাকে আর মারতে পারত না।

আনোয়ারা বেগম ছাড়াও নিপার ছোট ভাই হানিফকেও কুপিয়ে হত্যা করে ঘাতক মোখলেছ। হানিফ তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ত। 

বর্তমানে হানিফ ছাড়া নিহত আনোয়ারা বেগমের চার মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। শিউলি, আকলিমা, কুলসুম তিনজনই বিবাহিতা। থাকেন স্বামীর বাড়িতে। আর নিপা আক্তার তার মা ও ছোট দুই ভাই হানিফ মুন্সি এবং আলম মুন্সিকে নিয়ে থাকেন নিজের বাড়িতে। মাস খানেক আগে আনোয়ারা বেগমের স্বামী শাহ আলম ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামীর মাছ ধরার বেল তৈরি করে আনোয়ারা এতোদিন সংসার চালিয়ে আসছিলেন। 

সরেজমিনে আনোয়ারার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দু-চালা একটি টিনের ঘর, ঘরে মাটির চুলার উপরে রান্নার খালি হাড়ি-পাতিল। ঘরের চৌকিতে আনোয়ারার চার মেয়ে ও এক ছেলে বুকফাঁটা আর্তনাদ-আহাজারি করছে। পাশে স্বজনরা সান্তনা দিয়ে থামানোর চেষ্টা করছে।  

নিহত আনোয়ারার স্বজনরা জানান, তিন মেয়ে বিয়ে দিলেও ছোট একটি মেয়ে এখনও বিয়ে দেয়ার বাকি। আনোয়ারার বাড়ির ভিটে-মাটি ছাড়া আর কোন সম্পদ নেই। কয়েক মাস আগে স্বামীর চিকিৎসার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণও নিয়েছিলেন। চিকিৎসা করেও ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি আনোয়ারা। অবশেষে স্বামীর পথযাত্রী হলেন আনোয়ারা ও তার শিশু সন্তান হানিফ মুন্সি। 

আনোয়ারার বোনের ছেলে খলিলুর রহমান জানান, ঘটনার আগের রাতে মোখলেছের বাড়িতে অচেনা ৫/৬ জন যুবককে দেখতে পায় বাড়ির লোকজন, তারা কারা? কী তাদের পরিচয়? এ প্রশ্নের উত্তর কি আড়াল থেকে যাবে? 

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন
কুমিল্লায় মা-ছেলেসহ প্রকাশ্যে ৩জনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। কুমিল্লা পুলিশ লাইন থেকে ১৬ জন নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে মোতায়ন করা হয়েছে। 

এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, পরবর্তী সময়ে আর কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য এসপির নির্দেশে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকবে। 

আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন এসপি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের পরিবারকে শান্তনা ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আর্থিক সহযোগিতাসহ তাদের খাদ্য সামগ্রীর ব্যবস্থা এবং আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কুমিল্লার এসপি সৈয়দ নুরুল ইসলাম বিপিএম(বার) পিপিএম। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত এসপি (পদোন্নতি পাওয়া এসপি) মো. সাখাওয়াত হোসেন, ডিবি ও পিবিআই কর্মকর্তা,  দেবিদ্বার-ব্রাহ্মণপাড়া সার্কেল এএসপি আমিরুল্লাহ, দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ারসহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা ছাড়াও দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. জয়নুল আবেদীন, জেলা পরিষদ সদস্য মো. শাহজাহান সরকার, সুলতানপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. সফিকুল ইসলামসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। 

বুধবার বিকেলে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার নিহত তিন পরিবারের মাঝে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন।

তিনি জানান, নিহত তিন পরিবারের মাঝে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

থানায় দুই মামলা 
এ ঘটনায় দেবিদ্বার থানায় পৃথক দুইটি মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে মামলা দুটি নথিভুক্ত করা হয়।  

মামলা সূত্রে জানা যায়, নিহত নাজমা বেগম’ র ছোট ভাই মো. রুবেল হোসেন ঘাতক মো. মোখলেছুর রহমানকে একমাত্র আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘাতক মোখলেছুর রহমান রাধানগর গ্রামের  মো. মুর্তজ আলী ওরফে মুতু মিয়ার ছেলে। 

পরে একই দিনে নিহত মোখলেছের স্ত্রী মো. রাবেয়া বেগম স্বামী মোখলেছুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগে রাধানগর গ্রামের অজ্ঞাতনামা ১০০০/১৫০০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য ও ভীতিকর পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। 
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেবিদ্বার থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। তবে মামলা দুটি অধিকতর তদন্ত ও হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কুমিল্লাকে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর