এ এক অন্য বাবার গল্প!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৮ জুন ২০২২,   ১৪ আষাঢ় ১৪২৯,   ২৮ জ্বিলকদ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

এ এক অন্য বাবার গল্প!

ইমতিয়াজ মেহেদী হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১০ ১৯ জুন ২০২২   আপডেট: ১৫:৪৬ ১৯ জুন ২০২২

বাবা তোমাকে মিস করছি ভীষণ। মিস করছি তোমার আদরমাখা শাসন। বকুনি। সব। যখন হাঁটতে শিখিনি, তখন হাত ধরে আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছো। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে ছুটে যেয়ে আমাকে কোলে তুলে নিয়েছো, ক্ষত স্থানে ফুঁ দিয়ে কপালে চুমু খেয়েছো। যে সময় যেটা বায়না ধরেছি শত অভাব থাকা সত্ত্বেও পূরণ করেছো। বুঝতে দাওনি অভাবের দাবদাহ কতটা তীব্রতর? দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় প্রথম যেদিন ছড়া লিখলাম তখন তুমি অন্যসব বাবাদের মতো আমাকে বকা দাওনি। বরং বলেছিলে বাবা কোনোদিন লেখালেখি ছাড়িস না। মাকে লুকিয়ে আমাকে হাত খরচের টাকা দিতে। যা জমিয়ে জমিয়ে আমি পোস্টকার্ড, হরেক রকমের ডাকটিকিট, বিভিন্ন রঙের খাম, ডায়েরি, কলম আর গল্পের বই কিনতাম। তুমি সবই দেখতে, কিন্তু কিছুই বলতে না। বরং উৎসাহ দিতে।

সন্ধ্যা এলেই অপেক্ষা করতাম, কখন রাত নামবে? কখন তুমি আসবে? নিয়ে আসবে নিকন্যাক চকলেট আর নাবিস্কো কোকোনাট বিস্কুট। যেদিন তুমি আসার আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম, তুমি আমাকে সুঁড়সুঁড়ি দিয়ে জাগিয়ে তুলতে। এরপর মুখে তুলে সেগুলো পরম স্নেহে খাইয়ে দিতে। ছুটির মৌসুম এলেই বেরিয়ে পড়তে আমাকে নিয়ে দেশ-বিদেশ। তোমার সঙ্গে বেরিয়েই আমি গোটা বাংলাদেশ চিনেছি, চিনেছি ভারত। তোমার হাতে হাত রেখে আমি শুনেছি সাগরের দীর্ঘশ্বাস, দেখেছি ঝর্ণার কান্না আর অনুধাবন করেছি পাহাড়ের আকাশসম নীরবতা। তোমার কাছ থেকেই শিখেছি বিপ্লবের অর্থ। শিখেছি অবহেলিত মানুষের বোবা কান্না মুছে দেওয়ার দুঃসাহস। যখন অসুখে পড়তাম, সারারাত জেগে নিজেকে নিকোটিনে সিদ্ধ করে তুমি আমার সেবা করতে। পেন্সিল দিয়ে স্কেচ, রঙতুলি নিয়ে ছবি আঁকা, অভিনয়, গান, ফটোগ্রাফি, আবৃত্তি আর লেখালেখির নেশাটা ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতরে বড় হয়ে উঠেছে। অথচ তুমি আমাকে ক্ষণিকের জন্য বাধা দাওনি। বরং বলেছো সৃজনশীল কাজে তুমি সবসময় আমার পাশেই আছো।

আজ তোমার সেই ছোট্ট ইমতিয়াজ বড় হয়েছে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছে সাহিত্যচর্চাও। সুযোগ মিললেই লিখছে গানের লিরিক, নাটক-স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের গল্প-চিত্রনাট্য রচনার সঙ্গে সঙ্গে করছে নির্মাণও।

এ যে আমি আজ এখানে, যতটুকুই এসেছি, তার পেছনে তোমার ভূমিকা যে কতখানি, তা লিখে কাগজ-কলমে প্রকাশ করা অসম্ভব বাবা। তুমি যে কত ভালো তা তুমি নিজেও জানো না। তোমার প্রতি আমার শুধু একটাই অভিযোগ। কেন তুমি আমাকে আর আগের মতো বুকে জড়িয়ে ধরো না? আদর করে কেন মাথায় হাত বুলিয়ে দাও না? চকলেট, আইসক্রিম কিনে দাও না? বেড়াতে নিয়ে কেন যাও না? আমি কি সত্যিই অনেক বড় হয়ে গেছি বাবা? নাকি এখনো তোমার সেই পিচ্চি ইমতিয়াজটাই আছি?

ভালোবাসার কোনো বয়স হয় না বাবা। ভালোবাসা বয়সের ফ্রেমে বন্দি থাকে না, থাকতে পারে না। ভালোবাসা হলো হাঁটি হাঁটি পা করে হাঁটতে থাকা শিশুটির মতো এক চঞ্চল প্রাণ। যা শুধু মানুষকে জীবনপথে চলার গতি সঞ্চার করে, মন্থর করে না।

বাবা দিবস বলে ‘দিবসের ফ্রেমে’ বেঁধে বলছি না। তোমাকে ভালোবাসি বাবা । অসম্ভব ভালোবাসি। আর এটাই সত্য। যেটা তোমার সামনে দাঁড়িয়ে বলার সাহস আমার কোনোদিন হয়নি। কিন্তু আজ বলছি। I love u বাবা। কথাটা অনেকদিন ধরে মনের ঘরে পুষে রেখেছিলাম, আজ অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তোমাকে বলেই ফেললাম।

ভালো থেকো বাবা। নিজের শরীরের যত্ন নিও, ঠিকমতো ওষুধ খেও। আর হ্যাঁ, একদমই মন খারাপ করো না। পরিবারসহ তোমার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে, না জানিয়েই সহসা হাজির হবো কোনো একদিন। কোনো এক কাকডাকা ভোরে অথবা ঝুম বরষায়।

তারপর বাপ-ব্যাটা মিলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মাতবো হাজারো গল্পে। যে গল্পে মা থাকবে, মাটি থাকবে, থাকবে অনাগত দিনের ভ্রমণবৃত্তান্তও।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, গীতিকার ও নির্মাতা

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর

English HighlightsREAD MORE »