প্রজন্মদূরত্ব পরাজিত করা বাবা আমার

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৮ জুন ২০২২,   ১৪ আষাঢ় ১৪২৯,   ২৮ জ্বিলকদ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

প্রজন্মদূরত্ব পরাজিত করা বাবা আমার

 প্রকাশিত: ১২:৫২ ১৯ জুন ২০২২   আপডেট: ১৩:০১ ১৯ জুন ২০২২

রনি রেজা
তরুণ লেখক রনি রেজা। ছাত্রজীবনে দেশের প্রথম সারির দৈনিকগুলোতে লিখতেন ফিচার, প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতা। সে থেকেই যোগাযোগ গণমাধ্যমের সঙ্গে। একসময় এই সাহিত্যের গলি বেয়েই ঢুকে পড়েন সাংবাদিকতায়। বর্তমানে ডেইলি বাংলাদেশ-এ কর্মরত। পাশাপাশি অব্যহত রেখেছেন দৈনিক পত্রিকাগুলোয় লেখালেখি। প্রকাশিত গ্রন্থ- গল্পগ্রন্থ ‘এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা’ (২০১৯), শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘পাখিবন্ধু’ (২০২০)। স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‌‌‘বেহুলাবাংলা বেস্ট সেলার সম্মাননা-২০১৯’।

বাবা শব্দটির বিশালতা হয়তো আমরা টের পাই সময় ফুরিয়ে। শৈশব পেরিয়ে অথবা দায়িত্ববোঝাই জীবনে পৌঁছে। অনেকে তারও অনেক পরে বাবাকে হারিয়ে। ততক্ষণে আফসোস আর স্মৃতিমন্থন করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। এই যে দূরত্ব বা মধুর সম্পর্কটিতে ধূসর রঙয়ের আগমন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়ে আনে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বা প্রজন্মদূরত্ব নামক বিশেষণ। আমার তৃপ্তি এখানেই। আমার বাবা এই প্রজন্মদূরত্বকে পরাজিত করতে পেরেছেন। আর দশজন বাবার মতোই সাধারণ বাবা আমার। তবু আলাদা। অমীমাংসিত মত কখনো চাপিয়ে দেননি। যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন। ভালো-মন্দটুকু বুঝিয়েছেন নিজের মতো করে।

গ্রামে বেড়ে ওঠা আমার। চারপাশে বন্ধুদের বাবা-সম্পর্কীয় জ্ঞান থেকে জানি- বাবা মানে রক্তচক্ষুওয়ালা এক শাসনকর্তা। খেলতে গেলে সজাগ থাকা, যেন বাবা টের না পান। খাবার সময়ে হঠাৎ বাবার আগমনে থেমে যাওয়া অথবা কোনোমতে পালিয়ে বাঁচা। সম্ভ্রান্ত অনেক পরিবারেও এই চিত্র ছিল চিরচেনা। স্কুলশিক্ষক বাবাও যখন তার সন্তানের ক্রিকেট ব্যাট ভেঙে ফেলেন, ‘বৈঠার বাড়ি’ বিশেষণে কটাক্ষ করে নিবৃত করেন খেলা থেকে, তখন আমার স্বশিক্ষিত বাবা ব্যাট-বল কিনে দিতেন খেলতে। সহখেলোয়ারদের নিয়ে ক্যান্ডি, শরবত খাওয়ার টাকাও দিতেন আলাদা করে। 

ক্রিকেট, ফুটবলের মাঠে কখনোই আমি ভালো খেলোয়াড় ছিলাম না। আরো স্পষ্ট করে বললে বেস্ট ইলেভেনে স্থান পাওয়ার কোনো যোগ্যতাই আমার ছিল না। শুধু নিজের ব্যাট, বল থাকায় জায়গাটা শক্ত ছিল। যেটা ছিল বাবার উদারতা। বিষয়টিকে এখন প্রকাশ করি এভাবে- ‘এলাকার একমাত্র বৈধ খেলোয়ার ছিলাম আমি।’ যখন বন্ধুদের বাড়ি থেকে খেলার প্রতি কড়া নিষেধাজ্ঞা, লুকিয়ে মাঠে আসা, খেলার সময় ইতিউতি তাকানো রুটিনমাফিক। তখন আমি খেলতাম বীরদর্পে। কোনো লুকোচুরি ছিল না আমার। লুকোচুরি ছিল না জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই। বন্ধুদের জন্য যখন পূজা দেখা, মেলায় যাওয়া, সার্কাস দেখা নিষিদ্ধ ছিল; তখন বাবা আমাকে উস্কে দিতেন ওসব দেখতে। বন্ধুরা মিলে মেলায় গিয়ে খরচ করব বলে আলাদা টাকা দিতেন। প্রশ্রয় দিতেন আমার সৃষ্টিশীলতাকে। ‘জগৎ না দেখলে নিজেকে চিনবে কিভাবে?’ বাবার এমন বক্তব্য সব কিছুর প্রতি কৌতুহল বাড়িয়ে দিত। বলতে হয়- ছোটবেলা থেকে আমার মতো একজন অলস মানুষকে আলাদা পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছেন সৃষ্টিশীল কাজের জন্য। যেখানে প্রতিমুহূর্ত সমসাময়িক লেখকদের কাছে শুনি তাদের প্রতিবন্ধকতার কথা, তখনই ভক্তির অঞ্জলি ঢেলে দেই আমার বাবা-মায়ের চরনে। তারা সেই শিশুকাল থেকেই কত সুন্দর করে দিয়ে রেখেছিলেন যৌক্তিক স্বাধীনতা। 

যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি তখন মাদারীপুরের কলাবাড়িতে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানের জন্য বাবার থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে গেলাম। বাবা শুধু বললেন- এতদূর চিনে ঠিকঠাক যেতে পারবে তো? কলেজে থাকাকালীন চলে গেলাম ফরিদপুরের আটরশি। পরিচিত কেউ নেই সঙ্গে। অথচ বাবা-মায়ের কোনো বাধা নেই। বাবার কথা ছিল, ‘যা-ই করো; পড়াশুনাটা ঠিকমতো করো। আর মানুষ মন্দ বলবে এমন কিছু করো না। তোমার বিবেক আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ বাবার ওই বিশ্বাস যত্নে রেখেছিলাম। রাখছি সাধ্যানুযায়ী।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর

English HighlightsREAD MORE »