অঞ্জলি লহ মোর...

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৮ জুন ২০২২,   ১৪ আষাঢ় ১৪২৯,   ২৮ জ্বিলকদ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

অঞ্জলি লহ মোর...

 প্রকাশিত: ২০:৩২ ২৪ মে ২০২২  

বীরেন মুখার্জী

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

সংগীত শ্রুতি-মাধ্যম। সংগীতবিশারদ না হয়েও বলা যায়, গান কর্ণের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়। গীত, বাদ্য ও নৃত্যের মিলনে উত্তমরূপে গীত গানই সংগীত নামে পরিচিত; সংগীতশ্রাস্ত্র অন্তত এ সাক্ষ্যই বহন করে। গান মাধুর্যমণ্ডিত স্বরে গীত হয়ে থাকে, যাকে সংগীতের কলাকৈবল্যবাদীরা সুর বলে আখ্যায়িত করেন।

বর্তমান সময়ের রচয়িতাদের কাছে গান বা গীতিধর্মী কবিতা রচনা সহজ ও সস্তা মনে হতে পারে; কিন্তু গানের ব্যাকরণ, শব্দ-পদ চয়নের নৈপূণ্য, স্বরলিপি প্রণয়ন এবং সর্বোপরি কণ্ঠে সুরমাধুর্যের দীনতা নিয়ে আর যা হোক সংগীত রচনা সম্ভব নয়। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করে বাংলা ক্লাসিক্যালধর্মী গানের রাজ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

বলাই বাহুল্য, বাংলা গীতিকবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম-এই পাঁচ গীতিকবির হাতে সমৃদ্ধি লাভ করে। তবে নজরুল ইসলাম একাধারে সংগীত রচয়িতা, সুরকার, শিল্পী, স্বরলিপিকার এবং নতুন ঘরাণার রাগ-রাগিনীর জনক। নজরুলের হাতেই পূর্ণতা পেয়েছে আধুনিক বাংলা গান।

কাজী নজরুল সম্পর্কে পণ্ডিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘নজরুল ছিলেন বাংলা গানের জগতে একজন সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত গীতিকার, সুরকার, এবং এবিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ শ্রেষ্ঠ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতোই আর গান ছিল নানা শাখায় পল্লবিত। যদিও রবীন্দ্রনাথের গানের সাংগীতিক শৃঙ্খলা, দার্শনিক ভাবের গভীরতা ও সুরের আত্তীকরণ এবং সহজ প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার যে প্রয়াস সংগীত গবেষকদের চোখে ধরা পড়েছে, সেগুলি আমরা নজরুলের গানে সেই অর্থে পাইনা। এতদসত্ত্বেও আমরা স্বীকার করতে কুণ্ঠিত বোধ করব না যে রবীন্দ্রনাথের পরের প্রজন্মের বাংলা গানকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করার যে দুঃসাহসিকতা তিনি এই সময়টিতে দেখিয়েছিলেন তা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং অন্যান্য গীতিকার ও সুরকারদের মধ্যে সেই প্রচেষ্টার অভাবও লক্ষণীয়।’

কাজী নজরুলের সংগীতে হাতেখড়ি লেটোর দলে যোগদানের মাধ্যমে। হাস্যরসের উল্লম্ফন ঘটিয়ে শ্রোতাদের মনে আনন্দ দেয়াই ছিল এই গানের মূল উদ্দেশ্য। কিশোর বয়সে তিনি এই গাসের দলে যোগ দেন। স্কুল ছেড়ে ঢোলের দলে ঢোল বাজিয়েছেন। লিখেছেন গীতিনাট্য দলের গান। সৈনিকের চাকরিতে গিয়ে নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেছেন। ছোটবেলায় তিনি বাঁশি বাজাতেন আর সৈনিকের চাকরিতে গিয়ে তালিম নেন অর্গান বাজানোর। এরই মাঝে তিনি চর্চা করেছেন ধ্রুপদী সংগীতের।

বেতার কেন্দ্র থেকে শুরু করে যাত্রা-নাটক-চলচ্চিত্র এমন কোনো সাংস্কৃতিক মাধ্যম নেই যেখানে নজরুলের বিচরণ নেই। এ সবই তিনি করেছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এভাবে নানা অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হয়েছে নজরুলের সংগীত চেতনা। কলকাতা জেলেটোলায় বসবাসের সময় তিনি বহরামপুরের খ্যাতনামা সুরকার উমাদাস ভট্টাচার্যের কাছে সংগীতে তালিম নেন। চর্চাকালীন সময়েই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রচল রাগের সীমানায় বাংলা গানের রূপ-কে বন্দি করা যাবে না। নজরুলের চিন্তাধারায় যে স্বরূপটির ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা হলো, ‘রাগ সংগীত গাইবার যে পদ্ধতি তার বিশুদ্ধতা রক্ষা করা যেতে পারে কিন্তু রাগের বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। রাগের বিশুদ্ধতা নষ্ট করার উদ্দ্যেশে নয় বরং ইচ্ছাকৃত রঞ্জক বুদ্ধিতে রাগের রূপকে পরিবর্তনও করা যাবে।’

নজরুলের সমগ্র সৃষ্টিতে তার জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের প্রতিফলন দেখা যায়। যে কারণে তার সমগ্র সাহিত্যকর্ম বিষয়-বৈচিত্র্যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষায়, রূপ-মাধুর্যে, শিল্প-বৈভবে, অভিনবত্বে উজ্জ্বল। আর নজরুল সংগীতে যে সুরের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়, তাতে রয়েছে রাগের প্রভাব এবং লোকসংগীতের ছোঁয়া। কোনো কোনো গানে তিনি যুক্ত করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের সুর।

সংগীতের প্রচল ঘরাণার আভিজাত্য ভেঙে সৃষ্টি করেছেন নতুন ছন্দ ও তালের। ওই সময় ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের নিজস্ব স্টাইল বা শৈলি; যার সাহায্যে রাগ সংগীত, লোকসংগীত, কীর্তনাঙ্গ, টপ্পা এবং অন্যান্য দেশি-বিদেশি সংগীতকে আত্তীকরণের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ নিজের শৈলিতে প্রকাশ করতেন। কিন্তু নজরুল তা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন।

পণ্ডিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা রাগ সংগীতের প্রতি কাজী নজরুল ইসলামের বিশেষ ঝোঁক ছিল কারণ বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী জমির উদ্দিন খান সাহেবের শিক্ষা উনাকে খুব প্রভাবিত করেছিল।

সঙ্গীতকার হিসাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি তার এই আগ্রহ ছিল সহজাত। তার রচনায় শাস্ত্রীয় সংগীত মূলত খেয়াল, ঠুংরী ও গজলের প্রভাব সর্বাধিক। এই কারণবশত নজরুলের গানে রাগ সঙ্গীতের আভাস মিললেও রাগ ভিত্তিক নজরুলগীতি আলাদা করা মুশকিল। কাব্যগীতি, ভক্তি গীতি, দেশাত্মবোধক, এহেন বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা গেলেও এর মূল নিহিত রয়েছে খেয়াল ও ঠুংরিতে। তাই নজরুল ভিত্তিক গান বলতে আমরা তার খেয়ালধর্মী গানকেই বুঝি।

এটি একটি আধুনিক গানের ধারাও বটে। সেই সময়ের কলকাতাকেন্দ্রিক গ্রামোফোন কোম্পানিগুলিতে বিভিন্ন ধরনের সাঙ্গীতিক গবেষণার পরিসর  ছিল। তাই রাগ সঙ্গীতের প্রাঙ্গণও ছিল বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নজরুল অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এই ধারায় রচিত গান মূলত খেয়ালধর্মী হলেও, এতে খেয়ালের সৃষ্টিশীলতা ও বাংলা গানের কাব্যময়তার সংমিশ্রণ ঘটেছিল। নিজেকে এইটুকুতে সীমাবদ্ধ না রেখে নজরুল বেশ কিছু নতুন রাগ সৃষ্টি করেন এবং পুরনোগুলোর প্রসার ঘটান। সেই সময়ে সম্প্রসারিত রেডিও প্রোগ্রামগুলির মাধ্যমে এই গানগুলি ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির মুখে মুখে।’

পণ্ডিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা রাগ সংগীতের প্রতি কাজী নজরুল ইসলামের বিশেষ ঝোঁক ছিল কারণ বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী জমির উদ্দিন খান সাহেবের শিক্ষা উনাকে খুব প্রভাবিত করেছিল।

সঙ্গীতকার হিসাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি তার এই আগ্রহ ছিল সহজাত। তার রচনায় শাস্ত্রীয় সংগীত মূলত খেয়াল, ঠুংরী ও গজলের প্রভাব সর্বাধিক। এই কারণবশত নজরুলের গানে রাগ সঙ্গীতের আভাস মিললেও রাগ ভিত্তিক নজরুলগীতি আলাদা করা মুশকিল। কাব্যগীতি, ভক্তি গীতি, দেশাত্মবোধক, এহেন বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা গেলেও এর মূল নিহিত রয়েছে খেয়াল ও ঠুংরিতে। তাই নজরুল ভিত্তিক গান বলতে আমরা তার খেয়ালধর্মী গানকেই বুঝি।

এটি একটি আধুনিক গানের ধারাও বটে। সেই সময়ের কলকাতাকেন্দ্রিক গ্রামোফোন কোম্পানিগুলিতে বিভিন্ন ধরনের সাঙ্গীতিক গবেষণার পরিসর  ছিল। তাই রাগ সঙ্গীতের প্রাঙ্গণও ছিল বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নজরুল অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এই ধারায় রচিত গান মূলত খেয়ালধর্মী হলেও, এতে খেয়ালের সৃষ্টিশীলতা ও বাংলা গানের কাব্যময়তার সংমিশ্রণ ঘটেছিল। নিজেকে এইটুকুতে সীমাবদ্ধ না রেখে নজরুল বেশ কিছু নতুন রাগ সৃষ্টি করেন এবং পুরনোগুলোর প্রসার ঘটান। সেই সময়ে সম্প্রসারিত রেডিও প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে এই গানগুলি ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির মুখে মুখে।

নতুন নতুন রাগ সৃষ্টি, রাগপ্রধান গানের প্রতি ঝোঁক, সংগীতকে প্রচল থেকে মুক্ত করার প্রয়াস এবং লৌকিক দেহাতী সুরের কারণে তার গান অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। নজরুলকে লোকগীতির প্রতিও দুর্বল থাকতে দেখা যায়। অস্বীকারের সুযোগ নেই, কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা ও গান কাঁপিয়ে তুলেছিল ব্রিটিশ সরকারকে। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো মুক্তিকামী জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিলো তার গান।

নজরুলের গানে একদিকে বিদ্রোহ, আর অপরদিকে প্রেম-ভক্তিরসপূর্ণ। নজরুল ইসলাম সব সময় রবীন্দ্রনাথের ‘আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি’ গাইলেও রচনা করতেন, ‘অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে’-এর মতো রাগপ্রধান গান। সাহিত্য জগতে আবির্ভাবকালে নজরুল প্রত্যক্ষ করেছেন পরাধীন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অসাম্য, নারীদের প্রতি নির্যাতনসহ নানাবিধ নেতিবাচক প্রপঞ্চ।

তিনি প্রতিবাদী গান রচনার পাশাপাশি নারীমুক্তি, নারীর স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান নিয়েও রচনা করেছেন অনেক গান। নজরুল গবেষক কাজী মহাম্মদ এহিয়া বলেন, চারিদিকে যে অস্থিরতার সময় বিরাজ করছিল, সেই সময় একদল তরূণ বলে উঠল-সাহিত্যে বস্তুবাদ বা ভাবনৈতিক অস্তিত্বের আবির্ভাব ঘটাতে হবে। তার গানের ভঙ্গি সুদূরপ্রসারী, সুর নতুন, আদর্শ পৃথক; অর্থাৎ তারা বলতে চান বা তাদের লক্ষ তারা জীবনাবেগ, কামনা, বামনা, প্রেমের তৃষা-তার স্বপ্নায়িত মানসী-প্রতিমার অভিষেক।

অর্থাৎ নজরুলই প্রথম নারী স্বাধীনতা এবং অধিকার নিয়ে বঙ্গসাহিত্যে বিস্ময় সৃষ্টি করেন। তিনি লিখেন-‘হাতে রুলি পায়ে মল, মাথায় ঘোমটা/ ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও শিকল,/ যে ঘোমটা তোমায় করিয়াছে ভীরু উড়াও সে আবরণ/ দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন যেথা যত আভরণ।’ [নারী/ কাজী নজরুল ইসলাম]। 

নারী আন্দোলন, নারীদের মানসিক বিকাশে কাজী নজরুলের গান জোর ভূমিকা রেখেছে। তার গান একদিকে বাঙালিকে দেশাত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করেছে অপরদিকে প্রেমে জারিত হয়ে মানুষের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তিনি বাংলা গানে জুমুর সংগীতের প্রচলন করেন। তিনিই প্রথম সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে আকাশবাণী কলকাতায় রেকর্ড করান, ‘কালোজল ঢালিতে সই চিকন কালারে মনে পড়ে’ গানটি। ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের রাগ-রাগিনীর ওপর দখল থাকায় তিনি বাংলায় গজলের সূচনা করেন। নানা রাগের সঙ্গে রাগিনীর মিশ্রণে সৃষ্টি করেন নতুন রাগ-রাগিনী। ‘আধো আধো বোল লাজে বাধো বাধো বোল’ কিংবা ‘ঘুমাও ঘুমাও দেখিতে এসেছি ভাঙিতে আসিনি ঘুম’ গান দুটি নতুন রাগের গান হিসাবে উল্লেখ করা যায়। 

সংগীত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক পর্যায়ে নজরুল ইসলাম ১৯৪০ সালে আকাশবাণী কলকাতায় যোগ দেন। এখানে যোগদানের পর নজরুলের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়। তিনি জোরে সোরে শুরু করেন সংগীত নিরীক্ষা। একে একে সৃষ্টি করেন নতুন রাগ-রাগিনী। হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় চৈতন্যদেবের প্রেমধর্মের প্রভাবে বাংলায় অক্তি আন্দোলনের জোয়ার আসে। এ সময় প্রচার ও প্রসার ঘটে কীর্তন ও পদাবলী কীর্তনের। রাধাকৃষ্ণের বাল্যলীলা, গোষ্ঠলীলা, প্রেমলীলা ইত্যাদি নানামুখী প্রেমভক্তিগীতির। বিদ্যাপতি, চণ্ডিদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাসের মতো কাজী নজরুল ইসলামও ভক্তিগীতি লিখে সমৃদ্ধ করেছেন বৈষ্ণব সাহিত্য। 

নজরুল ইসলাম বেতারে অনুষ্ঠান পরিচালনার সময় ‘হারামণি’ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নবরাগ-মালিকায় পর্যায়ক্রমে রূপমঞ্জরি, দোলনচাঁপা, মীনাক্ষী, বেণুকা, সন্ধ্যামালতী, নির্ঝরিণী ইত্যাদি রাগ সৃষ্টি করেন। বেতারের ত্রয়োদশ বার্ষিকীতে তিনি প্রচার করেন ‘গীতিচিত্র আকাশবাণী’।

এ অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় ‘তোমার বীণা তারে গীতি’, ‘বাঁশি তার কোথায় বাজে’, কোন মহাব্যোমে ধ্বনি ওঠে ওম্’ ইত্যাদি গান। এ ছাড়া ‘কাবেরী তীরে’ মানবিক প্রেমের বিরহ-মধুর আলেখ্যটি প্রচারিত হয় বার বার। ‘নবরাগ মালিকা’ ও ‘হারামণি’ নামে ধারাবাহিক অনুষ্ঠান দুটি প্রচারের মাধ্যমে নজরুল ইসলাম সংগীতের নবধারা সূচনা করেছিলেন।

প্রথম অনুষ্ঠানে প্রচারিত হতো নজরুল সৃষ্ট নতুন রাগের বিন্যাস আর দ্বিতীয়টিতে লুপ্তপ্রায় অপ্রচল রাগ নির্ভর সংগীত। এ ছাড়াও নজরুল ইসলাম নানা বিদেশি সুর, গজল, বিভিন্ন লোকগীতির সুরে গীত গান এবং কীর্তন প্রচার করতেন তার অনুষ্ঠানে। নবরাগ রচনার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে কলকাতা বেতারে দেওয়া এক বক্তব্যে নজরুল বলেছিলেন, ‘বেনুকা ও দোলনচাঁপা দুটি রাগিণীই আমার সৃষ্টি। আধুনিক গানের সুরের মধ্যে আমি যে অভাবটি সবচেয়ে বেশি অনুভব করি তা হচ্ছে সিমিট্রি (সামঞ্জস্য) বা ইউনিফরমিটির অভাব। কোনো রাগ বা রাগিণীর সঙ্গে অন্য রাগ বা রাগিণীর মিশ্রণ ঘটাতে হলে সংগীতশাস্ত্রে যে সূক্ষ্ম জ্ঞান বা রসবোধের প্রয়োজন তার অভাব আজকাল অধিকাংশ গানের মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং ঠিক এই কারণেই আমার নতুন রাগ-রাগিণী সৃষ্টি এবং অপ্রচলিত রাগ-রাগিণী উদ্ধারের প্রচেষ্টা। রাগরাগিণী যদি তার গ্রহ ও ন্যাস এবং বাদী-বিবাদী ও সংবাদী মেনে নিয়ে সেই রাস্তায় চলে তাহলে তাতে কোনো সুরের সামঞ্জস্যের অভাব হবে না।’ ‘দুটি রাগিনী’ শিরোনামে কবির এই বক্তব্য ‘বেতার জগৎ’-এ মুদ্রিত হয়েছিল। 

সংগীত রচনায় বিষয় নির্বাচন ও সুরবৈচিত্র্যে ভিন্নধারা যুক্ত করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। সংগীত বিশেষজ্ঞরা নজরুলগীতির শ্রেণিবিন্যাসও করেছেন- শাস্ত্রীয় সংগীত, ভক্তিগীতি (শ্যামা সংগীত, শাক্তগীতি, আগমনী গান, কীর্তন, বাউল, ভজন, ও বিভিন্ন ভক্তিমূলক গান), ইসলামী গান (জাগরণী গান, ইসলামের মূলতত্ত্ব বিশ্লেষণধর্মী গান যেমন গজল, শায়ের, কাওয়ালী, কথকতা, হাফ আখড়াই ও যাত্রা নাট্যের ঢঙে রচিত লেটো), স্বদেশি গান বা দেশাত্ববোধক, গণ সংগীত (কোরাস, কুচকাওয়াজের গান বা মার্চ সংগীত, ছাত্র দলের গান, শিকল পরার গান, নারী জাগরণের গান, শ্রমিকদের গান, মুটে-মজুর-জেলের গান, চাষীর গান, ছাদ পেটানোর গান), হাসির গান, শোকগীতি, লোকসংগীত (সাঁওতালী ঝুমুর গীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, কাজরী বা কাজলী), শিশু সংগীত, ঋতু বৈচিত্র্যমূলক, প্যারোডি ইত্যাদি।

‘নজরুলের রাগভিত্তিক গানগুলো কিছু ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে প্রথমে আসে ভাঙা গানের প্রসঙ্গ। শাস্ত্রীয় সংগীতের বন্দিশ ভাঙা গান এগুলো। মূল বন্দিশগুলো নজরুল জমির উদ্দিন খান ও এইচএমভির সঙ্গে যুক্ত শাস্ত্রীয় সংগীতের ওস্তাদদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। দ্বিতীয় ভাগে আমরা রাখতে পারি সেইসব গান, যেগুলো ওনার সৃষ্ট নতুন রাগগুলির আধারে রচিত ও কিছু গান যেগুলো অপ্রচলিত রাগাশ্রিত। এই ক্ষেত্রে নজরুলের সাফল্য সর্বজনবিদিত এবং এই ধরনের গানে উনি পুরোধা।’ [প্রবন্ধ: অঞ্জলী লহ সঙ্গীতে/ পণ্ডিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়]। 

তথ্য অনুযায়ী, নজরুল তিরিশটির মতো নতুন রাগ সৃষ্টি করেছিলেন। যদিও সতেরোটির সন্ধান মেলে। এ ছাড়া, কিছু লক্ষণ গীত রচনা করেছিলেন যাতে রাগ বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। নজরুল রচিত তালগুলোর মধ্যে ছয়টি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। সেগুলো হলো, প্রিয়া, স্বাগতা, মন্দাকিনী, মঞ্জুভাসিনি, মনিমালা ও নবনন্দন। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে নজরুল যে বিশেষ দক্ষতা লাভ করেছিলেন তার ফলস্বরূপ বিভিন্ন ধারায় সংগীত রচনা করেছেন।

সংগীত বিশারদরা হিন্দুস্তানি রাগকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। মৌলিক রাগ গুলোকে ‘শুদ্ধ’, এক রাগে অপর একটি বা একাধিক রাগের ছায়া থাকলে ‘সালগ’ বা ‘ছায়ালগ’ এবং একাধিক রাগের স্পষ্ট মিশ্রণ ঘটলে ‘মিশ্র’ বা ‘সংকীর্ণ’ বলা হয়। বাঙালি সুরকারগণ এই প্রকৃতির সংকীর্ণ রাগ-রাগিনীকে অত্যন্ত খুশি মনে গ্রহণ করেছিলেন। হিন্দুস্তানি ওস্তাদেরা বাঙালির এই স্বভাবকে খুশিমনে গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে এই জাতীয় তৃতীয় শ্রেণির মিশ্রণ বা সংকীর্ণ রাগ-রাগিনী সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র বাংলাতেই প্রচলিত ছিল।

নজরুল প্রথম জীবনে এই জাতীয় রাগ অবলম্বনে অনেক গান তৈরি করেছিলেন। যেমন-‘অমর কানন মোদের’ (বেহাগ খাম্বাজ), ‘আজি দোল পূর্ণিমাতে’ (কালাংড়া বসন্ত), ‘আজি বাদল ঝরে মোর’ (ভৈরবী আশাবরী), ‘আধো ধরণী আলো তিলক’ (কামোদ পিলু), ‘আমরা পানের নেশায় পাগল’ (বাগেশ্রী কাফি), ‘আসলো যখন ফুলের ফাগুন’, (দুর্গা মান্ড), ‘ঊষা এলো চুপি চুপি’ (আশা টোড়ি), ‘এত কথা কি গো কহিতে’ (খাম্বাজ দেশ), ‘ওই পথ চেয়ে থাকি’ (খাম্বাজ পিলু), ‘আমি চঞ্চল’ (শাহানা বাহার), ‘আজি নন্দদুলালের সাথে’ (খাম্বাজ কাফি), ‘এ কোন পাগল পথিক’ (মেঘ ছায়ানট) ইত্যাদি। নজরুল হিন্দুস্তানি পদ্ধতির শুদ্ধ সংকীর্ণ শ্রেণির রাগকেও সমধিক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং প্রায় সব মতকেই সম্মান জানিয়েছেন। বাংলায় প্রচলিত মিশ্র বা সংকীর্ণ শ্রেণির রাগগুলোকেও মিশ্র রূপে চিহ্নিত করেছেন। যেমন, মিশ্র বেহাগ, মিশ্র মালবশ্রী, বাগেশ্রী মিশ্র, ভূপালী মিশ্র, ভৈরবী মিশ্র, পিলু মিশ্র, খাম্বাজ মিশ্র, মিশ্র বিলাবল, মিশ্র খাম্বাজ ইত্যাদি।

শাস্ত্রীয় সংগীতে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন কাজী নজরুল। শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশেষ জ্ঞান হল- গ্রহ, অংশ, ন্যাস, বর্ণ, অলঙ্কার, তান, বজ্রস্বর, বক্রস্বর, আলাপ, রাগের জাতি, ঠাট, মীড়, নিবদ্ধ-অনিবদ্ধ, আন্দোলন, স্পর্শস্বর, গায়কী, নায়কী ইত্যাদি সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা অর্জন। নজরুল এ বিষয়ে প্রভূত জ্ঞানার্জন করেছিলেন যে কারণে প্রচল এবং অপ্রচল রাগের সমন্বয়ে রাগাশ্রিত সংগীত রচনা করতে পেরেছিলেন। আহির ভৈরব, পটদীপ, মালগুজ্ঞ, বেহাগ, দরবারী, ললিত, ছায়ানট, মধুমাধবী সারং, ভিমপলশ্রী, তিলং রাগে রচনা করেন-‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী’, ‘প্রথম প্রদীপ জ্বালো’, ‘গুঞ্জমালা গলে কুঞ্জে এস হে কালা’, ‘নিশি নিঝুম ঘুমও নাহি আসে’, ‘আজি নিঝুম রাতে কে বাঁশি বাজায়’, ‘পিউ পিউ বিরহী পাপিয়া বোলে’, ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয়’, ‘চৈতালী চাঁদিনী রাতে’, ‘বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই’, ‘অঞ্জলি রহ মোর সংগীতে’ ইত্যাদি। 

নজরুল ইসলাম তান্ত্রিক সাধনায় দীক্ষা নিয়ে আত্মানুসন্ধানে বিভোর সময় কাটিয়েছেন। লিখেছেন উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত। শ্যামা, শাক্তগীতি ও কীর্তন রচনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে তার আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। নজরুলের ভক্তিগীতিতে স্পষ্ট ভারতীয় সনাতন ও ইসলাম ধর্মের রূপক ভাব। শ্যামাসংগীত রচনায় রামপ্রসাদ নজরুলের পূর্বসূরি হলেও নজরুলের গানে হৃদয়ের যে স্পর্শ পাওয়া যায় তা রামপ্রসাদের গানকেও ছাপিয়ে যায়। কাজী নজরুল ইসলাম কালীর মহিমা কীর্তন করতে গিয়ে একদিকে যেমন মহাকালীকে লোলরসনা রণরঙ্গিনী মূর্তিতে আহবান করেছেন, অন্যদিকে তাকেই স্নেহময়ী জননী, প্রেমময়ী মূর্তিরূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তিনি কালী আর রাসবিহারী শ্যামে কোনো তফাৎ দেখেননি। যেমন-‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়/ দেখে যা আলোর নাচন’, ‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা অন্তিমে সন্তানে নিতে কোলে’, ‘আমি সাধ-ক‘রে মোর গৌরী মেয়ের/ নাম রেখেছি কালী’। আবার ইসলামী গানে-‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে/ এলো খুশীর ঈদ’, ‘ইসলামেরই সওদা নিয়ে/ এল নবীন সওদাগর’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/ মধুপূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে’। নজরুলের আত্মপলব্ধিজারিত অভিজ্ঞান সাবলীলভাবেই প্রকাশিত হয়েছে গানগুলোতে।

কাজী নজরুল যে প্রেক্ষাপটে বিপ্লবী, সেই একই প্রেক্ষাপটে ছিলেন বিশ্বপ্রেমিক। নজরুল গবেষক গোলাম মুর্শিদ বলেন, তার ইসলামী গান শুনলে তাকে একান্তভাবে মুসলমান বলে মনে হয়, তেমনি তার শ্যামা সংগীত শুনলে তাঁকে শাক্ত এবং কীর্তন আর ভজন শুনলে একান্তভাবে বৈষ্ণব বলে ধারণা জন্মায়। 

পরিশেষে একথা বলা অসংগত হয় না যে, নজরুলের অন্তরাত্মায় যে ভাবের সমন্বয় সবসময় সক্রিয় ছিল, তা হল ভক্তিবাদ আর আধ্যাত্মিকতার মিশেল। নজরুল দীর্ঘকাল টিকে থাকবেন তার গানের ভেতর দিয়ে। তার গান একদিকে যেমন সর্বহারা শ্রেণির লড়াইয়ের প্রেরণা তেমনি সুর ও বাণীর মিলনে প্রাণবন্ত গতিশীলতায় ঋদ্ধ। তার গান বিষয়-বৈচিত্র্য-বৈভবে ও অভিনবত্বে চিরউজ্জ্বল।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে

English HighlightsREAD MORE »