মুক্তির পথে

ঢাকা, সোমবার   ২৩ মে ২০২২,   ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

মুক্তির পথে

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৩৬ ৬ মে ২০২২  

এপ্রিল ১৯৭১। ঢাকা থেকে পাক বাহিনীর ৯৩ পদাতিক ব্রিগেড দুই পথে ময়মসিংহের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রথম দল ঢাকা-টাঙ্গাইল-মধুপুর সড়ক হয়ে। দ্বিতীয় দল রেলপথ দিয়ে। ঢাকা-গফরগাঁও হয়ে ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহে ব্রিগেড সদর স্থাপন করে উত্তর ও উত্তর পূর্বে এগিয়ে যাবে।

ঢাকা হতে টাঙ্গাইল-মধুপুর হয়ে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসররত পাকসেনাদের প্রতিহত করতে পুলিশ, বিডিআর ও মুক্তিযোদ্ধারা মধুপুর ব্রিজের পাশে অবস্থান নিলো। কিন্তু পাকসেনারা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে করতে এগিয়ে এলে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হলো। ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী ময়মনসিংহ শহর দখল করতে ১৭ এপ্রিল তারিখে পাকহানাদার বাহিনী বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করল। ব্রিগেড সদর স্থাপন করল। এছাড়াও ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে এই এলাকা সুরক্ষিত করার দায়িত্ব দেওয়া হলো।

পাক বাহিনীর উপস্থতিতে এপ্রিল মাসের পর থেকেই রাজাকার, আলবদররা এই এলাকায় শান্তি কমিটি গঠন করল এবং লুটপাট, ধর্ষণ, গণহত্যা চালাতে শুরু করল। থাকে। ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের পাশে অবস্থিত জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডাকবাংলোর পেছনটা হয়ে উঠল বধ্যভূমি। গণহত্যার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে খুন করা হলো এখানে। রক্তে লাল হয়ে গেল  ব্রহ্মপুত্র নদের পানি।

ময়মনসিংহ দখলের পর জামালপুর, বিজয়পুর এবং কিশোরগঞ্জে অবস্থান গ্রহণ করল পাক বাহিনী। জামালপুরের পিটিআই স্কুলে ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের সদর দফতর স্থাপন করা হলো। এই ইউনিট জামালপুরকে দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করে কামালপুর, হালুয়াঘাট ও দুর্গাপুরে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুলল।

জামালপুরের মেলান্দহের দাগি-বানিপাকুরিয়া-বেতমারী রেলওয়ে ব্রিজে পাকবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করল। জামালপুর-বাহাদুরাবাদ হয়ে যমুনা অতিক্রম করে ফুলছড়ি ঘাট হয়ে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগের পথ ছিল এটি। রাজাকার ও পাকসেনারা  ক্যাম্প ও রেললাইনের নিরাপত্তার নামে আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষদেরকে ধরে আনত। তাদেরকে দিয়ে রাতজেগে রেললাইন পাহারা দিতে বাধ্য করতো। এছাড়াও বহু নর-নারীকে ধরে নিয়ে হত্যা ও নির্যাতন করত তারা। ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে।
 
মুক্তিবাহিনীও বসে ছিল না। পাকিস্তানি ডেপ্লয়মেন্টের বিপরীতে মুক্তিবাহিনীর ১১ নং সেক্টর গড়ে উঠল এই অঞ্চলে। বিশেষ করে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলায় (কিশোরগঞ্জ মহকুমা ব্যতীত) প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যে। এই সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলো ছিল ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জের পশ্চিম অঞ্চল এবং কুড়িগ্রাম জেলার যমুনার পূর্বতীরের এলাকা। এই সেক্টরের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হলো ভারতের ভেতরের মহেন্দ্রগঞ্জে। বিএসএফ এর প্রত্যক্ষ সহায়তায়। যুদ্ধের শেষের দিকে এই সেক্টরের অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়মিত বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৩ হাজার এবং গণবাহিনীর সদস্য ছিল ১৯ হাজার। গেরিলা বাহিনীর তৎপরতার জন্যে এই সেক্টর বিখ্যাত হয়ে উঠছিল।

পাক বাহিনী জামালপুর-মেলান্দহ বাজার-বাহাদুরাবাদ রেললাইনের বিভিন্নস্থানে ও সরিষাবাড়িতে তাদের স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করলেও মাদারগঞ্জ থানায় কোনো স্থায়ী ক্যাম্প গড়েনি। কারণ, সম্ভবত যমুনাতীরের এই অঞ্চলটি যথেষ্টই দুর্গম একটি এলাকা। কোনো রেল যোগাযোগ না থাকায় শুধুমাত্র সড়কপথেই এই অঞ্চলে আসা সম্ভব।এই সড়কগুলোও ছিল মাটির তৈরি এবং উঁচুনিচু। গরুর গাড়ি ছাড়া অন্যকোনো ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের চলার উপযুক্ত ছিল না। উল্লেখ্য, মাদারগঞ্জের  দক্ষিণ ও পশ্চিম দিয়ে যমুনা নদী এবং উত্তর ও পূর্ব দিয়ে যমুনারই শাখা নদী ঝাড়কাটা নদী প্রবাহিত। ফলে শুষ্ক মৌসুমেও এই এলাকায় পাক বাহিনীর চলাচল তাদের জন্যে যথেষ্টই   বিপদজনক ছিল। ফলে এই থানা ক্রমেই মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছিল। এক সময়ে বলা হতো যে, মাদারগঞ্জের পাতায় পাতায় মুক্তিযোদ্ধারা আছে।

মে মাসের শেষ অথবা জুন মাসের প্রথম দিক। এক সকালে আমিনুল দেখতে পেল শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা এসে মাদারগঞ্জ থানা, হাটখোলা বাজার এবং সুখনগরী গ্রামে এসে আস্তানা গেড়েছে। খরকা বিল পাড়ের এই এলাকাটি  মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে লুকিয়ে থেকে অপারেশন পরিচালনা করার জন্যে খুবই উপযুক্ত। এই কোম্পানির নাম বদি কোম্পানি। বদি নামের এক মুক্তিযোদ্ধা এই কোম্পানির কমান্ডার। মজার ব্যাপার হলো এই দলের সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আছে আমিনুলের স্কুলের শারীরিক শিক্ষক রাজ্জাক স্যারের ছোট ভাই গিয়াস। বালিজুরি স্কুলে সে আমিনুলের সতীর্থ। শুধু এক ক্লাস ওপরে পড়ে।  শুধু তাই নয়। স্কুলের ফুটবল দলের ব্যাক পজিশনে খেলে সে। উচ্চতা ৪ ফুট ১১ ইঞ্চির বেশি হবে না। তবে প্রবল মনোবল ও শারীরিক শক্তির অধিকারী। শরীরের গড়ন প্রশস্ত ধরনের। পেটা শরীর। অনেকটা এলেক্স হ্যালির পূর্বপুরুষ পশ্চিম আফ্রিকার যুবক কিন্তে কোন্তার মতো।

ফুটবল মাঠের  দুর্ধর্ষ ব্যাক প্লেয়ার গিয়াস। তাকে অতিক্রম করে বিপক্ষের কারো সাধ্য নেই বল নিয়ে গোলপোস্টের ভেতরে ঢোকার। গিয়াসকে দেখে আমিনুল খুবই খুশি। গিয়াসের কাছেই সে জানতে পারল আলম কোম্পানি নামে আরেকটা কোম্পানি ঝাড়কাটা নদীর দুই তীরে বানিয়াবাড়ি, মাহমুদপুর, ঝাড়কাটা, গোবিন্দিচর এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া জালাল কোম্পানি নামের আরেকটা কোম্পানি ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।

গিয়াসের মুখ থেকেই সে জানল তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের গল্প। গিয়াসদের বাড়ি বানিয়াপুকুর এলাকায়। বালিজুরি স্কুলে সে লজিং থেকে পড়ত। যেহেতু তার বড়ভাই এই স্কুলের শারীরিক প্রশিক্ষণ শিক্ষক। গিয়াসের এক চাচা ও ফুপুকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। রাজাকারদের মাধ্যমে। তারা ফিরে আসেননি। রেললাইনের পাশের একটি ঝোপের ভেতরে তাদের গলিত মৃতদেহ পড়েছিল। আরো কয়েকটা মৃতদেহের সঙ্গে। পাকবাহিনীর  ভয়ে সেই লাশগুলোকেও উদ্ধার করে নিয়ে এসে কবর দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রবল কষ্টে গিয়াস সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার। এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে সে এবং তার কয়েক বন্ধু মিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাতের অন্ধকারে তারা পায়ে হেঁটে যাত্রা করে ভারত সীমান্তের উদ্দেশ্যে।

গিয়াসের বর্ণনা অনুযায়ী ডিগ্রিরচর-সারমারা হয়ে ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে ঢোকার সময়ে সে এবং তার বন্ধুরা বিএসএফ’র হাতে আটক হয়। মহেন্দ্রগঞ্জ থানায় তাদের একরাত আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। থানায় আরো বেশ কয়েকজন বাঙালি যুবক আটক ছিল। পরদিন সকালে মেলান্দহের আ. হাই বাচ্চু মিয়া, বালিজুরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক করিমুজ্জামান তালুকদার, ইসলামপুরের রাশেদ মোশারফ এবং জামালপুরের আ. হাকিম থানায় আসেন। আটকদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্যে। উনারা ভারতের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করছিলেন। করিমুজ্জামান তালুকদার বালিজুরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এক সময়ে। ১৯৭০ সালের পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে চলে যান। সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

গিয়াস জানালো, আমরা সবাই যেহেতু বালিজুরি হাইস্কুলের ছাত্র, করিমুজ্জামান তালুকদার স্যার আমাদের সবাইকে শনাক্ত করলেন। এরপর আমাদের শরণার্থী ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাদের বলা হলো যে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং এর পর আমাদের জামালপুর এলাকায় পাঠানো হবে। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে। ক্যাম্পে দুইদিন ছিলাম আমরা। এরপর  বিএসএফ’র ক্যাম্পের পূর্ব পাশের পাহাড়ের টিলা পরিস্কার করে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। সন্ধ্যায় আমাদের জন্যে তাঁবু স্থাপন করা হলো। বিএসএফ হতে আমাদের জন্যে পাতিল, চাল, ডাল, লবণ ও মরিচ সরবরাহ করা হলো। পরদিন বিএসএফ’র হাবিলদার ধন বাহাদুর জানালেন, আগামীকাল অর্থাৎ ১৭ মে তারিখ থেকে তিনি আমাদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেবেন।

আমাদের মধ্য হতে ৫০/৬০ কে রিক্রুট করা হলো। আমাদের ট্রেনিং এর দায়িত্ব নিলেন  হাবিলদার ধনবাহাদুর এবং মাদারগঞ্জের হাবিলদার বজলুর রশিদ। মোট তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো আমাদের। থ্রি-নট থ্রি রাইফেল ও হ্যান্ড গ্রেনেড পরিচালনার ওপরে। এই সময়ে আমার সঙ্গে মেলান্দহের আবুল হোসেন, মজিবর ফারাজী, আ. রেজ্জাক, ইসলামপুরের সুলতান, নূরুল হক, জামালপুরের আলতাফুর রহমান, মাদারগঞ্জের মুক্তা, হিরু, আজিজ, তাপস, হুরমুজসহ আরো অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে। ট্রেনিং শেষে তাদের বিভিন্ন কোম্পানিতে বদলি করা হয়েছে। আমি বদি কোম্পানির সদস্য হিসেবে এখানে এসেছি।

মাত্র দুইমাস আগে জামালপুরের গোদারাঘাটে পাকবাহিনীর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে আসার পর থেকে আমিনুলের মাথায় সেই অচেনা বৃদ্ধের সেই কথাটিই বারবার মনে পড়ছে, “এখানে কেন তুই? সরে যা।” সেদিন গুলিতে মরে যাওয়া এতোগুলো মানুষের মধ্য হতে কেবল তার বেঁচে থাকার বিষয়টি  তার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। মনে হয় অযথা তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে এর পেছনে। গিয়াসের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করা দরকার। এছাড়াও তাকে নিয়ে একবার তাদের বাড়ির পাশের ঘন বনের ভেতরে প্রবেশ করা দরকার। সেখানে কেউ একজন অপেক্ষা করছে তার জন্যে। যাকে সে চিনে জন্ম থেকে জন্মান্তরে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে

English HighlightsREAD MORE »