৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড

ঢাকা, রোববার   ০৩ জুলাই ২০২২,   ১৯ আষাঢ় ১৪২৯,   ০৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড

শাওন মাহমুদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:২৫ ২৬ মার্চ ২০২২  

৩৭০ আউটার সার্কুলার রোডের বাসার সদর দরজার উল্টোদিকেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের মেইন গেট। একেবারে মুখোমুখি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে এখানেই প্রথম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আক্রমণ শুরু করে অপারেশন সার্চ লাইট। বাঙালি পুলিশ বাহিনী প্রথম অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এ রাজারবাগেই। সেদিন বিকেল থেকেই শহর থমথম করছিল। নানা রকম গুজব ভাসছিল বাতাসে। ৭ মার্চের ভাষণ থেকেই সবাই বুঝে নিয়েছিল দেশে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। 

বাসার সব জানালার কাঁচ কালো রঙ দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন আলতাফ মাহমুদ। গাড়িতে কালো ফ্ল্যাগ উড়িয়েছিলেন ১ মার্চ থেকেই। বাড়ির দরজায় কালো রঙ দিয়ে তুলিতে এঁকেছিলেন অ, আ, ক, খ অক্ষর। সেদিন বাইরে থেকে বাসায় ফিরেছিলেন খুব অস্থিরতার মধ্যে। ঢাকা শহরের ভেতরটি যেন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারও ভেতরটি।

সন্ধ্যার আগে থেকেই রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাকে বেশ শোরগোল শোনা যাচ্ছিল। আলতাফ মাহমুদ তার শ্যালককে সেখানে পাঠিয়েছিলেন খোঁজ নিতে। সে এসে জানায়, আজ যখন-তখন পাকিস্তানি মিলিটারি আক্রমণ করতে পারে। তাই পুলিশ ফাঁড়িতে চলছে প্রতিরোধের আয়োজন।

আউটার সার্কুলার রোডের একদিকে পর পর সাধারণ মানুষের বাড়ি, উল্টোদিকে পুলিশ ফাঁড়ির ৭০০-৮০০ ফুট লম্বা টিনের ছাউনি দেওয়া শেড। সেখানেই রান্নাঘর আর পুলিশের বাসস্থান বা কোয়ার্টার। এরপরই শুরু সারি সারি দালান। এই হচ্ছে রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক। শতাধিক পুলিশ সন্ধ্যার মধ্যেই দালানগুলোর ওপর অবস্থান নেয়। বাকিরা রাস্তা ও নালার ধারে বা গাছের আড়াল বেছে পজিশন নেন। ওই টিনের শেডগুলোতেও অনেক পুলিশ অবস্থান নিয়েছিল। তাছাড়া উল্টোদিকে আলতাফ মাহমুদের মতো সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদেও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ছিল।

২৫ মার্চ রাত ১১টায় তেজগাঁও থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ক্রমেই রাজারবাগের দিকে আসতে থাকে তারা। আলতাফ মাহমুদ ঘরের সব আলো নিভিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একতলায় চলে যান। এর ঘণ্টাখানেক পর রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়। দরজা-জানালা বন্ধ। তারপরও গোলাগুলির শব্দে দেয়াল ও মেঝে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। পাকিস্তানি মিলিটারি ঠিক ওই বাড়ির সদর দরজার সামনে মর্টার বসিয়ে পুলিশ ক্যাম্পে শেল ছুড়ছিল। অন্যদিক থেকেও পাল্টা আক্রণ আসছিল। বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল চারদিকে দিনের মতো আলো। মিলিটারি সার্চলাইট জ্বেলেছে, ছিল ট্রেসার লাইট। ওই আলোয় মিলিটারিরা পুলিশ ব্যারাকের দালানগুলোর ওপর সশস্ত্র পুলিশের অবস্থান দেখে দেখে এগোতে থাকে। ট্রেসার লাইটের সঙ্গে আরও স্পষ্ট দেখার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী ব্যারাকের বিশাল টিনশেডে রাত ৩টা নাগাদ আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই আগুনে অনেকেই ভেতরে আটক পড়েন। আগুনের লেলিহান শিখা সহ্য করতে না পেরে ভেতরে থাকা পুলিশ ব্যারাক ছেড়ে রাস্তার পাশে, নালার ধারে বা সাধারণ মানুষের বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে কিংবা কোনো গেটের আড়াল নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। ওই রাতে প্রচ- বাতাসে ঠিক রুদ্র নদীর ঢেউয়ের মতো আগুন এদিক-সেদিক ধাওয়া করছিল। আগুনের গোলা, বাঁশের টুকরা, টিনের অংশ ছিটকে আশপাশের সবার ঘর ও বারান্দায় আসছিল। চোখের সামনে গেটের ধারে বাউন্ডারির ভেতর আলতাফ মাহমুদের বড্ড আদরের কাঁঠাল গাছটি পুড়ে গিয়েছিল নিমেষেই। এর মাত্র কয়েক হাত দূরেই বাড়ির দেয়াল। 

দেশে ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। আলতাফ মাহমুদ বাথরুমে প্রায় ৪০ গ্যালন পেট্রল মজুদ করেছিলেন যুদ্ধ হলে মলোটভ বোমা তৈরি করার জন্য। তিনি বুঝেছিলেন আজ হোক, কাল হোক শত্রুপক্ষের মিলিটারির সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য। তাই ওই পেট্রলের এক কণাও গাড়ির জন্য খরচ করেননি। আগুনের তাপে পুরো বাড়িটি তেঁতে উঠেছিল। চারদিকে পোড়া গন্ধ। আগুনের আঁচ সইতে না পেরে টিনশেডের ঠিক উল্টোদিকের বাড়িগুলো থেকে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মানুষজন গলির মধ্যেই দৌড়ে বেড়িয়ে পড়ে। পরিবারের সবাইকে আলতাফ মাহমুদ বারবার বলেছিলেন, ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’ পেছনে প্রতিবেশীর বাড়িতে সবাইকে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি এসে শীতের ভারী কাপড়, কম্বল, তোয়ালে ভিজিয়ে পেট্রলের টিনের ওপর চাপা দিয়ে নিজে তিনি সারারাত বাথরুম আগলে রেখেছেন। রাতের কয়েক ঘণ্টা ওই ভয়ঙ্কর বিপদের সঙ্গে তিনি একা যুদ্ধ করেছিলেন। ঠিক গেটের সামনে পিশাচ মিলিটারিরা পজিশন নিয়ে ছিল। চতুর্দিকে অবিরাম গুলির শব্দ। মানুষজনের আর্তনাদ। পাকিস্তানি সৈন্যদের উল্লাসধ্বনি। দিন, না রাত বোঝা যায় না। লকলকে আগুনের শিখা বাতাসে সবাইকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। 

আরো পড়ুন> যুদ্ধশিশু প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু

বাথরুম পাহারা দিতে দিতে সুরের বরপুত্র আলতাফ মাহমুদ দেখছিলেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আগুন জ্বেলেছে। আগুনে সংসার পুড়ছে, মানুষ পুড়ছে, গাছ পুড়ছে। পোড়া গন্ধে নিঃশ্বাস নেয়া দায়। আগুনের আঁচে বাথরুমেও টেকা যায় না। কিন্তু ৪০ গ্যালন পেট্রল না বাঁচলে উঠানের ঘাসগুলো পুড়ে কালো হয়ে যাবে, আশপাশের অনেক বাড়ির মাথায় নেমে আসবে সর্বনাশা আগুনের শিখা আর অপচয় হবে এক অমূল্য সম্পদের। প্রতিরোধ সংগ্রামে বড্ড প্রয়োজন মলোটভ বোমা তৈরির জন্য রাখা পেট্রল।

এক সময় বাতাসের গতি কমে যাওয়ায় সেদিন সবাই বেঁচে গিয়েছিলেন। না হলে আশপাশের বাড়িগুলো রাতেই পুড়ে ছাই হয়ে যেত। পোড়া আগুনের মধ্য দিয়ে কখন ভোরের আলো ফুটে উঠেছিল, তা টের পাওয়া হয়নি কারো। ২৬ মার্চ ভোরে যে পুলিশ সদস্যরা আলতাফ মাহমুদের বাড়ির ছাদ ও আশপাশ থেকে যুদ্ধ করেছিলেন, তারা ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে আসেন। আলতাফ মাহমুদের কাছে অস্ত্র রেখে তাদের পোশাক ফেলে সাধারণ পোশাক গায়ে দেয়াল টপকে বেরিয়ে যান। ২৮, ২৯ ও ৩০ মার্চে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ নিজের অস্ত্র ফেরত নিয়ে যান। কিন্তু অনেকে আর আসেননি। হয়তো আর কোনোদিনও আসবেন না।

২৬ মার্চ সকাল থেকেই পাকিস্তানি মিলিটারিরা জিপে টহল দিতে দিতে মাইকে ঘোষণা করতে থাকে, ‘পুলিশলোক আর্মস থাকলে সারেন্ডার করো।’ 

ঘোষণা শোনামাত্র আলতাফ মাহমুদ পুলিশের ফেলে যাওয়া বাকি অস্ত্র পেছন দিকের গলিতে এক নালার পানিতে ডুবিয়ে আসেন। তাদের ফেলে যাওয়া পরিত্যক্ত পোশাক কিছু মাটির নিচে পুঁতে রাখেন আর কিছু আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। 

২৭ মার্চ ঢাকায় চার ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হয়। আলতাফ মাহমুদ তখন তার পরিবারের সবাইকে কমলাপুর বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে যান। দু’দিন পর শোনা গিয়েছিল, মন্দিরও আক্রমণ করা হবে। তখন খিলগাঁওয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় পরিবারকে রেখে আসেন। তারপর বাড়ি লুট হবে অজুহাতে রাজারবাগের বাসায় একা থাকতেন তিনি। যুদ্ধ চলাকালে একদিনের জন্যও ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোডের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নেননি। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দুর্গবাড়ি গড়ে তুলেছিলেন সেখানেই। যুদ্ধের প্রথম থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য গান তৈরি করে মেলাঘর পাঠাতেন এবং এক সময় ঢাকার গেরিলা বাহিনী ক্র্যাক প্লাটুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হয়ে যান। ঢাকায় অবস্থিত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদেও মধ্যে যোগাযোগ, আশ্রয়, গেরিলা মিটিং ও মেলাঘরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান তার বাড়ি থেকেই হতো। তার দুর্গবাড়ি ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে নির্ভরশীল জায়গা।

১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট আলতাফ মাহমুদের বাড়ি থেকে দুই ট্রাক অস্ত্র ও অন্যান্য ক্র্যাক প্লাটুন সদস্যের সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তিনিসহ ছয়জন ক্র্যাক গেরিলাকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। নির্মম ও পৈশাচিক অত্যাচারে তাদের হত্যা করা হয়। এই সাত বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুদিন নেই, কবরও নেই। 

আলতাফ মাহমুদ তার যাপিতজীবনে দেশের মানুষের জন্য লড়াই করে গেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর তিনি কখনো থেমে থাকেননি। রাজপথ, জনপথ, মিছিল, প্রভাতফেরি, প্রতিবাদী অনুষ্ঠানে তার শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল সর্বত্র। ভাষা আন্দোলনের জন্য এক ঐশ্বরিক সুরে একুশের গান দিয়ে গেছেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি জড়িত হয়ে স্বাধীন ভূমি পাওয়ার লক্ষ্যে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। 

বাংলাদেশে চিরদিনের জন্য এক অদম্য শক্তি আর সাহসের নাম আলতাফ মাহমুদ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএস

English HighlightsREAD MORE »