বাংলাদেশে চিকিৎসা কার্যক্রমে রোবোটিক টেলিমেডিসিন প্রযুক্তি

ঢাকা, বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৮,   ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

বাংলাদেশে চিকিৎসা কার্যক্রমে রোবোটিক টেলিমেডিসিন প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা

প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন ও ডা. সোহরাব হোসেন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০০:১৮ ২ নভেম্বর ২০২১  

গত ২৪ অক্টোবর ঢাকার সাভারে ফাইলেরিয়া ও থেলাসেমিয়া জেনারেল হাসপাতালে “রোবোটিক টেলিমেডিসিন চিকিৎসা” কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করা হয়। আর এ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় একটি নয়া দিগন্তের উন্মোচন ঘটলো এবং উন্নত চিকিৎসা সেবার বৈশ্বিক প্লাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হলো। একই সঙ্গে বিশেষ করে সমাজে পিছিছে পড়া হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহজে দেশি-বিদেশি উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অতি উন্নত এ ব্যবস্থাপনাটি  টেলিমেডিসিন রোবোট বা যন্ত্র মানবের সাহায্যে  সম্পন্ন করা হয় যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত,বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার  এবং অতিশয় মূল্যবান। “হিউম্যানিটি বিয়োন্ড বেরিয়ার” (ক্যালিফোর্নিয়াস্থ আমেরিকান বাংলাদেশিদের দ্বারা গঠিত সমাজ কল্যাণ সংস্থা ) নামক সংগঠনের  সহযোগিতায় “বিশ্ব টেলিহেলথ ইনিশিয়েটিভ” (WTI) নামক একটি   আমেরিকান সংস্থার নিকট হতে সংগ্রহ করে “ইনস্টিটিউট অফ এলার্জি এন্ড ক্লিনিকাল ইম্মুনোলজি, বাংলাদেশ” (IACIB) কর্তৃক পরিচালিত সাভারস্থ ফাইলেরিয়া জেনারেল হাসপাতালে স্থাপন করা হয়েছে। IACIB বাংলাদেশে এবং  WTIও HBB বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নে কাজ করে থাকেন।         

রোবোটিক টেলিমেডিসিন কি এবং প্রচলিত টেলিমেডিসিন চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে এটির পার্থক্য কি?

বাংলাদেশে প্রচলিত টেলিমেডিসিন চিকিৎসা ব্যবস্থা বিষয়ে আমরা বুঝি, টেলিফোনের মাধ্যমে রোগী চিকিৎসকগণের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন পূর্বক চিকিৎসা পরামর্শ গ্রহণ করা। সে ক্ষেত্রে রোগী এবং চিকিৎসকের পারস্পরিক দেখা সাক্ষাতের প্রয়োজন বা সুযোগ হয় না। চিকিৎসক দূর হতে রোগীর সঙ্গে আলোচনাপূর্বক (টেলিকনসাল্টেশনের মাধ্যমে ) তার রোগ সম্পর্কে পরোক্ষ ধারণা গ্রহণ করে চিকিৎসা পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। কিন্তু রোবোটিক টেলিমেডিসিন চিকিৎসা কার্যক্রম একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত রোবট বা মানব যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। যেখানে রোগী সরাসরি চিকিৎসকের সান্নিধ্যে না এসেও যথাস্থান থেকে অডিও, ভিডিও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের ভিতরে অন্যত্র বা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে শত শত বা  হাজার হাজার মাইল দূরে তার কাঙ্খিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দৃষ্টি সীমানার মধ্যে নিজকে উপস্থাপনে সক্ষম হয় এবং সে  অবস্থায় চিকিৎসক অনেকটা সামনা - সামনাসামনিভাবেই রোগীর শারীরিক সমস্যাগুলো চাক্ষুষভাবে অবলোকন এবং তার সঙ্গে মতবিনিময় করে রোগ সম্পর্কে সম্মক ধারণা গ্রহণ পূর্বক চিকিৎসা প্রদান করতে সক্ষম হয়।

শুধু তাই নয়, চিকিৎসক রোগীর নিকট হতে দূরে বসেই তার ক্লিনিকাল পরীক্ষা এবং প্রযোজনীয় যান্ত্রিক পরীক্ষা (যেমন- এক্সরে আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, ইকো ইত্যাদি) সম্পন্ন করে রোগ নিরূপণ  করতে পারেন। এমন কি রোগীর সান্নিধ্যে না এসেও তার প্রয়োজনীয় অস্ত্রপ্রচার কাজে পরোক্ষভাবে  সহযোগিতা করতে পারেন। এ প্রযুক্তিতে এআই (Artificial Intelligent )-কে পাওয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

সাম্প্রতিককালে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে  রোবোটিক টেলিমেডিসিন চিকিৎসা প্রযুক্তি বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলের জন্য এটি একটি দুর্লভ প্রযুক্তি। বিশ্ব টেলিহেলথ ইনিশিয়েটিভ (WTI) সমাজে সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নিকট উন্নত চিকিৎসা সেবাকে সহজলভ্য করার জন্য পৃথিবীর ছয়টি দেশে এ মূল্যবান যন্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহ করেছেন। বাংলাদেশে সাভারস্থ ফাইলেরিয়া জেনারেল হাসপাতালে প্রদত্ত  টেলিমেডিসিন রোবট বা যন্ত্র মানবটি তার অন্যতম।

এরই মধ্যে রোবোটিক টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন দেশ হতে নিবেদিত প্রাণ বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। আমেরিকা থেকে ১৬ জন ও ইংল্যান্ড থেকে ১ জন  প্রথিতযশা বিশেষায়িত চিকিৎসক উক্ত ফাইলেরিয়া হাসপাতালে রোবোটিক টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। যারা রোস্টার করে সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করবেন।   
   
রোবোটিক টেলিমেডিসিন চিকিৎসা বাবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্য সুবিধা

টেলিমেডিসিন রোবোট বা যন্ত্র মানবটি চিকিৎসা কার্যক্রমের বহুমাত্রিক সেবা আয়োজনে সহযোগিতা করতে সক্ষম। নিম্নে কিছু সংখ্যক সুবিধার বিষয় উল্লেখ করা হল-

★ বিশ্বের অত্যাধুনিক স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে যোগ হয়েছে রোবটিক টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম এবং বর্হিবিশ্বের অনেক দেশেই বিভিন্ন হাসপাতাল উক্ত প্রযুক্তি গ্রহন করেছে ও বিভিন্ন স্থান হতে চিকিৎসকরা এটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ে অধিকতর ভালো ডিজাইন করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারছেন। আর এ সুযোগ বাংলাদেশ  থেকেও গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

★সমাজের সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সুলভে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সহজ হবে।

★ বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগের বিশ্লেষণ কম খরচে সুদক্ষ চিকিৎসকের মাধ্যমে করা যাবে। 

★কোভিড-১৯ এর মতো ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে সংক্রামক রোগের সুচিকিৎসা ডাক্তাররা দূর থেকেই করতে সক্ষম হবেন।

★একজন বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহজেই একজন বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ ও মতবিনিময় করার সুযোগ পাবেন।

★বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ রোগ নির্ণয় বিষয়ক বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার সঠিক ব্যাখ্যা দূর থেকেই প্রদান  করতে  পারবেন।

★মানসিক রোগীদের থেরাপি দেয়া সহজ হবে।

★চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় রোগীদের সম্পৃক্ততা বাড়বে। ★রোগীর পরিচর্যার ক্ষেএে গুনগত মান বৃদ্ধি পাবে।

★ চিকিৎসা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দুরুত্বের প্রতিবন্ধকতা একেবারেই কমে যাবে। দেশ বিদেশের যে কোন স্থান এমনকি দুর্গম পার্বত্যঞ্চল, চর বা দীপাঞ্চলেও অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে চিকিৎসা সেবা পৌঁছানো সহজ হবে।

★এ পদ্ধতিতে অপেক্ষাকৃত কম খরচে রোগী বিদেশ না গিয়ে এ দেশ হতেই নানা রোগ বিষয়ে বিদেশী চিকিৎসকের সুপরামর্শ গ্রহন করতে সক্ষম হবেন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় কমে যাবে।

★ রোগীদের রোগ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যাদি  দীর্গস্থায়ীভাবে  সংরক্ষণ করা সহজ হবে।

★ তাছাড়া ডাক্তার এবং নার্সদের উচ্চতর চিকিৎসার ট্রেনিং, মেডিকেল বোর্ড এবং চিকিৎসকদের মধ্যে মতবিনিময়ইত্যাদি সহজভাবে করা যাবে। 

এছাড়াও টেলিমেডিসিন রোবটের সাথে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক  ডিভাইস বা রোগ নিরূপণ যন্ত্র (যেমন অটোস্কোপ , এক্স- রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ইকো কার্ডিওগ্রাফি, এমআরআই, মেমোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান ইত্যাদি) সংযোগ প্রদান পূর্বক পরীক্ষা নিরীক্ষার তথ্য সংগ্রহ ও  প্রক্রিয়া করে  চিকিৎসকগণের কাছে উপস্থাপন করতে পারে, যা যে কোনো রোগ নিরূপণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক।

টেলিমেডিসিনের শীর্ষ বিশেষায়িত সেবাসমূহ

★টেলিরেডিওলজি
★টেলিসাইকিয়াট্রিক
★টেলিডার্মাটোলজি
★টেলিঅফথালমোলজি
★টেলিনেফ্রলজি
★টেলিঅনকোলজি
★টেলিপ্যাথলজি
★ টেলিরিহেবিলিটেশন
★টেলিঅবস্ট্রেটিক
★ টেলিকার্ডিওলোজি ইত্যাদি।

বাংলাদেশে এই প্রথম আই এ সি আই বি সাভারস্থ ফাইলেরিয়া ও থেলাসেমিয়া হাসপাতালে রোবোটিক টেলিমেডিসিন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে এবং উক্ত কর্মসূচির আওতায় আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের চিকিৎসকদের সাহায্যে বিনামূল্যে সেবা প্রদান করতে যাচ্ছে।  যা এ দেশে স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে টেলিমেডিসিন রোবটের বহুমাত্রিক প্রযুক্তিগুলিকে  কাজে লাগিয়ে সার্বিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন রোগ নিরূপণ ডিভাইস বা যন্ত্র  (যেমন- অটোস্কোপ, ইসিজি, ইকো ,আলট্রাসোনোগ্রাম, এমআরআই, সিটিস্ক্যান প্রভৃতি) এটির সঙ্গে যুক্ত করা এবং উক্ত ফাইলেরিয়া হাসপাতালে একটি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করা  আবশ্যক।

লেখক পরিচিতি

প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন
চেয়ারম্যান, আইএসিআইবি                                                                           
প্রাক্তন পরিচালক, সিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদফতর
                                        
ডা: মোঃ সোহরাব হোসেন  
সদস্য, আই যা সি আই বি
প্রাক্তন ভিও, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে