মানবপাচার রোধে ব্যক্তি সচেতনতা বেশি প্রয়োজন

ঢাকা, রোববার   ২৫ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১০ ১৪২৮,   ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

মানবপাচার রোধে ব্যক্তি সচেতনতা বেশি প্রয়োজন

রিয়াজুল হক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:৪০ ১৬ জুন ২০২১   আপডেট: ২১:৪৪ ১৬ জুন ২০২১

পৃথিবীর কোনো দেশের আইন মানবপাচারের পক্ষে নয়। অনেক আগেই উঠে গেছে প্রচলিত দাস প্রথা। কিন্তু উদ্ভাবন হয়েছে দাস প্রথার নব্য সংস্করণ। অনেকে অবৈধভাবে প্রবাসে গিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বৈধভাবে না যাবার কারণে ভালো কোনো কাজও পাচ্ছেন না। মালিক যেমন ইচ্ছা খাটিয়ে নিচ্ছেন। সড়কের পাশে কিংবা জঙ্গলেই কাটছে তাদের রাত। এছাড়া, স্থানীয় পুলিশের ভয় নিত্যদিনের সঙ্গী। মানব পাচারের শুধু বিদেশ সংশ্লিষ্ট নয়, দেশের অভ্যন্তরেও মানব পাচার হয়ে থাকে। মানব পাচার প্রতিরোধ  ও দমন আইন ২০১২ এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘মানবপাচার’ অর্থ কোনো ব্যক্তিকে (ক) ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বলপ্রয়োগ করে; বা (খ) প্রতারণা করে বা ওই ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক বা পরিবেশগত বা অন্য কোনো অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে; বা (গ) অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা লেনদেন-পূর্বক ওই ব্যক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন ব্যক্তির সম্মতি গ্রহণ করে; বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে যৌন নিপীড়ন বা শ্রম শোষণ বা অন্য কোনো শোষণ বা নিপীড়নের উদ্দেশ্যে বিক্রয় বা ক্রয়, সংগ্রহ বা গ্রহণ, নির্বাসন বা স্থানান্তর, চালান বা আটক করা বা লুকিয়ে রাখা বা আশ্রয় দেওয়া। 

ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মানবপাচারের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সময়ে বঙ্গোপসাগর মানবপাচারের সবচেয়ে বড় রুটে পরিণত হয়েছে। গ্রামে বসবাসকারী দরিদ্র লোকেরা আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাবে সহজেই প্রতারিত হয়। তারা সেই প্রতারণা ধরতে না পেরে সহজেই অবৈধভাবে স্থানান্তরিত হয়। অনেক সময় মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি অপহরণের শিকার হয়। এছাড়া কিছু অঞ্চলে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে মানবপাচারকারীরা আরো বেশি উৎসাহিত হয়। মানব পাচারের কারণে শুধু ব্যক্তির উপরই পড়েনা, এর প্রভাব পড়ে সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতির উপর।

বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে অবৈধ মানবপাচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। মানবপাচার প্রতিরোধে প্রতি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কাউন্টার ট্রাফিকিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। মানবপাচার প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তি সচেতনতাও প্রয়োজন। কারণ দিনশেষে আমরাই ভুক্তভোগী। মানবপাচার প্রতিরোধকল্পে নিম্নোক্ত কিছু পদক্ষেপগুলো আমরা নিজেরাই গ্রহণ করতে পারি, কারণ মানবপাচার রোধে ব্যক্তি সচেতনতা বেশি প্রয়োজন। আমরা নিজেরা সচেতন সা হলে, সমস্যা সমূলে নির্মূল প্রায় অসম্ভব।

১. যারাই বিদেশে যাবেন, বৈধতার বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে নিন। কোনোভাবেই অবৈধভাবে যাওয়া যাবে না। অনেকেই অল্প খরচে বিদেশে যাবার জন্য অবৈধ পথটাকে বেছে নেন। এটা যে কত বড় ভুল, সেটা যাবার পরেই বুঝতে পারে। বৈধভাবে না যাবার কারণে ভালো কোনো কাজও পায় না। মালিক যেমনভাবে ইচ্ছা খাটিয়ে নিচ্ছেন। সড়কের পাশে কিংবা জঙ্গলেই কাটছে তাদের রাত। ঘর ভাড়াও নিতে পারেন না।

২. এলাকায় অপরিচিত কিংবা নতুন কোন কাউকে দেখলে এবং আচার, আচরণে সামান্যতম সন্দেহ হলে অবশ্যই ভালোভাবে খোঁজ খবর নিতে হবে। প্রয়োজনবোধে পুলিশ, জনপ্রতিনিধিকে জানাতে হবে। 

৩. মানবপাচারের বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সম্যক ধারণা দেয়া প্রয়োজন। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একবার করে সকল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক আলোচনা অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। 

৪. দেশে কিংবা বিদেশে কোথাও চাকরির জন্য লোভনীয় প্রস্তাব পেলে, সেই চাকরি এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সকল তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনাকে যে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, আদৌ আপনি সেটা পাবার উপযুক্ত কিনা?

৫. দূরে কোথাও আত্মীয়তা করতে হলে একপক্ষ আরেক পক্ষের খোঁজ খবর নিয়ে নেয়া উচিত। এছাড়া এক মাস কিংবা দুই মাস মেয়াদি টুরিস্ট ভিসায় কেউ বিদেশে গিয়ে সেখানে যেন না থেকে যায়, সে বিষয়ে নিজেদের সচেতনতা প্রয়োজন। পুলিশের ভয় হয় প্রতিদিনের সঙ্গী। ধরা পরলে দিনের পর জেল খাটতে হয়।

৬. পাচারের শিকার ব্যক্তিরা যেন সমাজে পূর্বের সম্মান ও মান-মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন সেজন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। অনেকেই এক ঘরা জীবনযাপন করেন। তাদের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।

সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে মানবপাচার সমূলে উৎপাটন করতে হবে। মানব পাচার সামান্য কোনো সমস্যা নয়। এটির সঙ্গে আরো অনেক ধরনের সমস্যা জড়িয়ে আছে। মানব পাচারের কারণে শুধুমাত্র ভুক্তভোগী ব্যক্তির উপরই প্রভাব পড়ে না, প্রভাব পড়ে সমাজ, অর্থনীতির উপরও। এ জন্যই দেশের স্বার্থে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। বন্ধ হোক সকল প্রকার মানব পাচার। কারণ উন্নয়নের প্রতিটি সূচকেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই এগিয়ে যাওয়া যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে আমাদের সকলকেই কড়া নজর রাখতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ