ডিজিটাল আইনের সংস্কার হতে পারে, কিন্তু বাতিলের দাবি কেন?

ঢাকা, রোববার   ০১ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮,   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

ডিজিটাল আইনের সংস্কার হতে পারে, কিন্তু বাতিলের দাবি কেন?

সাজেদা হক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৮ ১০ মে ২০২১   আপডেট: ১৫:১৬ ১০ মে ২০২১

শুরুতেই বলে রাখা ভালো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কোনোক্রমেই সংবিধান বা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী কোনো আইন নয়। তবে এই আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে কি না তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। সংশোধন করা যেতে পারে অপব্যবহারের সুযোগ থাকা ধারা, সংযোজন করা যেতে পারে প্রয়োজনীয় ধারা বা নির্দেশনা।

আমি মনে করি দেশের স্বার্থে, দেশের কল্যাণবিরোধী, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন কিছুই করা উচিৎ নয় বলে। শুধু দেশ কেন, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সম্প্রদায়কে নিয়েও এমন কোনো মন্তব্য, কাজ, বক্তব্য দেয়া উচিত নয় বলেই মনে করি। 

আগামীর বিশ্ব ডিজিটাল, মানে হাতের মুঠোয়। সবাই এখন বলা শুরু করেছেন অনলাইনই প্রধান গণমাধ্যম। এখন মোবাইলে ছবি তুলে ইচ্ছে মতো এডিট করে যেকোনো ভিডিও আপলোড করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। বেশিরভাগই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আগে ঘটে যাওয়া বড় কোনো অপরাধ বা ঘটনার খবর জানার জন্য আমাদের পত্রিকা হাতে পাওয়ার অপেক্ষা করতে হতো। এখন তা পাওয়া যায় মুহূর্তেই। অনেকে লাইভে এসেও ঘটনার বর্ণনা করছেন নিজের মতো করেই। যার নেই কোনো বাছ-বিচার, নেই কোনো সম্পাদনা, নেই কোনো রাখ-ডাক। 

মূল গণমাধ্যমে খবর প্রচারের দায় বর্তায় সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের উপর কিন্তু ব্যক্তি যখন খবরের সোর্স, সেই দায় কার উপর বর্তাবে? আর ডিজিটাল বিশ্বের সুযোগ নিয়ে বদলে গেছে অপরাধের ধরণও। ওয়েবসাইট এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যোগাযোগের বিষয়বস্তু বিভিন্ন কারণে অরুচিকর, অশ্লীল বা আক্রমণাত্মক হচ্ছে। 

ইন্টারনেটের মাধ্যমে কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামোকে সরাসরি আক্রমণ করছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যত্যয় ঘটানো, ব্যক্তি,প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় ওয়েবসাইট হ্যাকিং, ভুয়া আইডি/ই-মেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করে নাম-ঠিকানা, ক্রেডিট কার্ড নাম্বার এমনকি ফোন নাম্বার নিয়ে মিষ্টি কথায় ভোলাতে চেষ্টা করে অপরাধী চক্র, সাইবার হয়রানি- ইমেইল বা ব্লগ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে হুমকি দেয়া, ব্যক্তির নামে মিথ্যাচার/অপপ্রচার, নারী অবমাননা, যৌন হয়রানি, ফিশিং- লগইন/অ্যাকসেস তথ্য চুরি, অর্থ আত্মসাৎ-ইন্টারনেট থেকে তথ্য চুরি করে ব্যাংকের এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর, সাইবার মাদক ব্যবসায়-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে ইদানীং ইন্টারনেট ব্যবহার করে মাদক ব্যবসার প্রবণতা বেড়েছে, পাইরেসি- সদ্য প্রকাশিত গান ও সিনেমার এমপি-থ্রি বা মুভি ফাইল ইন্টারনেটে শেয়ার হয়ে যাচ্ছে, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি- ব্লগ ও ওয়েবসাইট থেকে কোনো লেখা ও ফটোগ্রাফি সহজেই কপি-পেস্ট করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে সাইবার কমিউনিটিতে, পর্ণোগ্রাফি ও শিশু পর্ণোগ্রাফি ইন্টারনেটে ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যক্তিগত তথ্য-পরিচয়-ছবি চুরি ও ইন্টারনেটর অপব্যবহার। 

কারা করছে এসব? জানেন কেউ? এরা কি কারো স্বজন নয়? এদেরকে কি ছেড়ে দেয়া উচিৎ? যদি না ছাড়তে চান তাহলে ধরবেন কিভাবে? আইন লাগবে না? যদি আইন লাগে, যদি উপরে উল্লেখিত অপরাধের বিচার পেতে চান তাহলে যাবেন কোথায়? আইন তো লাগবেই। দেশ এখন ডিজিটাল। অপরাধের ধরণও ডিজিটাল তাহলে ডিজিটাল আইন আমাদের থাকতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।  

এ আইনের ৪৩ ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি, জব্দ এবং আটকের অসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আর এ আইনে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা উস্কানি, মানহানিকর তথ্য প্রচার ও প্রকাশ এবং আইন শৃঙ্খলার অবনতির মতো বিষয়গুলোতে বিভিন্ন ধারায় অপরাধ ও শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অপপ্রয়োগের যে অভিযোগ উঠছে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। আইনের যেসব অস্পষ্টতা আছে তা আইনের ৫৯ ধারা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ আছে। এই ধারার ক্ষমতা বলেই আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের সব স্তরে তদারকি সেল গঠন, আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, ইচ্ছাকৃত অপপ্রয়োগে শাস্তির বিধান রেখে আইনের অপপ্রয়োগ রোধ সম্ভব। এই আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ দেয়াও যেতে পারে। কিন্তু আইন বাতিলের দাবি কেন তা বোধগম্য নয়?

আইনের ধারা ২১-এ মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড; ধারা ২৮-এ ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত; ধারা ২৯-এ মানহানির তথ্য প্রকাশ, প্রচার; ধারা ৩১-এ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো এবং ধারা ৩২-এ সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধের জন্য দণ্ডের বিধান রয়েছে।

যদিও অব্যাহত প্রতিবাদের সংস্কার প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এই আইনে কোনো অপরাধের অভিযোগ এলে পুলিশের তদন্তের আগে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না বা তার বিরুদ্ধে মামলা নেয়া যাবে না, এমন একটি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এমন আরো কোনো সংযোজন থাকলে কিংবা কারো সুপারিশ থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা যেতে পারে, হতে পারে জাতীয় ডায়ালগ। 

এদিকে, ভারতের তথ্য অনুসারে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৩৯ টি সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে ৫ হাজার ৭৭১টির এফআইআর দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে কর্ণাটকে মামলার সংখ্যা ২১ হাজার ৫৬২টি। এক্ষেত্রে ৮৭টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। আর মহারাষ্ট্রে ৫০ হাজার ৮০৬ টি সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে ৫৩৪টির অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর অব্যাহত নিপীড়নের মুখে মিয়ানমারের রাজপথে বড় বিক্ষোভ করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে জান্তা সরকারের বিরোধিতা করতে অনলাইনে ঝুঁকছে মানুষ। ইন্টারনেট বন্ধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সেই সমালোচনা বন্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করছে জান্তা সরকার। 

ইংল্যান্ড বিশ্বে প্রথম সাইবার আইন প্রণেতা হিসেবে তৈরি করে কম্পিউটার মিস ইউজ অ্যাক্ট ১৯৯০। ই-অপরাধ প্রতিরোধে ২০০৮ সালে জাতীয় ই-অপরাধ ইউনিটও গঠন করা হয়। ভারতেও তৈরি হয় তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০০। বাংলাদেশে ২০০৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ আইন তৈরি হয় এবং পরে এ আইন সংশোধন করা হয়।

লেখক: সাংবাদিক

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ