ক‌রোনাকালের রমজানে যাকাত প্রদান

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

ক‌রোনাকালের রমজানে যাকাত প্রদান

রিয়াজুল হক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩৪ ২৬ এপ্রিল ২০২১  

ইসলামের মৌলিক পঞ্চভিত্তির একটি যাকাত। নামায, রোযা ও হজের ন্যায় এটিও একটি ফরয ইবাদত।  নির্ধারিত নিসাবের মালিক ধনী মুসলমানদের উপর এর বিধান সম্পূর্ণরূপে আরোপিত। না আছে এর অস্বীকৃতি; না অবহেলা। বছর শেষে শরিয়ত কর্তৃক নির্ণীত হিসেবে সম্পদের নির্ধারিত অংশ গরিব মুসলিমকে প্রদান করতে হয়।

যাকাত মানে সমৃদ্ধি, ক্রমবৃদ্ধি ও পবিত্রতা। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ব্যক্তির অবশিষ্ট সম্পদ পবিত্র হয়ে যায়। আসমানি রবকত এসে সমৃদ্ধ করে। ধনী কর্তৃক এ প্রদানে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত থাকবে না কোনো বিনিময় গ্রহণের চিন্তা এবং উপকার অর্জনের মানসিকতা।

শুরুতে ছোট একটা ঘটনা বলি। এক ব্যক্তি খুবই ধার্মিক ছিলেন। আল্লাহ্ তাকে অনেক ধন সম্পদ দান করেছিলেন। প্রতিবছর হিসেব করেই যাকাত আদায় করতেন। একদিন তিনি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার জন্য যখন উঠলেন, দেখলেন এক চোর তার সিন্দুকের তালা ভাঙার চেষ্টা করছে। তিনি চোরকে দেখেও না দেখার ভান করে অযু করলেন, তাহাজ্জুদ নামাজ পড়লেন, দোয়া করলেন। ফজরের আযান দিল। তখন সেই ধার্মিক ব্যক্তি চোরের কাছে গিয়ে বললেন, সকাল হয়ে গেল তবুও এ ছোট তালাটি ভাঙতে পারলেন না? চোর ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল।

এরপর ওই ধার্মিক ব্যক্তি মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করলেন এবং ইমাম সাহেবকে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। ইমাম সাহেব প্রশ্ন করলেন, তুমি প্রথমেই কেন চোরকে ধরলে না? তখন তি‌নি জবাব দিলেন, আমি আপনার মুখে শুনেছি যে যাকাত আদায় করে তার সম্পদ আল্লাহ হেফাজত করেন। আপনার সে কথাটার উপর আমার বিশ্বাস ছিল। আমি প্রতিবছর হিসাব করে আমার সম্পদের যাকাত আদায় করি। সেহেতু আমার সম্পদ কেউ চুরি করতে পারবে না। আজ রাতে আমি সেই প্রমাণ আমি পেলাম। কারণ চোরটি সারারাত চেষ্টা করে ছোট একটি তালা ভাঙ্গতে সক্ষম হয়নি।

সব সময় দেখে এসেছি রমজানের সময় মসজিদে ইফতার হয়। ক‌রোনার কারণে মসজিদে এখন আর সেটা সম্ভব নয়। ইফতারের সময় অনেক গরীব, অসহায় রোজাদার ব্যক্তি মসজিদে ইফতার করতো। রিকশা-ভ্যানচালকরা মাগরিবের আযানের পূর্ব মুহূর্তে তাদের বাহনটি মসজিদের পাশে রেখে ইফতার করতে বসতো। অনেক ভ্রাম্যমাণ মানুষ, ছোট ছোট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও মসজিদে ইফতার করতো। মসজিদের আশেপাশে বসবাসকারী গরিব মানুষগুলো তাদের ছোট বাচ্চাদের মসজিদে পাঠিয়ে দিত। গরিব মানুষগুলোর ইফতারের সেই সুযোগ এখন বন্ধ। ক‌রোনাকালে দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কাজ প্রায় বন্ধ। আয় রোজগার তেমন নাই। 

আমরা অনেকেই যাকাত দিয়ে থাকি, অনেকেই আবার দেই না। কারো কারো ধারণা, এত কষ্ট করে আয় করলাম। এখন সেখান থেকে গরিব মানুষকে দিয়ে দিতে হবে। তাহলে আমার অর্জিত সম্পদ তো কমে যাবে। এই চিন্তা করে অনেকেই যাকাত দেন না। হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, কোন বান্দা যখন যাকাত আদায় করেন, তখন আল্লাহর আদেশে একজন ফেরেশতা তার জন্য এভাবে দোয়া করতে থাকেন, "হে আল্লাহ! আপনার পথে যে দান-সদকা, যাকাত দেয়, তার সম্পদকে আপনি বৃদ্ধি করে দিন আর যে ব্যক্তি সম্পদ ধরে রাখে (যাকাত দেয় না) তার সম্পদ আপনি ছিনিয়ে নিন।"

আমাদের যাদের ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ, তারা যদি সঠিক হিসাব করে যাকাতের টাকা গরীব অসহায়দের মাঝে দিয়ে দেন, তাহলে দেশের যে কোন পরিস্থিতিতেও কোন মানুষ একবেলা না খেয়ে থাকবে না। আমরা যারা যাকাত দিবো, তারা অন্তত এই সময়টায় দেন। করোনাকালে রমজান মাসের এই সময় গরীব আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং অন্যান্য অসহায় মানুষগুলোকে যাকাতের টাকা দিয়ে হলেও সহায়তা করুন। 

দূর-দূরান্তের মানুষের খোঁজ হয়তো আমরা নিতে পারব না। কিন্তু বাড়ির পাশে যারা বসবাস করছে, নিকটাত্মীয় যারা আছে, তাদের অবস্থা আমরা সবাই জানি। লজ্জায় হয়তো তারা কিছু চাইতে পারবে না। যাকাতের টাকা দিয়ে হলেও তাদেরকে কিছুটা আর্থিক সহায়তা করুন। নিজের সম্পত্তির উপর গরিবের হক আদায় করুন। একই সঙ্গে, ভালো থাকবে গরিব অসহায় মানুষ।

লেখক: যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে