কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য কর্নার

ঢাকা, বুধবার   ০৩ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৮ ১৪২৭,   ১৮ রজব ১৪৪২

কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য কর্নার

জান্নাতুল বাকিয়া জেনি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৫৮ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ২১:০৮ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ইউনিসেফের হিসেবে আমাদের দেশে মোট তিন কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে, যারা এদেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। আর তাদের সুস্বাস্থ্যের ওপরই নির্ভর করে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি। এখানে আমরা নেপোলিয়নের সেই প্রখ্যাত উক্তিটি স্মরন করতে পারি, “তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব।”

আজকের কিশোর বা কিশোরী, আগামী দিনের একজন সচেতন বাবা-মা’র ভুমিকা তখনই পালন করতে পারবে, যখন তাদের নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে স্বচ্ছ ধারনা থাকবে। তাই কিশোর কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে এবং তাদের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলতেই “কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য কর্নার” গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি পরিচালনায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ।

এসব সেবা কেন্দ্রে সর্বস্তরের কিশোর-কিশোরীরা এসে বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশ্ন, সেবাগ্রহণ, বয়স ভেদে পুষ্টিকর খাদ্য তালিকা, আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার নিয়ম, মাসিককালীন পরিচর্যা, শারীরিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্যগত প্রশ্ন, বাল্যবিবাহের কুফল জানাসহ নানা বিষয়ে সেবা পাচ্ছে।

ফাইল ছবি

কৈশোরের এই সময়টাতে একজন শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঘটে, তাই তারা সহজেই অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে পরে। এসময়ে সুসঙ্গের অভাবে কিশোররা মাদকাসক্ত হয়ে পরতে পারে, কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পরতে পারে, এসময় কারো মাঝে হতাশার সৃষ্টি হলে, সেই হাতাশা থেকে আত্মহত্যার মতো ভুলের পথ বেছে নিতে পারে। তাই কৈশোরে শিশুর শারীরিক যত্নের মতই মানসিক যত্নের জন্য একজন সৎ পরামর্শকের ভূমিকা খুব বেশি। তাই কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য কর্নার  হয়ে উঠতে পারে কৈশোরের সকল সমস্যা মোকাবিলার বিশ্বস্ত সঙ্গী।

আমাদের দেশে এখনো অনেক মানুষ ভ্রান্ত ধারনা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত রয়েছে। যার ফলস্বরূপ আমরা এখনো দেখতে পাই- নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাব, বাল্যবিবাহের উচ্চহার, বয়ঃসন্ধিকালেই অনেক মেয়ের গর্ভধারণ, সহিংসতা ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা, মাসিকের সঠিক ধারনার অভাব। 

এই বয়সের ছেলে-মেয়ে এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক ও সামাজিক বিষয়ে কাউন্সেলিং ইত্যাদির মতো বিষয়ে তাদের অবগত করাই এই সেবা কেন্দ্রের লক্ষ্য।

সারাদেশে বর্তমানে ৬০৩টি কৈশোর বান্ধব সেবা কেন্দ্র রয়েছে। কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রমের একটি অংশে পুষ্টি, এইচআইভি, পয়ঃনিষ্কাশন, ঋতুস্রাব কালীন পরিচ্ছন্নতা, সঠিক বন্ধু নির্বাচন, জীবন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা এবং গণমাধ্যমে অংশগ্রহণের মতো বিষয়ও রয়েছে। প্রতিবন্ধী কিশোর-কিশোরীরাও যাতে এসব সেবা পায় সে বিষয়টিও ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে।

ইউনিসেফ এখানে দুই পর্যায়ে সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেয়। প্রথমত, সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সরকারকে সহায়তা করা হয়। যেমন, নীতি সংশোধন, কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কর্মসূচি তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, যেসব জেলায় বাল্য বিয়ের হার অনেক বেশি সেসব জেলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেশের মধ্যে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ।

যেসব এলাকাতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু হয়েছে সেখানকার লোকজন মনে করতে শুরু করেছেন যে, কিশোরী কর্নার হওয়াতে কিশোর কিশোরীরা যেহেতু এখানে নিয়মিত সেবা নিতে পারছে, ফলে এলাকায় অসুস্থ কিশোর-কিশোরীর হার কমছে।

তবে এই সেবাকেন্দ্রের কিছু সীমাবদ্ধতা পাওয়া গেছে যেমন-  চাহিদা তুলনায় ওষুধের কম সরবরাহ, অনেকেরই সেবা নিতে এসে ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে। এ সেবা কেন্দ্রগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকে আর এই সময় স্কুল-কলেজের ক্লাস-পরীক্ষা থাকায় কিশোর-কিশোরীরা ঠিক মতো সেবা নিতে পারছেন না।  তাই এখন এই সেবা কেন্দ্র থেকে আমদের একটাই প্রত্যাশা, যাতে হাতের নাগালেই এর সেবা পাওয়া যায় এবং যে কোন সমস্যাতে যাতে কিশোর-কিশোরীরা সেবাকেন্দ্রে আসতে পারে। আর সেবা কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষের মনোভাব যাতে বন্ধুত্বপূর্ন হয়, কেননা বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার পেলে তবেই তো কিশোর-কিশোরীরা তাদের সমস্যার কথা মন খুলে বলতে পারবে। সব জেলার সব কিশোর কিশোরীর আস্থা অর্জন করতে পারলে তবেই এই সেবা কেন্দ্রের সার্থকতা। 

আর এজন্য অবশ্যই কিশোর-কিশোরীদের সুবিধার্থে কৈশোর বান্ধব সেবা কেন্দ্রগুলো বাড়াতে হবে এবং সপ্তাহে ৭ দিন,  সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চালু রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কিশোর-কিশোরীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনলাইনেও এই সেবা কার্যকর্ম শুরু করার অনুরোধ জানাচ্ছি। কারন, আমি মনে করি, অনেকে সামনাসামনি কথা বলতে সংশয় বোধ করে, তাদের জন্য অনলাইন সেবা ব্যবস্থা অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কিশোর-কিশোরীদের প্রতি এই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য সেবাকেন্দ্রের সাথে নিয়োজিত সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় এখন আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত, “সপ্তাহ জুড়ে সারাবেলা, কৈশোরবান্ধব সেবাকেন্দ্র থাকুক খোলা।”

ডেইলি বাংলাদেশ/ইকেডি