পেঁয়াজের ঝাঁজ, সরকারের উদ্যোগ ও আমাদের করণীয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৪ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১২ ১৪২৮,   ১২ জ্বিলকদ ১৪৪২

পেঁয়াজের ঝাঁজ, সরকারের উদ্যোগ ও আমাদের করণীয়

 প্রকাশিত: ১৮:১৩ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ২০:১৮ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০

ড. মোঃ আজাদুল হক
১৯৮০ ইং সালের ,১৬ ই জুন গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো. আজাদুল হক। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে থেকে কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন সহ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব সুকুবা, জাপানে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণাসহ দেশী-বিদেশী জার্নালে গবেষণামূলক সমসাময়িক বিষয়ে লেখালেখিসহ দেশের কৃষিক্ষেত্র উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন।

বাংলাদেশের যতগুলো কৃষি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আছে তার মধ্যে পেঁয়াজ, আদা ও রসুন গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের গৃহিণীরা পেঁয়াজ ছাড়া যেন রান্না করতে জানেই না। 

তাই পেঁয়াজকে বলা হয় তরকারি রানী। যেমন-গরুর, খাসি ও মুরগির মাংস রান্না, আলু ভর্তা, ডাল রান্না, সবজি রান্না, মাছ রান্না, পেঁয়াজু বানানো চটপটি বানানো সহ ইত্যাদি মুখরোচক রান্নায় পিঁয়াজের জনপ্রিয়তা আছে। তাই পেঁয়াজের চাহিদা বছরে প্রায় ৩৫ লক্ষাধিক মেট্রিক টন।

সর্বশেষ প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০১৯ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ প্রায় ১৮ লাখ টন। যা গত বছরে ছিল ১৭ টন। যেখানে আমদানি করা হয় প্রায় ১১ লাখ টন। ফলে দেখা যায়, এর চাহিদা দিন দিন যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাজারে দেশীয় পেঁয়াজর ঘাটতির মূল কারণ ছিল এটি। আর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরতায় বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। মূলত পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেই সিংহভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়।মিয়ানমার, মিসর, তুরস্ক থেকেও কিছু পেঁয়াজ আমদানি করা হয়।

গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।কয়েক দিনের ব্যবধানেই কেজি প্রতি দাম ৪০-৪৫ টাকা থেকে ৬০ টাকা হয়ে যায়। হঠাৎ করে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত ঘোষণা করে, ভারত থেকে রফতানি করা পেঁয়াজের দাম টন প্রতি সর্বনিম্ন মূল্য হবে ৮৫০ ডলার, যা আগে ছিল ৩৫০ ডলার। 

ভারত সরকার তাদের অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই দাম বাড়ার বিষয়টি আম প্রথমেতারা রফতানি নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল নেয়।পরবর্তী সময়ে তাদের ভোক্তাদের চাহিদা অটুট রাখার স্বার্থে গত বছর সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করে পেঁয়াজ রফতানি করা হবে না বলে জানিয়ে দেয়।

ফলে বাজারের এজেন্টরা দাম বাড়ানোর প্রতিযোগীতায় নামে। এর দাম ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে। পেঁয়াজের দাম ক্রমবর্ধমান হাড়ে বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করে। 

পেঁয়াজের ঝাঁজ যে হারে ছড়াচ্ছে দাম তার চেয়ে দ্রুতগতিতে কারণ ছাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা পরে ৬০-৭০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১০০ টাকায় দাম বৃদ্ধি পায়। যা গত বছর বেড়ে প্রায় ২০০ টাকা ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে পেঁয়াজের দাম যাতে এ বছর ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা যাতে পেঁয়াজ ইচ্ছামতো মজুদ রাখতে না পারে সেজন্য সরকার কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। 

যেমন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেতৃত্বে বাজার মনিটরিং শুরু করে। খোলা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। 

এরই মধ্যে সরকারের সঠিক উদ্যোগের ফলে বন্ধ থাকা ভারত থেকে আটকে পড়া ট্রাক বোঝাই পেঁয়াজ স্থলবন্দর দিয়ে আসা শুরু করে। সফল কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, আরো ২ হাজার টন পেঁয়াজের বীজ আমদানি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। 

এরই মধ্যে পেঁয়াজ আমদানির ওপর ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত শুল্ক মুক্ত ঘোষণা করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এর মতে, বিশ্বে যেখানে গড় ১৮ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় সেখানে বাংলাদেশে এককভাবে প্রায় গড় ১১.৫ লাখ মেট্রিক টন। 

তারপরও যে ঘাটতি থাকে তার যোগান নিশ্চিত করার জন্য আমদানির পাশাপাশি পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত জাতের বীজ কৃষককে সরবরাহ করা জরুরি। 

পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণ পদ্ধতি উন্নয়নসহ সঠিক নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। কৃষককে ভর্তুকি দিতে পারলে বাজারে সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা যেতে পারলে এর বাজার স্থিতিশীলতা ফিরে আনা সম্ভব। 

পাশাপাশি আমাদেরও গুজবে কান না দিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে বেশি পরিমাণে পিঁয়াজ ক্রয় করে মজুদ না করে ধৈর্য ধারণ করতে পারলে বাজারের সিন্ডিকেট দুর্বল করা সম্ভব।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসআই