প্রেরণাদায়িনী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৫ ১৪২৭,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রেরণাদায়িনী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

 প্রকাশিত: ১৪:০৩ ৮ আগস্ট ২০২০  

বীরেন মুখার্জী

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা। তিনি ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট টুঙ্গিপাড়া গ্রামে পিতা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক এবং মাতা হোসনে আরা বেগমের কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন। ফুলের মতো গায়ের রঙ দেখে ফজিলাতুন্নেছার মা হোসনে আরা বেগম তাকে রেণু বলে ডাকতেন। পিতা-মাতার দুই কন্যা সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। ফজিলাতুন্নেছার পিতা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক কো-অপারেটিভ ডিপার্টমেন্ট যশোরে অডিটর পদে চাকরি করতেন। ফজিলাতুন্নেছার তিন বছর বয়সে তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে মাতা হোসনে আরা বেগম যখন মারা যান তখন ফজিলাতুন্নেছার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। পিতা-মাতা হারা দুই নাবালিকা অনাথ মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব তখন এসে পড়ে ৮০ বছরের বৃদ্ধ দাদা শেখ মো. আবুল কাসেমের ওপর। তিনিই বঙ্গবন্ধুর পিতাকে মেয়ে দুটি পালনের দায়িত্ব দেন। চাচার কথায় বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান আর মাতা সায়েরা খাতুন মেয়ে দুটিকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তখন থেকে শিশু ফজিলাতুন্নেছা ও তার বড় বোন বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতার অপত্য ¯স্নেহে, বঙ্গবন্ধুর ভাই-বোনদের সঙ্গে পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। 

ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শৈশবে সঙ্গী হিসেবে পান এবং জীবনসঙ্গী হিসেবে যুক্ত হন বঙ্গবন্ধুর এন্ট্রান্স পাসের পর। শেখ মুজিবুর রহমানের স্কুল জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে তার পিতার সান্নিধ্যে। শেখ মুজিবের সঙ্গে ৯ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফজিলাতুন্নেছা। শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, ‘আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স বার তের হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সঙ্গে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সঙ্গে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হলো। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধহয় তিন বছর হবে।’

শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যেমন বাঙালি ও বাংলাদেশ একইসূত্রে গ্রথিত, তেমনি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও পরস্পর অবিচ্ছেদ্য নাম। দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বার বার দাঁড়াতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামে বঙ্গমাতাও নিজেকে নানানভাবে যুক্ত করেছেন। তিনি ছাত্রলীগকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন। বঙ্গবন্ধু বার বার কারাবরণ করেছেন আর ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাকসহ অপরাপর ছাত্রনেতার সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রেখেছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা। জানা যায়, নিজের গহনা বিক্রি করে তিনি ছাত্রলীগের সম্মেলনে অর্থ জুগিয়েছেন। আবার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি থেকে আয়কৃত অর্থে অনেক অসহায় মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ আলোচনায় বঙ্গমাতার জীবনাচারও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে। টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না।   

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিনেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়ে ওঠেননি। এ জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার মাধ্যমেই তিনি জাতির পিতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর এই সফলতার পেছনে নিরলস ভূমিকা রেখেছেন বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। শেখ মুজিবের সহধর্মিণী হিসেবে প্রতিটি সংকটকালীন সময়ে পাশে থেকে বঙ্গবন্ধুকে সাহস জুগিয়েছেন বেগম তিনি। বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা হিসেবে উত্তরণের প্রতিটি স্তরে তিনি ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন, করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি স্বামীর অনুসারীদের দেখভাল করার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারকে আগলে রেখেছেন। 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের দুটি ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে বঙ্গমাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর মধ্যে প্রথমেই আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিষয়টি। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙালি নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ মামলা দায়ের করে। বঙ্গবন্ধু এ মামলায় বিচলিত না হয়ে আইনিভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য আইনজীবীদের অর্থ জোগানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। এ মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে বাঙালি রাস্তায় নেমে আসে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথ বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ রূপ নেয়। পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকেও গ্রেফতারের হুমকি দেয়। তবে আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ায় পাকিস্তান সরকার পিছু হটে। পরবর্তীতে পাকি-সরকার লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্যারোলে মুক্তির সিদ্ধান্তে বেঁকে বসেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা। তিনি প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানান। কেননা, তিনি শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে প্যারোলে নয়; নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। এ জন্য তিনি কারাগারে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোর বৈঠকে যেতে নিষেধ করেন। তিনি তার দূরদর্শী প্রজ্ঞায় আরও বুঝতে পেরেছিলেন, শেখ মুজিবের ব্যাপারে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে বেগমের পরামর্শে শেখ মুজিবও অনড় থাকেন। প্যারোলে মুক্তির তিনি অসম্মতি জানান। ’৬৯ এর গণআন্দোলন ধীরে ধীরে স্বাধীকারের আন্দোলনে রূপ নেয়। শেখ মুজিবের মুক্তি আন্দোলন তখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দিতে বাধ্য হন পাকিস্তান সরকার। পরদিন, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতি তাদের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয়। সঙ্গত কারণে, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে প্যারোলে মুক্তি না নেয়ার বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের এই সিদ্ধান্ত যে কোনো মাপকাঠিতে অনন্য হিসেবে স্বীকৃত। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ইউনেস্কো এই ভাষণকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ভাষণে নেপথ্যে বঙ্গমাতার সঠিক পরামর্শ ছিল বলে। জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে ওই সময় তার সহকর্মীরা ভাষণের ব্যাপারে নানা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে বঙ্গমাতা এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকে যা মন থেকে বলতে ইচ্ছে করে, যা বলা উচিত, তা-ই বলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, তাদের নিরাশ করো না। যা বলার চিন্তাভাবনা করেই বলবে।’ ফলে এ কথা বলা যেতেই পারে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতিকে যে স্বাধীনতার ডাকে উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন তাতে বঙ্গমাতার মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন বঙ্গবন্ধুকে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছিল। 

বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রিয় রেণু। তিনি একাধারে ছিলেন জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান ও ধৈর্যশীল। এককথায় অসামান্য একজন মানুষ। মহীয়সী নারী। ১৯৩৯ সালে বিবাহবন্ধনের পর থেকে আমৃত্যু দুজনের সম্পর্ক ছিল অতিমধুর। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পরও বেগম মুজিব কখনো মুখ ফুটে ‘আহ্!’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। তাদের সংসার আলো করে একে একে জন্ম নেন শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেল। বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রভাব ছিল অকল্পনীয়। স্বামীর প্রতিটি অর্জনের পেছনে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। মাসের পর মাস কারান্তরীণ বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে পরিবারের হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করা, তাদের দেখভাল, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাযত্ন কোনোটাই কম করেননি। ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ততার মাঝে কখনো ভুলে যাননি স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। মনটা সব সময়ই তার জন্য কাঁদতো। কারাগারের ভেতর শেখ মুজিব কেমন আছেন, তিনি সুস্থ আছেন কিনা-এসব খোঁজ রাখতেন নিয়মিত। একবার একনাগাড়ে ১৭-১৮ মাস কারান্তরীণ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এসময় তার স্বাস্থ্য বেশ খারাপ হয়েছিল। এ অবস্থা দেখে বেগম মুজিব কষ্ট পান। স্বামীকে বলেন, ‘জেলে থাক আপত্তি নেই। তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গেছেন... তোমার কিছু হলে বাঁচব কি করে?’ শুনে বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘খোদা যা করে তাই হবে, চিন্তা করে লাভ কী?’ বেগম মুজিব সংসারে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে অনেক কষ্ট করতেন। কিন্তু স্বামীকে কিছুই বলতেন না। নিজে কষ্ট করে স্বামীর জন্য টাকাপয়সা জোগাড় করে রাখতেন। যাতে স্বামীর কষ্ট না হয়। তিনি শুধু বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীই ছিলেন না। ছিলেন তার রাজনৈতিক জীবনের সুখ-দুঃখের সাথী। অন্যদিকে মুখে কিছু না বললেও বঙ্গবন্ধু ঠিকই বুঝতেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘সে (রেণু) তো নীরবে সকল কষ্ট সহ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না। কিছু বলে না বা বলতে চায় না, সেই জন্য আমার আরো বেশি ব্যথা লাগে।’

উল্লেখ্য যে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মতো নিজের যাপিত দিনগুলোর কথা লিখতে শেখ মুজিবকে প্রেরণা দিয়েছিলেন বেগম মুজিব। তিনি জেলগেটে স্বামীকে লেখার জন্য খাতা দিয়ে এসেছিলেন। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’র উল্লেখ আছে (পৃষ্ঠা ২৫১) ‘পাঁচ মাস পর দুঃসহ বন্দি জীবনযাপনের সময় এই খাতাটি বেগম মুজিব তাকে পাঠিয়েছিলেন। রয়েল স্টেশনারি সাপ্লাই হাউজের ৩২০ পৃষ্ঠার রুল টানা খাতাটির মাত্র ৫২ পৃষ্ঠা লেখার সুযোগ তিনি পান।’ জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী হিসেবে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকেও গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়া হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে কুর্মিটোলার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে একই গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ২৫৬-২৫৭) শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘কুর্মিটোলার কোন জায়গায় আমি আছি নিজেই জানি না। ... আধা ঘণ্টার মধ্যে সেই দু’জন সাদা পোশাক পরিহিত কর্মচারী এলেন-যাদের সাথে পূর্বেই দেখা হয়েছিল। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোনো অসুবিধা আছে কিনা?... তিনজন এক সঙ্গে চা খেলাম। আমি বললাম, ‘আমাকে কেন আপনারা এনেছেন জানি না, তবে সত্য চাপা থাকবে না। অন্যায় ভাবে আমার উপর অত্যাচার করে কি লাভ হবে বুঝতে পারছি না।’ একজন মনে হলো-মেজর হবে, একটু টিটকারী দিয়ে কথা বলছিলেন, এমনকি আমার স্ত্রীও জড়িত আছে এমন ইঙ্গিতও দিতে ভুল করলেন না। আমি তাহাকে লক্ষ্য করে বললাম, ‘দেখুন, আমার স্ত্রী রাজনীতির ধার ধারে না। আমার সাথে পার্টিতে কোনোদিন যাই নাই। সে তার সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাইরের লোকের সাথে মেলামেশাও করে না। আমার রাজনীতির সাথে তার সম্বন্ধ নাই।’ এ ঘটনায় প্রমাণিত হয়, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও পাকিস্তানি সামরিক সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি নির্মাণের পেছনে বঙ্গমাতার অনেক কষ্ট ও শ্রম আছে। বাসা বদলের ঝক্কি-ঝামেলা এড়ানো এবং স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে ৩২ নম্বরে এই বাড়িটি নির্মিত হয়। ১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার এসে রজনী চৌধুরী লেনে বাসা নেন। ১৯৫৪ সালে শেখ মুজিব মন্ত্রী হলে বেগম মুজিব গেন্ডারিয়ার বাসা ছেড়ে ৩ নম্বর মিন্টো রোডের বাড়িতে ওঠেন। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলে ১৪ দিনের নোটিশে ৩ নম্বর মিন্টো রোডের বাসা ছাড়তে বাধ্য হন বেগম মুজিব। এ রকম অনেকবার তার বাসা বদল করতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৬১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নিজেদের বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ওই বছরের ১ অক্টোবর বেগম মুজিব ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে আসেন। 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শেখ ফজিলাতুন্নেছার মতো ধীরস্থির, বুদ্ধিদীপ্ত, দূরদর্শী, নারীর সাহসী, বলিষ্ঠ, নির্লোভ ও নিষ্ঠাবান ইতিবাচক ভূমিকা শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হতে সহায়তা করেছে। তিনি জনগণের কল্যাণে জীবনব্যাপী দুঃখবরণ করেছেন এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার সদয় আচরণ ও বিনয়ে মুগ্ধ ছিলেন সকলে। সন্তানদের যেমনি ভালবেসেছেন তেমনি শাসনও করেছেন। পিতা-মাতা উভয়েরই কর্তব্য তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পালন করে গেছেন। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন কোমলে-কঠোরে মিশ্রিত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক সাহসী নারী। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদেরও সেই শিক্ষা দিয়েছিলেন। কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেয়া থেকে শুরু করে পরিবার-পরিজনদের যে কোনো সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কারাগারে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে সংগঠনের অবস্থা অবহিত করা এবং বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে এসে দলের নেতাকর্মীদের কাছে তা হুবহু পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও অসাধারণ স্মরণ শক্তির অধিকারী ছিলেন বেগম মুজিব। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী হিসেবে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও ছিলো প্রখর। নিজে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হলেও রাজনীতির সঠিক জ্ঞান তিনি ধারণ করতেন। 

জীবনের কথা লিখতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বারবার ‘রেণু’ প্রসঙ্গ টেনেছেন। অল্প বয়সে বিয়ে হলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি, সংসার-সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনে কখনো কার্পণ্য করেননি এই মহীয়সী নারী। বলা চলে শৈশব থেকে চির সংগ্রামী মুজিবকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আগলে রেখেছিলেন অপার মমতা ও ভালবাসা দিয়ে, সংগ্রামের জন্য অদম্য সাহস দিয়ে। বঙ্গমাতা সব সময়ই চাইতেন বঙ্গবন্ধু তার আপোষহীন দৃঢ়তায় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাবে। সংকটকালীন সময়ে তিনি পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কখনো পর্দার অন্তরালে থেকেই দৃঢ়, কৌশলী এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। বলা বাহুল্য নয়, তাকে পেয়ে বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন অকৃত্রিম বন্ধুর মতো একজন জীবন সঙ্গিনীকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “আমার ‘মা’ নিজের জন্য কখনো কিছু চাননি। অথচ সারাজীবন এই দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তিনি এ দেশকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। আব্বার সঙ্গে থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন- এদেশের মানুষ ভাল থাকবে, সুখে-শান্তিতে বাস করবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবার পাশে থেকে সে স্বপ্ন পূরণে তিনি সহায়তা করেছেন। মায়ের আত্মত্যাগ বাবাকে এগিয়ে নিয়েছে বলেই বঙ্গবন্ধু জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছেন।’ ফলে এটা সম্পষ্ট যে, বাঙালির জাতি যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তাতে বেগম মুজিবের অবদানও অবিস্মরণীয়। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় (একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৭ ডিসেম্বর) বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সন্তানদের সাথে গৃহবন্দী ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো মনোবল হারাননি। বঙ্গমাতা কতোটা দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিলেন তা স্পষ্ট হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া এক বক্তব্য থেকে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আম্মার যে মনোবল দেখেছি, তা ছিল কল্পনাতীত। স্বামীকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। দুই ছেলে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। তিন সন্তানসহ তিনি গৃহবন্দি। যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আম্মা মনোবল হারাননি।’  আর এ নির্মম ইতিহাস তো সকলেরই জানা যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে জাতির পিতার হত্যাকারীদের হাতে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

পরিশেষে এ কথা অসঙ্গত হয় না যে, শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। একজনকে আর একজনের কাছ থেকে কোনোভাবেই পৃথক করা যায় না। বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রামে এই মহিয়সী নারীর অবদান কোনো দিনও ভোলার মতো নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে যত বেশি গবেষণা হবে, বঙ্গমাতার অবদানও তত বেশি উদ্ভাসিত হবে। বঙ্গমাতার বিশালত্বের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হবে। সহধর্মিণী হিসেবে এবং বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম এক প্রেরণাদায়িনী মহীয়সী নারী হিসেবে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নাম ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র
১. অসমাপ্ত আত্মজীবনী
২. কারাগারের রোজনামচা
৩. উইকিপিডিয়া
৪. বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর