‘ভিস্তিওয়ালা’ চেয়েছিলেন বাদশাহ হুমায়ুনের মুকুট

ঢাকা, শনিবার   ২৫ জুন ২০২২,   ১১ আষাঢ় ১৪২৯,   ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

‘ভিস্তিওয়ালা’ চেয়েছিলেন বাদশাহ হুমায়ুনের মুকুট

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৪২ ২৩ জুন ২০২২  

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

কথিত আছে, মুঘল সম্রাট বাবরের ছেলে হুমায়ুন একবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এক খরস্রোতা নদীতে। জলের প্রচণ্ড স্রোতে যখন হুমায়ুনের প্রাণ ওষ্ঠাগত, এক ভিস্তিওয়ালা তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। হুমায়ুন তাকে কথা দিয়েছিলেন, যদি কখনো তিনি দিল্লির মসনদে বসতে পারেন, ওই ভিস্তিওয়ালা যা উপহার চাইবেন, তাই তাকে দেওয়া হবে। 

পরে হুমায়ুন সম্রাট হলেন, আর সেই ভিস্তিওয়ালা তার কাছে চেয়ে বসলেন সম্রাটের সিংহাসন। বাদশাহ হুমায়ুন নিজের মুকুট পরিয়ে দিলেন ভিস্তিওয়ালার মাথায়, তাকে বসালেন নিজের সিংহাসনে। তখন ভিস্তিওয়ালা সম্রাটকে আলিঙ্গন করে ফিরিয়ে দিলেন তার মুকুট আর সিংহাসন।

একটা সময় ছিল যখন শহরগুলোতেও পাইপলাইন দিয়ে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না। তখন ভিস্তিওয়ালাদের ওপরই নির্ভর করতে হতো শহরের মানুষকে। তখন ভিস্তিওয়ালাদের পেশাটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল পুরো বাংলায়। 

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতবষের্র বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় ‘ভিস্তিওয়ালাদের’ আনাগোনা ছিল। ঢাকাতেও তাদের বিচারণ ছিল (ঢাকায় ভিস্তিওয়ালাদের ‘সাক্কা’ বলা হতো)। তখন বাড়িতে পানি সরবরাহ ছিল না, পানির কলও কম ছিল। পশুর/ছাগলের চামড়ার ব্যাগই ছিল পানি সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম। সেই চামড়ার থলেকে বলা হতো ‘মশক’ বা ‘ভিস্তি’! মশক বা ভিস্তিতে পানি ভরে সেটা পিঠে বয়ে ফেরি করে পানি বিক্রি করা মানুষদের বলা হতো ‘ভিস্তিওয়ালা’। 

১৮৩০ সালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট হেনরি ওয়াল্টারস এক আদম- শুমারিতে ঢাকায় ১০টি ভিস্তি পল্লীর উল্লেখ করেছিলেন। যাতে বোঝা যায়,এই পেশা বেশ জমজমাট ছিল। ভারতের আজমির শরীফে এই ভিস্তিওয়ালাদের দেখা মেলে। সেখানে মাজার জিয়ারতের জন্য যাওয়া মানুষের অনেকে কিছুটা বিশ্বাস ও প্ররোচিত হয়ে ভিস্তিওয়ালাকে টাকা দিয়ে ভিস্তির পানি চৌবাচ্চায় ফেলে থাকে।

আগেকার দিনে যুদ্ধের সময় জল রাখতে ভিস্তিওয়ালার মশক ব্যবহার করা হতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে দুর্গগুলোতে জলের সরবরাহ করা হতো মশক থেকে। জলভর্তি মশক থাকত ঢাকার টমটম গাড়িতে। কলকাতার সঙ্গে ভিস্তিওয়ালাদের সম্পর্ক খুব পুরোনো। কাঁধে মশক নিয়ে ভোরবেলা থেকেই মহানগরীর পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন তারা। রান্না আর স্নানের কাজে লাগত তাদের সরবরাহ করা জল।

১৯৪০-৫০ সাল পর্যন্ত কলকাতার কয়েকটি রাস্তা ধোয়ার কাজেও ভিস্তিওয়ালাদের জল কাজে লাগত। কলকাতা আর ঢাকাতে ছিল আলাদা ভিস্তিপল্লি। এখন অবশ্য পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। করপোরেশনের জল মোটর পাম্পের সাহায্যে পৌঁছে যাচ্ছে কলকাতার বাড়িতে বাড়িতে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভিস্তিওয়ালাদেরও বেছে নিতে হচ্ছে অন্য পেশা। তবে এখনও কিছু ভিস্তিওয়ালা নিয়মিত জল সরবরাহ করেন মধ্য কলকাতার কয়েকটি গৃহস্থ বাড়ি আর দোকানে।

কলকাতার জনা চল্লিশেক ভিস্তিওয়ালা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন তাদের পারিবারিক পেশা। তাদের বেশিরভাগই আদতে বাস করেন বিহারের কাটিয়ারে। মধ্য কলকাতায় ঘর ভাড়া করে থাকেন তারা। প্রত্যেক ঘরে অন্তত দশজন করে মানিয়ে গুছিয়ে থেকে যান। ভিস্তিওয়ালাদের থেকে এখনও পানি কিনে খান কিছু লোক। হোটেলেও যায় এদের পানি। তবে সেই আগের মতো আর নদীর পানি বহন করে না তারা। দিনভর তারা পৌরসভার ট্যাপ কল বা টিউবওয়েল থেকে পানি মশকে ভরে। ঝড়-বৃষ্টি-রোদ উপেক্ষা করে পানি পৌঁছে দেন মানুষের প্রয়োজনে। একটি মশকে পানি ধরে ৩০ লিটারের কাছাকাছি। কলকাতার রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড, বৃন্দাবন দাস লেন, মারকুইস স্ট্রিট, ইলিয়ট রোড, মার্কুইস স্ট্রিটের বাড়ি এবং দোকান মিলিয়ে একেকজন ভিস্তিওয়ালা দিনে দুইবেলা মোটামুটি ৩০টি বাড়িতে জল পৌঁছে দেন। এজন্য প্রতি মাসে ৪০০ টাকার মতো খরচ হয় একেকটি পরিবারে।

সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে, আর হারিয়ে যাচ্ছে কিছু ‘পেশা’, বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে এবং দৈনন্দিন জীবনে চাহিদার ভিন্নতার প্রেক্ষিতে ‘পেশা’ বদলের হারও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তেমন একটি হারিয়ে যাওয়া পেশা ‘ভিস্তিওয়ালা’। কালের বিবর্তনে এই পেশাটি আজ বিলুপ্ত প্রায়। তবে আজও কলকাতার জনা চল্লিশেক ভিস্তিওয়ালা বাঁচিয়ে রেখেছেন এই পেশা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »