ইউএনওর হস্তক্ষেপে ঘরে উঠলেন ‘মা’

ঢাকা, রোববার   ২৬ জুন ২০২২,   ১২ আষাঢ় ১৪২৯,   ২৭ জ্বিলকদ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

দুই কোটি টাকার জমি লিখে নিয়ে মাকে মলমূত্রের মধ্যে ফেলে দেয় বজলু ও ফজলু 

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৫৩ ২৩ জুন ২০২২  

আছিরন বেগমকে দেখতে যান ইউএনও ইরুফা সুলতানা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আছিরন বেগমকে দেখতে যান ইউএনও ইরুফা সুলতানা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শতবর্ষী বৃদ্ধা মায়ের নামে রয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের ৮ বিঘা জমি। সেই জমি সহোদর সেজো ভাই ও হারিয়ে যাওয়া ছোট ভাই এবং দুই বোনকে ফাঁকি দিয়ে বড় দুই ভাই ফজলুর রহমান ও বজলুর রহমান লিখে নিতে চান। 

সেই মোতাবেক বড় ভাইয়ের ছেলে জাকির হোসেন তার ছোট চাচা জামির হোসেনের বাড়ি থেকে দাদিকে নিয়ে আসেন নিজেদের বাড়িতে। তার কাছ থেকে স্বাক্ষর করে মেঝো ছেলে বজলুর রহমানের নামে পাওয়ার অব এটর্নি করে নেন মায়ের নামে থাকা ৮ বিঘা জমির। 

যে জমির প্রতি শতকের মূল্য স্থানীয়দের মতে ৭০ হাজার টাকা। ৮ বিঘা অর্থাৎ ২৬৪ শতাংশ জমির বাজার মূল্য এক কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। জমির পাওয়ার অব এটর্নি করেই ছাড়েনি বজলু ও ফজলু। জমির লিখে নেয়ার প্রক্রিয়া শেষ করে মাকে তারা ফেলে রাখেন একটি জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায়। 

সেখানে বৃদ্ধা মা আছিরন বেগম মলমূত্র ত্যাগ করে একটি ছেড়া কম্বলের মধ্যেই পড়ে থাকেন খেয়ে না খেয়ে। গোসল করানো বা পরিষ্কারও কেউ করে না। বাড়ির পাশের কেউ যদি কখনো পরিষ্কার করিয়ে দেয় তো সেটাই সই।

খবর পেয়ে চৌগাছার ইউএনও ইরুফা সুলতানা বুধবার দুপুরে যান উপজেলার হাকিমপুর ইউপির তজবীজপুর গ্রামে। সেখানে গেলে দেখা যায় মা আছিরন বেগম একটি মলমূত্রে পরিপূর্ণ একটি ছেড়া কম্বলে জড়িয়ে প্রায় নগ্ন অবস্থায় বসে রয়েছেন। অথচ তিন ছেলেরই রয়েছে ফ্ল্যাট বাড়ি। 

মেঝো ছেলে বজলুর ফ্ল্যাট বাড়ির চার কক্ষের দুটিই থাকে ফাঁকা। একটিতে তিনি এবং একটিতে তার ছেলের স্ত্রী থাকেন। ছেলে চাকরির সুবাদে খুলনায় থাকেন। বৃদ্ধার বড় ছেলের তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে প্রবাসে থাকেন। অন্য ছেলে জাকির হোসেন বাড়িতে থাকেন। তাদেরও ফ্ল্যাট বাড়ি। অন্য একটি ফ্ল্যাট বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। সেজো ছেলে জামিরেরও ফ্ল্যাট বাড়ি।

ইউএনও ইরুফা সুলতানা ওই মায়ের জন্য কয়েক রকমের ফল কিনে নিয়ে যান। সেখানে ওই মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন তিনি। মায়ের শরীর এবং কম্বল থেকে গন্ধ বের হওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দেন সেগুলো পরিবর্তন করে দিতে। তবে ইউএনওর সামনেও মিথ্যা বলতে থাকেন বৃদ্ধার ছেলে বজলুর রহমান। 

তিনি বলেন, আমরা দুইভাই (ফজলু ও বজলু) মাকে সব সময় দেখে রাখি। তাহলে মায়ের এই অবস্থা কেন? কম্বলে মলমূত্র কেন? ইউএনও এই প্রশ্ন করলে আর কোনো জবাব দিতে পারেননি বজলুর রহমান। 

এ সময় মায়ের সেজো ছেলে জামির হোসেনের দুই মেয়ে ও স্ত্রী এসে বলেন বজলু ও ফজলু মায়ের জমি থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করতে তাদের বাড়ি থেকে বৃদ্ধা আছিরনকে নিয়ে এসেছেন। তারা বাধা দেয়ায় তাদেরকে মারপিটও করেছে চাচা বজলু ও চাচাতো ভাই জাকির। তবে তাদের আরেক চাচা রয়েছে এ বিষয়টি তারাও এড়িয়ে যান। তারা দাবি করেন তাদের মারপিট করায় তারা এ বিষয়ে থানায় জিডিও করেছিলেন।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, সম্পূর্ণ মিথ্যা বলছেন বজলু। বজলুরা চারভাই, দুই বোন। তাদের সবার ছোটভাই রমজান হোসেন প্রায় ৩০ বছর আগে হারিয়ে যায়। তারও দুটি মেয়ে রয়েছে। তাদের বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের সঙ্গে তারা কোটচাঁদপুরে মামা বাড়িতে থাকতো। তাদের দুই বোনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। ওই ছোট ভাই রমজানের জমিও বড়ভাই ফজলুর রহমান নিজের নামে করে নিয়েছেন। 

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, শুধুমাত্র জমি লিখে নেয়ার জন্যই তারা ব্যস্ত। বৃদ্ধা মার সেবা যত্ন, খাওয়া-পরা নিয়ে কোনো ছেলের কোনো ভাবনা নেই। স্থানীয়দের কথার সত্যতা মেলে ইউএনওর উপস্থিতিতে বৃদ্ধার ছেলে-মেয়েদের (বৃদ্ধার নাতি) ঝগড়াঝাটিতে। বজলু ও ফজলু দুই ভাইয়ের স্ত্রী মারা যাওয়ায় তাদের মেয়েরা সেজো ভাই জামিরের স্ত্রী ও দুই মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করেন। 

শেষে ইউএনও ইরুফা সুলতানা আইনের ব্যাখা করে বৃদ্ধার মেঝো ছেলে বজলু এবং বড় ছেলে ফজলুর ছেলে জাকিরকে নির্দেশ দেন বৃদ্ধার জমি বৃদ্ধার নামে ফেরত দিয়ে কাগজপত্র তাকে দেখাতে হবে। আর তিন ছেলে প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে একমাস করে মায়ের দেখভাল করবেন। এর ব্যতয় হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তখন মেঝো ছেলে বজলু কথা দেন অন্য কোনো ভাই না দেখলেও তিনি বাকি জীবন মায়ের দেখভাল করবেন এবং বৃহস্পতিবারই মায়ের নামের জমি মায়ের নামে ফেরত দিয়ে কাগজপত্র ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে দেখিয়ে আসবেন। সর্বশেষ ছেলে বজলু ও নাতি জাকির কোলে করে বৃদ্ধাকে ছেলে বজলুর ঘরে নিয়ে একটি পরিষ্কার বিছানায় শুইয়ে দেন।

ইউএনও ইরুফা সুলতানা বলেন, ওই বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধা মাকে তার ছেলের ঘরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদেরকে ঠিকমতো তার দেখভাল করা এবং জমি নিজের নামে ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর অন্যথা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে

English HighlightsREAD MORE »