যমুনার চরে ভাসমান জীবন

ঢাকা, শনিবার   ২৫ জুন ২০২২,   ১১ আষাঢ় ১৪২৯,   ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

যমুনার চরে ভাসমান জীবন

বগুড়া প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫১ ২২ জুন ২০২২   আপডেট: ১৮:০৫ ২২ জুন ২০২২

যমুনার চরে কাটছে তাদের ভাসমান জীবন। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

যমুনার চরে কাটছে তাদের ভাসমান জীবন। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঘরে  হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি। অনেকেই নৌকায় গুছিয়ে নিয়েছেন সংসার। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধের ওপর। সেখানে ত্রিপল দিয়ে ঘর তৈরি করে মাথা গোজার ঠাঁই করেছেন। তাদের কারো কারো ঘরে নেই খাবার। এমনকি শুকনো খাবারও শেষ। সংকট রয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেটের। চোখে দুঃস্বপ্ন নিয়ে যমুনার চরে কাটছে তাদের ভাসমান জীবন।

এমন চিত্র বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার বানবাসী মানুষদের। যমুনার চরাঞ্চলের মানুষেরা হয়ে পড়েছেন পানিবন্দি। একই সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বগুড়ার সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার বাসিন্দারা। এই তিন উপজেলার ৭৭ হাজার ৮৪৮ মানুষ পানিবন্দি জীবন-যাপন করছেন। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। বন্ধ আছে ৬৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান।

সারিয়াকান্দিতে যমুনা চরাঞ্চলের কাজলা, চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর ও সদরসহ কুতুবপুর ইউপির আংশিক, চন্দনবাইশা, কর্ণিবাড়ী, বোহাইল ও কামালপুর ইউপির নিচু এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এসব ইউপির ৭৭টি গ্রামে ৫৬ হাজার ৭২০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট ৪৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ আছে। 

যমুনার চরে কাটছে তাদের ভাসমান জীবন।

এছাড়াও উপজেলার মানিকদাইড় চরে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। সেখানে নদী ভাঙনের ফলে গত সাতদিনে দেড় শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তারা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। একই সঙ্গে বিস্তৃত চরাঞ্চলে বন্যায় তলিয়ে গেছে ফসিল জমি। ঘরের ছোটখাটো বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাসছে যমুনায়।

সারিয়াকান্দি সদর ইউপির চরবাটিয়ার মোখলেছুর রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন ও শহিদুল ইসলামসহ অন্তত ১০ জন পানিবন্দি মানুষের সঙ্গে কথা হয়।

তারা জানান, পানিবন্দি অবস্থায় ভাসমান জীবন-যাপন করছেন তারা। তাদের মধ্যে অনেকে বাঁধের ওপর, বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ত্রিপল দিয়ে ঘর (তাবু) বানিয়ে যারা বসবাস করছেন, তাদের অধিকাংশের ঘরে নেই চাল-ডাল। এমনকি শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে। পানিবন্দি অবস্থায় তারা সবাই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

সোনাতলা উপজেলায় তেকানী চুকাইনগর, পাকুল্লা ও মধুপুর ইউপির ২৫ গ্রামে যমুনার পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন ২০ হাজার ১২৮ জন মানুষ। এ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ এখন পর্যন্ত ১৭ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় বন্ধ রয়েছে পাঠদান।

ধুনট উপজেলায় আট গ্রামের ১ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। যমুনার পানি প্রবেশ করা আট গ্রাম হলো- যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের শিমুলবাড়ি, সহড়াবাড়ি, আটরচর, ভুতবাড়ি, পুখুরিয়া, রঘুনাথপুর, ভান্ডাবাড়ি ও কচুগাড়ি গ্রাম। তাদের মধ্যে শতাধিক মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন।

বুধবার বিকেলে ৩ টার দিকের পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢলে ও ভারি বর্ষণে বগুড়ায় যমুনার পানি বেড়ে বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে বাঙালি নদীর পানি। বাঙালির পানি বিপদসীমার ৫ সেমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও করতোয়া নদীর পানি বাড়লেও এখন পর্যন্ত বিপদসীমা অতিক্রম করেনি।

যমুনা নদীর বিপদসীমা ধরা হয় ১৬ দশমিক ৭০ মিটার। আর বাঙালি নদীর বিপ;সীমা নির্ধারণ করা হয় ১৫ দশমিক ৮৫ মিটার। এই দুই নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে করতোয়া নদীর পানি। তবে করতোয়ার পানি বিপদসামী পার হয়নি। এ নদীর পানি বিপদসীমা ধরা হয় ১৬ দশমিক ৩২ মিটার। বর্তমানে করতোয়ার পানি ১৪ দশমিক ১২ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে।

চলতি জুন মাসের শুরু থেকে যমুনার পানি বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে গত ১৭ জুন সন্ধ্যা থেকে যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে।

বগুড়ার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. এনামুল হক ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘বন্যার পানিতে বগুড়ার তিন উপজেলায় ৩ হাজার ৪৬৫ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে সারিয়াকান্দিতে ২ হাজার ৭৮৯ হেক্টর, ধুনটে ৩৩ হেক্টর ও সোনাতলায় ৬৪৩ হেক্টর ফসলি জমি রয়েছে। বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ফসলের মধ্যে রয়েছে ধান ও ধানের বীজতলা, পাট, শাক-সবজি, ভুট্টা ও আখের আবাদী জমি।’

জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা মো. গোলাম কিবরিয়া জানান, বন্যার্তদের জন্য জেলায় ৭০টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। একই সঙ্গে দুটি রেসকিউ (উদ্ধার) বোট রাখা হয়েছে। এছাড়াও আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলো বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে সাতটি টিউবওয়েল বসানো হয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে

English HighlightsREAD MORE »