‘স্যার আমার নামটা লেখউক্কা’

ঢাকা, রোববার   ২৬ জুন ২০২২,   ১২ আষাঢ় ১৪২৯,   ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

‘স্যার আমার নামটা লেখউক্কা’

আহমেদ জামিল, সিলেট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫২ ২২ জুন ২০২২  

সিলেটের গোয়াইনঘাটে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন ডেইলি বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদক, তাকে দেখেই ছুটে আসে বন্যা দুর্গতরা- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সিলেটের গোয়াইনঘাটে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন ডেইলি বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদক, তাকে দেখেই ছুটে আসে বন্যা দুর্গতরা- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

স্যার আমার নামটা লেখউক্কা (লেখেন)। আমার কিচ্ছু রইছে না। সবতা ভাসাইয়া নিছে গিয়া। ঘরের টিন থাকি শুরু করি হকলতা ভাসিয়া গেছে গিয়া। আমি এখন গিয়া কার দুয়ারে উঠমু। আমারে আপনারা দয়া না করলে আমি মশকিল (মুশকিল)।

ডেইলি বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদককে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধি নাজমা বেগম। ভয়াবহ বন্যায় ঘর-বাড়ি হারিয়ে এখন নিঃস্ব তিনি। সব হারিয়ে জায়গা পেয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রে।

নাজমা সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার মিত্রিমহল উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। আশ্রয়কেন্দ্রে মাথা গোজার ঠাঁই মিললেও শঙ্কা কাটছে না তার। পানি কমলে কোথায় গিয়ে ওঠবেন সে চিন্তায় এখনই ভর করেছে তাকে।

শুধু প্রতিবন্ধী নাজমা বেগম নয়। ঘর দুয়ার হারিয়ে অসংখ্য নাজমাদের চিন্তা এখন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঘরবাড়ি নিয়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে বেঁচে থাকার মত সুবিধা পেলেও ঘরে ফেরা নিয়ে শঙ্কা তাদের। আর এজন্যই আশ্রয়কেন্দ্রে বাইরের (বন্যার্ত ছাড়া) কাউকে দেখলেই সরকারি কর্মকর্তা ভেবে ছুটে আসে সবাই। সরকার থেকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে ভেবে নাম তালিকাভুক্ত করতে হুলস্থুল শুরু করে তারা।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার মিত্রিমহল এলাকার বশির কমিউনিটি সেন্টার ওই এলাকার বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে আশ্রয় নেয়া কমলা বেগম বলেন, স্বামীহারা সংসারে ছোট ছোট পাঁচজন সন্তান নিয়ে কোনোমতে জীবনযাপন করতাম। গত মাসে প্রথম দফা বন্যায় ঘর ডুবে যায়। বিভিন্ন জনের কাছে থেকে সহযোগিতা নিয়ে ঘর ঠিক করেছি। কিন্তু এখন বন্যায় ঘরের চাল থেকে শুরু করে সব নিয়ে গেছে। মাথা গোঁজার আর জায়গা নেই। আর কে আমাকে সহযোগিতা করবে। আমাদের এলাকার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। 

ঐ আশ্রয়কেন্দ্রের আরেক বৃদ্ধা সাহিদা বেগম বলেন, আমি ভিক্ষা করে খাই। ভিটে বলতে যেটা ছিল সেটাও পানিতে গলে গেছে। আর কিছু বাকি নাই। এখানে (আশ্রয়কেন্দ্র) আর কতদিন থাকবো। পানি কমলে তো বাড়িতে যেতে হবে। কিন্তু ঘরবাড়ি সব বানের পানিতে ভেসে গেছে। আমি যাব কোথায়।

মিত্রিমহল থেকে আরো ৪/৫ কিলোমিটার সামনে গেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার গৌরীনগর গ্রাম। এই এলাকার চিত্র পুরো ভিন্ন। পানির নিচে বিস্তীর্ণ এলাকা। কেবল ভেসে আছে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়ক। সেই সড়কেই অবস্থান করেছেন শত শত মানুষ। সড়কের পাশেই কেউ করে নিয়েছেন থাকার জায়গা। আবার কেউ সড়কে ট্রাকের মধ্যেপরিবার পরিবজন নিয়ে বসবাস করছেন। তবে বেশিরভাগ মানুষ ত্রাণের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ আবার নিরবে খুঁজছেন সরকারি কর্মকর্তাদের। বন্যা পরবর্তী সরকারি তারিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভূক্ত করার জন্য।

গৌরী নগর গ্রামের জিয়া উদ্দিন বলেন, সকাল থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। ত্রাণ পেয়েছি। কিন্তু বাড়ি ফিরে যাচ্ছি না। শুনেছি যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাদের সরকার ঘরবাড়ি বানিয়ে দেবে। তাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে খুঁজছি কোনো সরকারি কর্মকর্তার দেখা মিলে কিনা।

জিয়া উদ্দিন বলেন, ৬দিন ধরে পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছি। আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হলেও বুক সমান পানি। বাড়ি থেকে পানি নামতে আরো দুই তিনদিন লাগতে পারে। কিন্তু ঘরবাড়ি একেবারে শেষ। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কোথায় উঠবো তা জানি না। সরকারিভাবে আমাদের সহযোগিতা করলে মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। না হলে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অন্য কারো বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে।

একই অবস্থা সিলেটের জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও সদর উপজেলার হাজার পরিবারের মধ্যে। পানিতে গলে গেছে কাচা ঘরবাড়ি। ফলে বন্যা পরবর্তী দুর্ভোগ নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটছে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষজনের।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, বন্যার্তদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বন্যার পানি নামার পর ২১ দিনের মধ্যে একটি তালিকা প্রস্তত করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হবে। সেখান থেকে সহযোগিতা করা হলে তাদের পুনর্বাসিত করা হবে। আপাতত আমরা মানুষকে ত্রাণ দিয়ে সহযোগিতা করছি। আগে মানুষ বাঁচুক। তারপর ঘরবাড়ির বিষয়টি দেখা যাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর

English HighlightsREAD MORE »