গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে পুলিশ সদস্যদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

ঢাকা, সোমবার   ২৩ মে ২০২২,   ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে পুলিশ সদস্যদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:২৬ ২৩ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৯:৪৮ ২৪ জানুয়ারি ২০২২

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ‘পুলিশ সপ্তাহ ২০২২’- এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন- পিআইডি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ‘পুলিশ সপ্তাহ ২০২২’- এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন- পিআইডি

দেশের আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি স্বাধীনতা রক্ষা এবং গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে কাজ করার জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনে রাখবেন জাতির পিতার দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, যা আমাদের এই স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আপনাদের পূর্বসূরিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা সব আঘাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

রোববার সকালে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২২’ উদ্বোধনের সময় দেওয়া প্রধান অতিথির ভাষণে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যদের প্রতি এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সপ্তাহ উদযাপন অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বিশ্বাস জনবান্ধব পুলিশিংয়ের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় ও গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে প্রত্যেক পুলিশ সদস্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। সর্বোপরি পুলিশ সপ্তাহ উদযাপন অনুষ্ঠান বাংলাদেশ পুলিশকে শান্তির সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে নব উদ্যমে কাজ করতে প্রেরণা জোগাবে, এটাই আমার প্রত্যাশা।

প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার ভাষণের উদ্ধৃতি তুলে ধরে পূর্বসূরিদের ঐতিহ্য ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্যও পুলিশ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।

১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগে প্রথম পুলিশ সপ্তাহ উদযাপন অনুষ্ঠানের ভাষণে জাতির পিতা বলেছিলেন, এই রাজারবাগে যারা শহিদ হয়েছিলেন তাদের কথা মনে রাখতে হবে। তারা আপনাদেরই ভাই, তাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়।

বিএনপির ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা অগ্নিসন্ত্রাস, বৃক্ষ কর্তন, রাস্তা কেটে ফেলা- ইত্যাদি নানা ধরনের কাজ তারা করেছে। এমনকি পুলিশের ওপর আক্রমণ করে যেভাবে পুলিশের সদস্যদের তারা নির্মমভাবে মেরেছে সেটা সত্যিই ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। এই ধরনের ঘৃণ্য কাজ করে তারা দেশে একটা অশান্ত পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিল। কত মানুষকে তারা হত্যা করেছে তার কোনো সীমা নেই। সে সময়গুলোতে সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্যে তিনি পুলিশ সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, সেই সময় পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে মানুষের জীবনে শান্তি নিরাপত্তা নিয়ে এসেছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তারা কাজ করেছেন। এ জন্য সবাইকে তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ পরিবেশন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে একটি খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে কৃতি পুলিশ সদস্যদের মাঝে পুলিশ পদকও বিতরণ করেন তিনি।

পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে ২০২০ সালে ১১৫ এবং ২০২১ সালে ১১৫ জনসহ মোট ২৩০ পুলিশ সদস্যকে পদক প্রদান করা হয়। ৯ জনকে মরণোত্তর পদক প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে র‌্যাবের মহাপরিচালক ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রয়েছেন। পদকের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম), বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা, রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)।

পদক প্রাপ্তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্যরাও ভালো কাজ করে যাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিন গুলিতে আহত হয়েছিলেন আমার ফুফু এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সাহেবের ছেলে, স্ত্রীসহ আমার ফুফাতো ভাই ও বোনেরা। যখন খুনিরা আক্রমণ করে চলে যায় তখন রমনা থানা থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়িতে গিয়ে আহত-নিহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান। শুধুমাত্র পুলিশের এই সাহসী ভূমিকায় আমার ফুফু বেঁচে যান। তিনি পঙ্গু অবস্থায় বাকি জীবন কাটান। আমার দুই ফুফাতো বোন এবং ভাইও বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হামলায় বাধা দিতে গিয়ে গুলিতে নিহত পুলিশের বিশেষ শাখার এএসপি সিদ্দিকুর রহমানকে তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতাকে হত্যার পর ছয় বছর আমি ও ছোট বোন শেখ রেহানাকে রিফিউজি জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছি। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি নির্বাচন করার পর দেশে ফিরি।

শেখ হাসিনা বলেন, তখন জাতির পিতার খুনিরা ক্ষমতায়, তথাপি দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সংকল্প নিয়ে একরকম জোর করেই দেশে ফিরে আসি।

এরপর ১৯৯৬ সালের প্রথম মেয়াদেই তার সরকার ৫ কোটি টাকা সিড মানি প্রদান করে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে। বিভিন্ন স্থানে থানা, তদন্ত কেন্দ্র, হাইওয়ে ফাঁড়ি, পুলিশ ক্যাম্প এবং পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ করে। পাশাপাশি ৮০৩ জন এসআই, ৫০৭ জন সার্জেন্ট এবং ১৪ হাজার ৬৮০ জন কনস্টেবল নিয়োগ করে ও আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে কমিউনিটি পুলিশ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে গত ১৩ বছরে পুলিশের উন্নয়নে নানাবিধ কর্মকাণ্ড গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে মোট ৮২ হাজার ৫৮৩টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পুলিশের নতুন ইউনিট যেমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল-টুরিস্ট-নৌ পুলিশ, ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, এন্টি টেরোরিজম ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, রংপুর ও ময়মনসিংহে রেঞ্জ, রংপুর এবং গাজীপুরে মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট, রংপুরে আরআরএফ এবং সিআইডি’তে সাইবার পুলিশ সেন্টার গঠন করা হয়েছে। ২টি সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, এয়ারপোর্টে একটি ও কক্সবাজারে ২টি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং র‌্যাবের জন্য ৩টি ব্যাটালিয়ন, ৩০টি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, ৬২টি থানা, ৯৫টি তদন্ত কেন্দ্র এবং ১টি ফাঁড়ি ও জাতীয় জরুরি সেবায় ৯৯৯ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। জরাজীর্ণ থানাগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা আইজিপির র‌্যাঙ্ক ব্যাজ পুনঃপ্রবর্তন করেছি। গ্রেড-১ এর ২টি, গ্রেড-২ এর ১১টি, ডিআইজি এর ৫২টি, অতিরিক্ত ডিআইজির ১৫৯টি, পুলিশ সুপারের ৪০২টি এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের ৮০০টি পদ সৃষ্টি করেছি। ২১৫টি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদকে পুলিশ সুপার (এসপি) পদে, ২৫৩টি সিনিয়র এএসপি পদকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে, এসআই/সার্জেন্ট পদকে ৩য় শ্রেণি হতে ২য় শ্রেণিতে এবং ইন্সপেক্টর পদকে ২য় শ্রেণি হতে ১ম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে উন্নীত করেছি। সংশোধিত নিয়োগ বিধিমালার আলোকে স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্প্রতি ৩ হাজারের অধিক কনস্টেবল নিয়োগ করেছি। আকাশ পথে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে দুইটি হেলিকপ্টার ক্রয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

অপরাধ তদন্তে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২২টি নতুন ব্যারাক, ১০টি একাডেমিক ভবন, বিভিন্ন ইউনিটের জন্য ১০৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ, ৬০টি প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণ, রাজস্ব বাজেট থেকে ২৭টি থানা নির্মাণ, ২৮টি ফাঁড়ি, ১৫টি তদন্ত কেন্দ্র, ৩৩৭টি থানার হেল্প ডেস্ক, ৪৫টি হাইওয়ে আউটপোস্ট ভবন সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২১১টি আধুনিক থানা ভবন নির্মাণ, ৯৫টি থানাকে মডেল থানায় উন্নীতকরণ, ২১টি ব্যারাক ভবন ও ৬০টি তদন্ত কেন্দ্র নির্মাণের তথ্যও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, এখন পুলিশ বাহিনী প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন বাহিনীতে উন্নীত হয়েছে। সব র‌্যাঙ্কের পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন যুগোপযোগী ট্রেনিং মডিউল প্রণয়ন, ট্রেনিং মডিউলের মধ্যে মানবাধিকার সংরক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বৈদেশিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রও বৃদ্ধি করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ চালু করার ফলে আজকে পুলিশ বাহিনী দ্রুত সেবায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছে। যে করণে আজকে মানুষের মধ্যে একটা আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের আর্তমানবতার সেবায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রশংসা করেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে পুলিশ বাহিনীর অংশগ্রহণ বিশেষ করে নারী সদস্যদের দায়িত্ব পালনেরও প্রশংসা করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব মন্দার পর এসেছে করোনা। এত সব প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে প্রায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে। ব্যাপকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক করে দিয়ে দায়িত্ব পালনে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করে দিচ্ছে সরকার।

দেশের এ অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার আশা ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই তার সরকারের লক্ষ্য।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে/এইচএন

English HighlightsREAD MORE »