সদরঘাটের লালকুঠিতে রবীন্দ্রনাথের দিনগুলো

ঢাকা, সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

সদরঘাটের লালকুঠিতে রবীন্দ্রনাথের দিনগুলো

আহসান জোবায়ের ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১২ ২২ নভেম্বর ২০২০  

নর্থব্রুক হলের পুরনো নাম লালকুঠি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নর্থব্রুক হলের পুরনো নাম লালকুঠি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা নর্থব্রুক হলের পুরনো নাম লালকুঠি। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এবং সংস্কৃতি চর্চার বিশাল কেন্দ্র ছিল শতবর্ষী লালকুঠি। রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পাশেই ফরাশগঞ্জ বাজারের মুখেই এ কুঠির অবস্থান। হালের এ নর্থব্রুক হল বা লালকুঠি নিয়ে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইতিহাসের খেরোখাতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় আসার পর কারো বাসায় না উঠে বুড়িগঙ্গা নদীতে রাখা নৌযানে অবস্থান নেন। রমনা সবুজ চত্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বাংলো থাকার পরও কবিগুরু কেন নদীর মধ্যকার নির্জন পরিবেশকে বেছে নিয়েছিলেন এমন প্রশ্ন আজকাল অনেকেই করে থাকেন। এ বিষয়ে অসংখ্য গবেষক নানা মত দিয়েছেন। তবে অধিকাংশের মতে, মূলত ঢাকাবাসীর দলাদলির হাত থেকে রক্ষা পেতে রবীন্দ্রনাথ নিজে থেকেই বুড়িগঙ্গার নৌযান বেছে নেন। নৌযানে অবস্থানকালীন সময়ে লালকুঠিতেই বেশিরভাগ সময় কাটাতেন তিনি।

গোপালচন্দ্র রায়ের ‘ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালের ৭ জানুয়ারি কলকাতা থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে স্টিমারযোগে নারায়ণগঞ্জ এবং মোটর শোভাযাত্রা করে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় তার সফরসূচি ছিল ৯ দিনের। রবীন্দ্রনাথকে ঢাকায় আনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের বিশেষ অবদান ছিল।

তাই তিনি চেয়েছিলেন, কবিগুরু তার বাসায়ই অবস্থান করবেন। কিন্তু ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিকরা তা মেনে নিতে চাননি। তাদের মতে, রবীন্দ্রনাথ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেহমান নন, সারা ঢাকাবাসীর মেহমান। রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীর ওয়াইজ ঘাটে বাঁধা ঢাকার নবাবদের রাজকীয় জলযান তুরাগ হাউস বোটে গিয়ে ওঠেন।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তার ‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থে স্মৃতিচারণায় বলেন, রবীন্দ্রনাথকে আমি প্রথম দেখেছিলাম বুড়িগঙ্গার ওপর নোঙর ফেলা একটি স্টিমলঞ্চে। সেখানে নিমন্ত্রণকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রেষারেষি করে ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিকেরা তার বসবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। উপরের ডেকে ইজি চেয়ারে বসে আছেন তিনি। ঠিক তার ফটোগ্রাফগুলোর মতোই জোব্বা-পাজামা পরনে। আর কেউ কেউ উপস্থিত। রেলিং-এ হেলান দিয়ে আমি দূরে দাঁড়িয়ে আছি।

সেকালের নর্থব্রুক হল। ছবি: সংগৃহীত

১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় লেখা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের রমনার বাসায় রবীন্দ্রনাথকে অতিথিরূপে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ঢাকার নাগরিক এবং বিশ্বভারতীর সদস্যরা শহরের ভেতরে রাখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। তা নিয়ে রবীন্দ্র অভ্যর্থনা সমিতির সদস্যদের মধ্যে খুবই বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। শেষে স্থির হয়, রবীন্দ্রনাথের অভিরুচি অনুযায়ীই তার থাকার ব্যবস্থা করা হবে। পরবর্তীতে তার ইচ্ছানুযায়ী বুড়িগঙ্গায় ভাসমান তুরাগ হাউস বোটেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, কবিগুরুর আগমন উপলক্ষে বুড়িগঙ্গার তীর ও তুরাগ হাউস বোটকে সুসজ্জিত করা হয়। তিনি ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে বুড়িগঙ্গায় ভাসমান জলযানটিতে এসে ওঠেন। এখানে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে তিনি বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী নর্থব্রুক হলে (লালকুঠি) উপস্থিত হন। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি, জজ-ব্যারিস্টার, ডেপুটি-মুন্সেফ, উকিল-মোক্তার, জমিদার-তালুকদার, অধ্যাপক-শিক্ষক সেখানে উপস্থিত হয়ে এক জাঁকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা জানান।

রবীন্দ্রগবেষক আহমেদ রফিক তার ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ’ বইতে ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের এই নাগরিক সংবর্ধনার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘সেদিন শহুরে মানুষে কুঠির হলঘর পরিপূর্ণ ছিল।’

১৮৭২ সালের নির্মিত এ ভবনটি একসময়ে ঢাকার অভিজাত এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আড্ডাস্থল এবং নাট্যচর্চার বিশাল কেন্দ্র ছিল। ১৫০ বছর ধরে ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত শ্রেণির পদচারণায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাল রঙের ইমারত বিশিষ্ট এই ভবনটি।

১৮৮০ সালে এর সম্পুর্ন নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের গভর্নর জর্জ ব্যরিং নর্থব্রুক এ ভবন উদ্বোধন করেন। তার নাম অনুসারে পরে নর্থব্রুক হল নামকরণ করা হয়। আরো নামকরণ করা হয় বহুল ব্যবহৃত বাংলাবাজার রোড সংলগ্ন নর্থব্রুক হল রোডের। লালরঙ্গে রাঙ্গানো এই ভবনটিকে পরবর্তীতে নর্থব্রুক হলের পাশাপাশি  লালকুঠি নামে ডাকা শুরু করা হয়।

লালকুঠির চিরচেনা সেই জৌলুশ এখন নেই। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

১৮৮২ সালে এসে ভবনটি পাঠাগারে রূপান্তর করা হয় এবং এর সঙ্গে জনসন হল নামে একটি ক্লাবঘর সংযুক্ত করা হয়। সেই জনসন হল এখনো পাঠাগার হিসেবে লালকুঠিতে রয়েছে। তবে সেখানে জ্ঞানপিপাসুদের পদচারণ নেই বললেই চলে। এমনকি সাহিত্যিকদের আড্ডাও এখন চোখে পড়ে না।

ঐতিহ্যবাহী এ ভবনে সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি তৎকালীন রাজকর্মচারীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিদেশি মেহমানদের আড্ডাখানা হিসেবে ব্যবহার হতো। নাট্যচর্চার জন্য বেশ জনপ্রিয় ছিল লালকুঠির টাউন হল বিখ্যাত বর্ষিয়ান অভিনেতা প্রবির মিত্র যার নাট্যচর্চার হাতেখড়ি এই লালকুঠিতে।

শুধু তাই নয় ঢাকার নতুন রাজস্ব ও ডাক অফিস খোলার জন্য ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা মোহাম্মদ ইউসুফের উদ্যোগে নর্থব্রুক হলে একটি বড় সভা করা হয়। এই সভায় শহরের গণ্যমান্য মুসলমান ও ইউরোপিয়নরা অতিথি হিসেবে আসে। এছাড়াও সভায় ঢাকাকে রাজধানী করার জন্য ব্রিটিশদের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

এরপর লালকুঠি তার ঐতিহ্য হারাতে থাকে, হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা সেই জৌলুশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে লালকুঠির জনসন হল ও পাঠাগারের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর প্রয়োজনীয় পরিচর্যার না নেয়ার কারণে লালকুঠি ধীরে ধীরে তার সৌন্দর্য হারাতে থাকে।

বর্তমানে লালকুঠির ভিতরে এক পাশে সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়, অপর পাশে রয়েছে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব ও ডায়াবেটিক সমিতির কার্যালয়। যা প্রত্নসম্পদ হিসেবেও আজ অবহেলিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে