যানজটহীন এক পরিপাটি শহরের স্বপ্ন দেখছে রাজধানীবাসী

ঢাকা, সোমবার   ২৩ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১০ ১৪২৭,   ০৬ রবিউস সানি ১৪৪২

দৃশ্যমান হচ্ছে মেট্রোরেল

যানজটহীন এক পরিপাটি শহরের স্বপ্ন দেখছে রাজধানীবাসী

সাইফুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৬ ২১ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:১২ ২১ নভেম্বর ২০২০

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

একটা সময় যে মেট্রোরেল ছিল কল্পনারও অতীত, সেটিই ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে রাজধানীর বুকে। করোনা ঝুঁকি সামলে নিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রথম অংশের কাজ। সরকারের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলছে দ্বিতীয় অংশের কাজও। আর এতেই যানজটহীন পরিপাটি একটি শহরের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে রাজধানীবাসী।

মেট্রোরেল প্রকল্পের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আটটি প্যাকেজে ভাগ করে হচ্ছে। প্রথম প্যাকেজের আওতায় ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নের কাজ সবার আগে শুরু হয়। এই প্যাকেজের কাজ গত ৩১ জানুয়ারি শতভাগ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় বিরতিতে ট্রেন রাখার স্থান, ট্রেন মেরামত, মালামালের গুদাম ও প্রধান ওয়ার্কশপসহ নানা অবকাঠামোর নির্মাণকাজের বেশ অগ্রগতি হয়েছে।

উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার উড়ালপথ ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে প্যাকেজ ৩ ও ৪ এর আওতায়। পরে এই উড়ালপথের ওপরই ট্রেনের জন্য লাইন বসানো হবে। এই প্যাকেজের কাজ আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ হবে।

প্যাকেজ-৫ এর আওতায় আগারগাঁও থেকে কারওয়ানবাজার পর্যন্ত ৩ দশমিক ১৯ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৩টি স্টেশনের নির্মাণকাজ চলছে। ২০১৮ সালের আগস্টে শুরু হওয়া এই প্যাকেজের আওতায় পরিষেবা স্থানান্তর চেকবোরিং ট্রায়াল ট্রেঞ্চ টেস্ট পাইল ও স্থায়ী বোর্ড পাইলিং শেষ হয়েছে।

এ প্যাকেজের আওতায় মোট ১০৬টি পিয়ার কলামের মধ্যে ১০২টি পিয়ার কলাম শেষ হয়েছে। ২০৩টি পাইল ক্যাপের মধ্যে মেইন লাইনের পাইল ক্যাপের ১০৬টি এবং স্টেশনের ৯৭টি পাইল ক্যাপের মধ্যে ২২টির কাজ শেষ হয়েছে। এই প্যাকেজে মোট ১২৮টি পাইল ক্যাপ সম্পন্ন হয়েছে।

বর্তমানে ফার্মগেট স্টেশনের সাব-স্ট্রাকচার নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে। এই প্যাকেজের মোট ১১৫টি স্টেশন কলামের মধ্যে ১৯টি কলামের কাজ শেষ হয়েছে। ৯০টি পিয়ার হেডের মধ্যে ৬৫টি পিয়ার হেড এবং এক হাজার ৪৮টি প্রিকাস্ট সেগমেন্টের মধ্যে ২৭৭টির কাজ শেষ হয়েছে।

এই প্যাকেজের আওতায় উত্তরা ডিপো এলাকায় নির্মাণাধীন মেট্রোরেল এক্সিবিশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টারের পূর্ত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৮ শতাংশ। প্যাকেজটির সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি ৫০ দশমিক ১৮ শতাংশ।

প্যাকেজ-৬ এর আওতায় কারওয়ানবাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৪ দশমিক ৯২ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও চারটি স্টেশন নির্মাণকাজ চলছে। ২০১৮ সালের আগস্টে শুরু হওয়া এই প্যাকেজটির কাজ বর্তমানে পরিষেবা স্থানান্তর চেকবোরিং ট্রায়াল ট্রেঞ্চ টেস্ট পাইল এবং সব স্থায়ী বোর্ড পাইল, ১৬০টি পিয়ার কলামের মধ্যে ১১৪টি পিয়ার কলাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনের সাব-স্ট্রাকচার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। মোট ১৩০টি স্টেশন কলামের মধ্যে সাতটি স্টেশন কলাম নির্মাণ শেষ হয়েছে।

এই অংশে মোট ২৯৮টি পাইল ক্যাপের মধ্যে ১৩৭টি পাইল ক্যাপ শেষ হয়েছে। ১৩৬টি পিয়ার হেডের মধ্যে ১০০টি পিয়ার হেড সম্পন্ন হয়েছে এবং এক হাজার ৬২০টি সেগমেন্টের মধ্যে ৫০৮টি সেগমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। এই প্যাকেজের বাস্তব অগ্রগতি ৫১ দশমিক ১২ শতাংশ।

প্যাকেজ-৭ এর আওতায় বৈদ্যুতিক এবং কারিগরি সিস্টেম নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। টঙ্গি ও মানিকনগর গ্রিড সাব-স্টেশনে বে স্থাপন এবং উত্তরা ডিপোতে রিসিভিং সাব-স্টেশনের পূর্ত কাজ শেষ হয়েছে। উত্তরা ডিপোতে রিসিভিং সাব-স্টেশনে ভবন যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে।

প্যাকেজ-৮ এর আওতায় রেল কোচ ও ডিপোর সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বগি নির্মাণের কাজ জাপানে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরুর পর বাস্তব অগ্রগতি ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর মেট্রোরেলের মকআপ ট্রেন ডিপোতে পৌঁছেছে। ছয়টি যাত্রীবাহী কোচ সম্বলিত প্রথম মেট্রো ট্রেন সেট এবং দ্বিতীয় ট্রেন সেটের নির্মাণকাজ এরই মধ্যে জাপানে শেষ হয়েছে। জাপানের একটি কারখানায় আরো তিনটি মেট্রোরেল সেট তৈরির কাজ চলছে।

মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রথম অংশ পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে গেছে। জানা গেছে, এ অংশের কাজ প্রায় ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। এখন চলছে সড়কের উপরে বিদ্যুতায়ন ও রেলপথ বসানোর কাজ। 

মিরপুর-১০ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুই পাশে কংক্রিটের বেড়া দিয়ে মেট্রোরেল এলাকা ঘেরাও দেয়া। ভেতরে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। কয়েকটা জায়গায় পাইলিংয়ের কাজ চলছে। কোথাও পাইলিং শেষে ক্যাপ বসানো হচ্ছে।

সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ার মতো চলমান কাজের তালিকায় রয়েছে- বিদ্যুতের খুঁটি বসানো, ক্যাবল টানা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কাজ। দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেলের একটি ডিপো, অপারেশন কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্মাণ কাজও শেষ হয়েছে। পুরো প্রকল্পেই শ্রমিকরা শিফটিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন রাত-দিন মিলিয়ে।

আগারগাঁও পর্যন্ত মোট নয়টি স্টেশনের মধ্যে তিনটি স্টেশন আছে উত্তরাতে। এসব স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, বেশ পরিপাটি করে সাজানো সবগুলো স্টেশনেই রাখা হয়েছে হলরুম, সিঁড়ি, এস্কেলেটর ও লিফট। কোন কোন স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম রাখা হয়েছে টিকিট বুথেরও একতলা উপরে। যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রথম অংশে যাত্রীরা চলাচল করতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে বাকি অংশের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকবে। আর এর জন্য ২০২১ সালের জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতেই জাপান থেকে আসবে মেট্রোরেলের কোচ।

এদিকে, আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দ্বিতীয় অংশের কাজও চলছে পুরোদমে। এ অংশের কাজ হয়েছে সাড়ে ৫৩ শতাংশ। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক সিস্টেম এবং রোলিং স্টক (রেলকোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি সাড়ে ৩৫ শতাংশ।

প্রকল্পের কয়েকজন প্রকৌশলী ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দ্বিতীয় অংশের কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। ৫০টিরও বেশি পিয়ারের ওপর পিয়ারহেড বসানো হয়েছে। বাকি পিয়ারগুলোতেও হেড বসানোর কাজ চলছে।

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এমএন সিদ্দিক ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন বর্ষ ২০২১ সালের বিজয় দিবসে বাংলাদেশের প্রথম উড়াল মেট্রোরেলের সম্পূর্ণ অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সবার জানা। করোনা সংকটে মেট্রোরেলের কাজ পুরোদমে আগের মতো হচ্ছে না। তারপরও নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি।

তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো প্রকল্প শেষ করতে এখন থেকে আমরা রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিশেষ করে রাতের বেলায় কাজ এগিয়ে নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দিনের বেলায়ও যথারীতি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকবে।

এদিকে, স্টেশনগুলো খুব টেকনিক্যালি তৈরি করা হচ্ছে। যাত্রীদের ওঠা-নামার সময় জায়গাগুলো অনেকটা প্রশস্ত হবে। স্টেশনের ভেতর দিয়ে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থাও থাকবে। কয়েকটি জরিপ চালিয়ে মেট্রোরেল স্টেশন নির্মাণের জায়গা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতিটি তিনতলা স্টেশনের দৈর্ঘ্য হবে ১৮০ মিটার। একেকটি স্টেশনে যাত্রী ধারণক্ষমতা হাজারের কাছাকাছি।

মেট্রোরেল প্রকল্পের উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. মাহফুজুর রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের প্রত্যেকটা স্টেশন ১৮০ মিটার করে লম্বা, ৩৩ মিটার থেকে শুরু করে ২৬ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত রাখা হয়েছে। স্টেশনে সব ধরনের সর্বাধুনিক সুবিধা রাখা হয়েছে।

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্প চালু হলে প্রতি ৪ মিনিট পরপর ১ হাজার ৮০০ যাত্রী নিয়ে চলবে মেট্রোরেল। ঘণ্টায় চলাচল করবে প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী। প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪০ মিনিটের কম।

এদিকে, রাজধানীতে আরো দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রথম প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২৬ সালের জুন মাসে। দ্বিতীয় প্রকল্প ২০২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ করার কথা রয়েছে। এতে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা। আর দুটি প্রকল্পেই জাপানের সংস্থা জাইকা অর্থায়ন করবে।

গেল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই দুটি প্রকল্প পাস হয়। এই দুই প্রকল্পের মেট্রোরেলের মধ্যে একটি হবে বিমানবন্দর থেকে নতুন বাজার, বাড্ডা হয়ে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য হবে ৩১ কিলোমিটার। এটি ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা এমআরটি লাইন-১ নামে পরিচিত হবে।

আরেকটি মেট্রোরেল হবে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর-১, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুনবাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। এই রুটটি এমআরটি লাইন-৫ নামে পরিচিত হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ/এইচএন