টেন্ডার-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে এখনো সক্রিয় জি কে শামীমের সহযোগীরা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১০ ১৪২৭,   ০৭ রবিউস সানি ১৪৪২

টেন্ডার-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে এখনো সক্রিয় জি কে শামীমের সহযোগীরা

মো: ইদ্রিস আলম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩৭ ২৬ অক্টোবর ২০২০  

গ্রাফিক্স: ডেইলি বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: ডেইলি বাংলাদেশ

বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, এফডিআর, মদ ও অস্ত্রসহ গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডেইলি বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেফতারের পর বর্তমানে কারাগারে থাকলেও থেমে নেই জি কে শামীমের সিন্ডিকেট বাণিজ্য। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ঠিকাদারীসহ যাবতীয় সিন্ডিকেট।

আলোচিত ক্যাসিনো অভিযান শুরুর পর রাজধানীর নিকেতন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় গণপূর্ত অধিদফতরের সিন্ডিকেটের প্রধান জি কে শামীমকে। জি কে শামীম গ্রেফতারের পরই বেরিয়ে আসে তার ঘনিষ্ঠ সহোযোগীদের নাম। এরপর গণপূর্ত অধিদফতরের সেই সময়ের অতিরিক্ত প্রকৌশলীসহ ১৩ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

জানা গেছে, ক্যাসিনোকাণ্ডের পর থেকে শামীমের অনেক সহযোগীর নামে একের পর এক অভিযোগ জমা হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থায়। তবুও থেমে নেই গণপূর্তের দুর্নীতি ও অনিয়ম বাণিজ্য। এই চক্রের মূলহোতা জি কে শামীম জেলে থাকলেও বহাল তবিয়তে চলছে এসব কার্যক্রম।

পুরো সিন্ডিকেট প্রভাব খাটিয়ে স্বপদে বহাল থাকলেও আলোচিত জি কে শামীমের সহযোগীদের লিস্ট থেকে দায়মুক্তির জন্য বিভিন্ন দফতরে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।  

শামীম তার সাম্রাজ্য চলাকালীন সময়ে গণপূর্ত অধিদফতরকে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিল। তার নেতৃত্বে গড়ে তোলা সিন্ডিকেট নানা অনিয়মের মাধ্যমে এই অধিদফতরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা।

এদিকে জি কে শামীমের নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ও সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগের দায়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে জিজ্ঞাবাদের জন্য ডেকে নেয় দুদক। শামীম গ্রেফতারের পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে যাদের নাম আসে তাদের একজন ছিলেন এই মোসলেহ উদ্দিন। 

ডেইলি বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা যায়, জি কে শামীম সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য এই মোসলেহ উদ্দিন। তার সঙ্গে আছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম সোহরাওয়ার্দী ও নিবার্হী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শওকত উল্লাহসহ অনেকেই এখনো সক্রিয়ভাবেই টেন্ডার বাণিজ্যের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের পক্ষে সোহেল রানা নামে এক ব্যক্তি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিনের নামে অভিযোগ জমা দেন দুদক কার্যালয়ে। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বরও দুদকে একই ধরনের অভিযোগ দায়ের করেন মো. বদরুদ্দীন ওমর নামে আরেক ব্যক্তি।

সবশেষ চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর আবারো নানা ধরনের অভিযোগ তুলে মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুদক কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিল করেন মো. মোশাররফ হোসেন নামে আরেক ব্যক্তি।

অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের অনিয়ম ও সীমাহীন দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন গণপূর্তের সব ঠিকাদাররা। পুরো অধিদফতরে তার পরিচিতি রয়েছে ‘ফিফটিন পার্সেন্ট’ নামে। বর্তমানে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে এই হারে কমিশন নিয়ে থাকেন তিনি।

আরো বলা হয়েছে, ২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। সেই সময় নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি টাকা খরচ করে আলোচিত হন। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। 

যে কারণে দুদকে তলব:

গণপূর্ত অধিদফতরের এই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিনকে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি তলব করে নোটিশ পাঠায় দুদক। দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত সেই নোটিশে বলা হয়- সরকারি কর্মকর্তাদের শত শত কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে বড় বড় ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন ঠিকাদার জি কে শামীমসহ অন্য ব্যক্তিরা। এর মধ্য দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া, ক্যাসিনোকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে শত শত কোটি টাকা আয় করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বক্তব্য নেয়া জরুরি।

তলবে সাড়া দিয়ে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হন প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।

জি কে শামীম সিন্ডিকেটের উত্থান যেভাবে:

গণপূর্ত অধিদফতরে জি কে শামীম সিন্ডিকেটের মূল উত্থান শুরু হয় অধিদফতরের সাবেক দুই প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম ও মো. শাহাদত হোসেনের হাত ধরে। 

রফিকুল ইসলাম অবিভক্ত ঢাকা গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় জি কে শামীম ঢাকার গণপূর্ত অধিদফতরের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। রফিকুল ইসলাম যোগদানের সঙ্গে সঙ্গে তার স্টাফ অফিসার (নিবার্হী প্রকৌশলী) হিসেবে নিয়ে আসেন একে এম সোহরাওয়ার্দীকে। এরপর নানা তদবির করে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী পদটি পেয়ে যান রফিকুল ইসলাম।

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মহোৎসব শুরু করেন রফিকুল ইসলাম। নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার, সরবরাহ, পদোন্নতি সব কিছুই এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে জি কে শামীম সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় একে এম সোহরাওয়ার্দী পদোন্নতি পেয়ে গণপূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট ঢাকা সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম চাকরি থেকে অবসরে গেলে জি কে শামীম সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় মো. শাহাদত হোসেন প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসেন।

জি কে শামীম গ্রেফতারের পর গণপূর্ত অধিদফতরের যে কয়জন প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল দুদক তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন এই একে এম সোহরাওয়ার্দী। তিনি ঢাকার গণপূর্তের বিভিন্ন ডিভিশনে তার অনুগত নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়ন দিয়ে সিন্ডিকেটের টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। 

২০১৯ সালে ৩১ ডিসেম্বর একে এম সোহরাওয়ার্দীকে তলব করে নোটিশ পাঠায় দুদক। দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত সেই নোটিশে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, জি কে শামীম সিন্ডিকেটের আরেক প্রভাবশালী সহযোগী হচ্ছেন নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শওকত উল্লাহ। বিসিএস ২৪ ব্যাচের এই কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই গণপূর্তে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।

সংশ্লিষ্ট অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রফিকুল ইসলাম, মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও একে এম সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে জিকে শামীম সিন্ডিকেটে প্রবেশ করেন এই শওকত উল্লাহ। সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় তিনি গত ১০ বছর ধরে ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে দায়িত্বে রয়েছেন। 

জি কে শামীম গ্রেফতারের পর মোহাম্মদ শওকত উল্লাহকেও তলব করে দুদক। ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন একই ধরনের নোটিশে ১১ জন প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

গণপূর্ত অধিদফতরের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ের দায়ের হওয়া অভিযোগ এবং চলমান তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, এই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু এখন বলতে পারবো না। পরে জানাবো। 

এই ব্যাপারে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের মোবাইলে একাধিক ফোন করা হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।

এ সব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বক্তব্য জানতে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/এমআরকে