সাংবাদিকতার আড়ালে ওরা কারা!

ঢাকা, সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১১ ১৪২৭,   ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাংবাদিকতার আড়ালে ওরা কারা!

মো: ইদ্রিস আলম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১২ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৮:৩৩ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নিঃসন্দেহে সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। এ পেশার প্রতি দুর্বলতা রয়েছে অধিকাংশ সচেতন মানুষের। কিন্তু সাংবাদিকতা পেশায় যেমন রয়েছে ঝুঁকি, তেমন রয়েছে সম্মান ও রোমাঞ্চ। এছাড়া সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবেও স্বীকৃত। একজন সৎ নির্ভিক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিক সমাজের কাছে যেমন সমাদৃত, তেমনি দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চোরাচালান, মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ী ও সমাজ বিরোধীদের কাছে আতঙ্ক। 

অপসাংবাদিকতা বাদ দিলে যেটুকু থাকে তার সবটুকুই আত্মতৃপ্তি পাওয়ার জন্য একটি স্বাধীন পেশা সাংবাদিকতা। এজন্যই সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ আর সাংবাদিকদের জাতির বিবেক বলে আখ্যায়িত করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাইলেই যে কেউ হতে পারে অললাইন মিডিয়ার ‘মালিক’, ‘সম্পাদক’, ‘সাংবাদিক’, ‘ক্রাইম রিপোর্টার’। এরপর খুলে বসছে প্রেসক্লাব। এরা একুশে টেলিভিশন, সময় টেলিভিশন কিংবা বাংলাদেশ প্রতিদিনের মতো জনপ্রিয় পত্রিকা ও টেলিভিশনের নামে সাইট তৈরি করে তাদের পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করছে বলেও দেখা যায়।

‘মানবাধিকার সাংবাদিক’ পরিচয়ে প্রতারণা চলছে দেশজুড়ে। মানবাধিকার সংগঠনের নামে প্রতারণার অভিযোগে আগে থেকেই সরব। এই সংগঠনটি ঢাকাসহ সারা দেশে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করছে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই মুড়ির মোয়ার মতো খুলে বসেছে প্রতিষ্ঠান। সাংবাদিকতার নামে করছে নিয়োগ বাণিজ্য। এছাড়াও তাদের নিত্য দিনের কাজ হলো, বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘পজেটিভ নিউজ করে দেব’ বলে টাকা নেয়া। টাকা না দিলে নেগেটিভ নিউজ করার ভয়-ভীতি দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া। 

তথ্য-প্রযুক্তিবীদরা মনে করেন, তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে ঘরে বসেই একটি সংবাদমাধ্যম খুলছে। কোনো খরচ ছাড়াই সামান্য প্রযুক্তিজ্ঞান নিয়ে ফেসবুক টিভি কিংবা ইউটিউব চ্যানেল ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল সম্পাদক তারা। এই সুযোগে অপরাধী ও ধান্দাবাজরা হয়ে যাচ্ছে সাংবাদিক।

সম্প্রতি, কয়েকটি ঘটনায় অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পরতেই নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন।
 
রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর জানা গেল তিনি একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক। সে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণা করে আলোচনার শীর্ষে। 

গেলো সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে শিশু অপহরণের দায়ে লুপা তালুকদার নামের এক নারী ধরা পড়ার পর জানা গেল তিনিও সাংবাদিক। একটি অনলাইন টিভির মালিকও সে।
এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে রাজধানী থেকে আটক করে কয়েকজন প্রতারককে। যারা অনলাইন সংবাদপত্র ও টেলিভিশন খুলে নিয়োগ বাণিজ্য করে আসছে। 

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে পাওয়া ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা সম্প্রতি সারা দেশেই ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকরা। 

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে যারা প্রতারণা করছে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার তাগিদ জানায়। এ জন্য গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

সমাজে ‘সাংবাদিক’-এর গ্রহণযোগ্যতা বা বিভিন্ন স্থানে সহজ প্রবেশাধিকারে, রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি, অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়, অপরাধ ধামাচাপা দেয়া ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ‘সাংবাদিক’ পরিচয় ব্যবহার করছে অপরাধীরা। 

ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিছু ভুঁইফোড় সংবাদপত্র সারা দেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করার নামে কার্ড বিক্রি করে এই অপতৎপরতার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছিল আগে থেকেই। এই তালিকায় কিছু বেসরকারি টেলিভিশনও রয়েছে।

এক ধরনের অনলাইন পোর্টাল দীর্ঘদিন ধরে অপসাংবাদিকতার কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্নজনের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করে দেয়া হবে বলে হুমকি দিয়ে অনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে তথ্য বিকৃতি, গুজব ছড়ানোরও অভিযোগ রয়েছে। 

অনলাইন পোর্টালগুলোর অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন, এগুলোর অপব্যবহার হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা উচিত বলে অনেকেই মনে করেন। অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধনের জন্য সরকারের উদ্যোগকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জানান, এ দেশে প্রতারণা করে সহজে পার পাওয়া যায়। এ কারণে সাংবাদিকতার নামেও প্রতারণা বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, এজন্য গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এদের বিরুদ্ধেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মনে করেন, রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক ফায়দা লোটার প্রবণতা থেকেই সাংবাদিকতার নাম ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে গেছে। গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে তারা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/এসআই