দেশে খাদ্য ঘাটতির কোনো শঙ্কা নেই

ঢাকা, সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৫ ১৪২৭,   ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্য

দেশে খাদ্য ঘাটতির কোনো শঙ্কা নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৩:০৫ ১০ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১২:২৯ ১০ আগস্ট ২০২০

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বলছে, বাংলাদেশে আপাতত খাদ্য ঘাটতির কোনো শঙ্কা নেই। তাদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, চালের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩.৫৪ ভাগ বেড়েছে। 

গত বোরো ও আমন মৌসুমের উদ্বৃত্ত  উৎপাদন থেকে হিসাব করে, জুন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে ২০ দশমিক ৩১ মিলিয়ন টন চাল ছিল। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর পরও ৫.৫৫ মিলিয়ন টন চাল দেশের ভেতরে উদ্বৃত্ত থাকবে। নভেম্বর পর্যন্ত ১৬.৫০ কোটি মানুষের চাহিদা মেটানোর পরও ৩৬-৭৮ দিনের চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। 

এছাড়া, নভেম্বরের মধ্যে দেশের ফুড বাস্কেটে নতুনভাবে আউশ ও আমনের উৎপাদন যুক্ত হবে। ফলে, বাংলাদেশে আপাতত খাদ্য ঘাটতির কোন আশঙ্কা নেই।

রোববার বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আয়োজিত ‘কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা: বাংলাদেশ কী চাল ঘাটতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?’ শীর্ষক অনলাইন সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

ব্রি কভিড-১৯ সময়কালীন খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ধানের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণে গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে এই ওয়েবিনার আয়োজন করে। কভিড-১৯ কালীন ও তৎপরবর্তী সময়ে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকটি দেশি-বিদেশি সংস্থার বরাত দিয়ে অনেক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারিত হচ্ছে যা জনমনে এবং পলিসি লেভেলে অস্বস্তি তৈরি করছে। ব্রি মনে করে, এই ওয়েবিনার দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্ভূত সব বিভ্রান্তি নিরসন করবে।

ওয়েবিনারে বলা হয়, ব্রি মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত ৫টি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এগুলোর মধ্যে হাওরের ধান কর্তনে শ্রমিক ও যান্ত্রিকীকরণের ভূমিকা, সুপার-সাইক্লোন আম্ফানের প্রভাব নিরূপণ, ধান চালের মজুদ পরিস্থিতি এবং বাজারমূল্যে এর প্রভাব, ৬৪ জেলায় কৃষকের মাঠের ফসল কর্তন এবং আউশ আবাদ পরিস্থিতি নিয়ে র‌্যাপিড সার্ভের মাধ্যমে করোনাকালীন সময়ে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। এসব গবেষণার ফলন বিশ্লেষণে ৬৪টি জেলায় ব্রি কর্তৃক এক হাজার ৪৮টি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কর্তৃক দুই লাখ ১৩ হাজার ৮৬৯টি ফসল কর্তনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই সার্ভে কার্যক্রমে দেশের ৩৮টি জেলার ৫৭টি উপজেলা এবং ফসল কর্তনে ৬৪টি জেলা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও দেশে চাল উৎপাদন বেড়েছে: ওয়েবিনারে বিগত দশ বছরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর উৎপাদন চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ২০১০ সালে যেখানে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। বর্তমানে সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, গবেষণা ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। যা বাংলাদেশের জন্য বিশাল একটি অর্জন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় মাইলফলক। যদিও ইউএসডিএ ধানের উৎপাদন নিয়ে পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, গত বছরের তুলনায় উৎপাদন ০.২৮ ভাগ কমে যাবে, কিন্তু বাস্তবে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯-২০ সালে ৩৮.৭ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে।

ব্রি'র জরিপ থেকে দেখা গেছে, ফলন, আবাদকৃত এলাকা, উৎপাদন ও চালের অভ্যন্তরীণ মজুদ পরিস্থিতি বিবেচনায় গত বছরের তুলনায় এ বছর সব কৃষি অঞ্চলে ধানের ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এ বৃদ্ধির হার সারাদেশে গড়ে শতকরা ৮.৪ ভাগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) ৬৪ জেলার ক্রপ-কাট এর ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, ধানের ফলন গড়ে ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ব্রি’র এক হাজার ৪৮টি কৃষকের মাঠে ক্রপ-কাট এর ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সারাদেশে ধানের ফলন গড়ে ২.৮ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্রি'র গবেষণায় দেখা যায়, চালের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩.৫৪ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। অপর পক্ষে, ডিএই’র ক্রপ কাটের তথ্য অনুযায়ী ৩.১৮ শতাংশ এবং ব্রি’র ক্রপ কাট অনুযায়ী ৩.৯৪ শতাংশ চালের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। বোরো মৌসুমে এবছর চালের উৎপাদন হয়েছে ২০.২৬ মিলিয়ন টন যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩.৫৮ শতাংশ বেশি। এই উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভালো আবহাওয়া, উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা, দাম কমানোর ফলে ডিএপি সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, ব্রি-ডিএই যৌথ উদ্যোগে ১৪টি কৃষি অঞ্চলে আঞ্চলিক কর্মশালা, বোরো মৌসুমের শুরুতে কৃষক প্রশিক্ষণ এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারের তড়িৎ পদক্ষেপ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

এ বছর বোরো ধানের দাম বেশি থাকায় কৃষক আউশ চাষে ঝুঁকেছে। ফলে গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ ভাগ বেশি জমিতে আউশ ধান আবাদ হয়েছে। আউশের প্রত্যাশিত উৎপাদন হবে ৩.৫৬ মিলিয়ন টন। কিন্তু এরইমধ্যে দেশের প্রায় ৩১টি জেলা বন্যা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। তাই বন্যার ফলে আউশের প্রত্যাশিত উৎপাদন কিছুটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এবার বোরো ধান চাষ লাভজনক ছিল: বিসিআর ক্যালকুলেট করে দেখা গেছে, এবার বোরো ধান চাষ লাভজনক ছিল। ধান কাটা মৌসুমে কাঁচা ধানের দাম গত বছরের তুলনায় বেশি থাকায় কৃষকের মোট আয় শতকরা ১৬.৭ ভাগ বেড়েছে। বোরো ধান চাষিদের তথ্য মতে, এ বছর তারা গড়ে বিঘাপ্রতি এক হাজার ৬০৪ টাকা লাভ করেছেন যেখানে গত বছর তাদের লোকসান গুণতে হয়েছিল। এ বছর কর্তনকালীন সময়ে এবং ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে কৃষক গত বছরের তুলনায় কম পরিমাণ ধান বাজারে বিক্রয় করেছেন। একদিকে ভবিষ্যৎ খাদ্য ঘাটতির শঙ্কা অন্যদিকে ধানের দাম বেশি থাকায় অল্প ধান বেচেই কৃষক কৃষি ও পরিবারের খরচ বহন করতে পেরেছেন। অধিকন্তু বেশি দামের আশায় ধান মজুদ করার প্রবণতা বাড়তে দেখা গিয়েছে।

ধান-চাল মজুদের প্রবণতা কিছুটা বেশি থাকলেও সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হয়নি: ধান চালের মজুদ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ধানের ক্ষেত্রে গত বছর জুন মাসে কৃষকের গোলায় মোট মজুদের ২০ শতাংশ ধান ছিল, যা এ বছর একই সময়ে প্রায় ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে অধিক লাভের আশায় এক ধরনের নতুন বিনিয়োগকারী যোগ হয়েছে, যারা এ সময় ধানে বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করছে। এসব কারণে এ বছর মিলারদের ধান মজুদের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম ছিল।

অন্যদিকে চাল মজুদের বেলায় দেখা যায় যে, ভোক্তা শ্রেণি ভবিষ্যৎ খাদ্য ঘাটতির শঙ্কা থেকে আতঙ্কিত হয়ে বেশি পরিমাণ চাল মজুদ করেছেন। অপরপক্ষে, সরকারসহ (গত বছর জুন পর্যন্ত সরকারি মজুদ ছিল ১২.৫৬ লক্ষ টন যা এবার কমে (জুন মাসে) ৯.২৭ লক্ষ টনে দাড়িয়েছে) অন্যান্য চাল ব্যবসায়ীরা গত বছরের তুলনায় কম পরিমাণে চাল মজুদ করেছেন। সার্বিকভাবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে ধান-চাল মজুদের প্রবণতা কিছুটা বেশি থাকলেও সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হয়নি।

সরকার ঘোষিত দামে চাল বিক্রি করে মিলাররা লাভবান হচ্ছেন: চাল উৎপাদন খরচের ক্ষেত্রে মৌসুমে বিদ্যমান সর্বনিম্ন দামে মিলাররা যে ধান ক্রয় করেন সেটি থেকে কেজি প্রতি চাল উৎপাদনে ২৭.৮৬ টাকা খরচ হয়। 

অন্যদিকে সর্বোচ্চ দাম বিবেচনায় দেখা যায়, কেজি প্রতি চাল উৎপাদনে ৩৫.৮০ টাকা খরচ হয়। গড় বিবেচনায় এক কেজি চাল উৎপাদনে ৩২.৩৪ টাকা ব্যয় হয়। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ বিল, যানবাহন ও শ্রমিক খরচ বাড়ার কারণে এ বছর মিলিং খরচ ৮.৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খরচ বাড়লেও এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সরকার ঘোষিত দামে চাল বিক্রি করে মিলাররা লাভবান হচ্ছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএ/এইচএন/আরএইচ