জাতির পিতার ফিরে ফিরে আসা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২০ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৫ ১৪২৭,   ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জাতির পিতার ফিরে ফিরে আসা

বীরেন মুখার্জী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪৪ ১৭ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৪:৪৫ ১৭ মার্চ ২০২০

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

বাঙালি জাতির ভাগ্যবিধাতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মার্চের জাতক। আমারও অত্যন্ত সৌভাগ্য যে আমিও মার্চের জাতক এবং যে দেশে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন অবিসংবাদিত নেতার জন্ম, সে দেশের অপরূপ প্রকৃতিতে আমিও জন্ম নিয়েছি, বেড়ে উঠেছি। তবে আজকের প্রতিপাদ্য শুধুই বঙ্গবন্ধু। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীনতার এই মহান স্থপতি।

শৈশব থেকেই তার মধ্যে অসাধারণ নেতৃত্ব গুণ অবলোকন করেন এলাকাবাসী। আর বড় হয়ে তিনি এই নেতৃত্বের গুণে কেবল বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবেই পরিগণিত হননি, নিজেকে তিনি নেতৃত্বের এমন এক সুমহান স্তরে সমাসীন করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে একাত্তরে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা তার নাম বলতে বলতেই দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন। একাত্তরের ২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে পাকবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে কারাবন্দি করে। কিন্তু কী আশ্চর্য বন্দি মুজিব আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। রণাঙ্গণে প্রতিজন যোদ্ধাই যেন হয়ে উঠলেন এক একজন মুজিব। তার নামেই পরিচালিত হল মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অবশেষে বাঙালি জাতি পেল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতার জন্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬৬-এর ৬ দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন মানেই সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য এক অবিস্মরণীয় এবং উৎসবের দিন। একজন নেতা তার দেশের মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ আত্মপরিচয়ের আলোকে কী অপরিসীম সাহসিকতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন তার উজ্জ্বল উদাহরণ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের সর্বস্তরের মানুষ তথা আবালবৃদ্ধবণিতার ভালবাসা, হৃদয় উজাড় করা শ্রদ্ধা ও সম্মানে তিনি অভিষিক্ত হয়েছেন। সমগ্র দেশের মানুষ অকৃত্রিম ভালবাসার কারণে, বিশ্বাসের কারণে তার ওপর অর্পণ করে পূর্ণ আস্থা, তাকে স্থান দেয় তাদের হৃদয়ে। তিনি বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন, এ দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, এটা বাঙালি জাতির জন্য সৌভাগ্যের। তিনি নিরলস পরিশ্রম করে চারণের মতো সারাদেশ ঘুরে মানুষকে জাগিয়েছেন, পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সামরিক শাসকদের জেলে বছরের পর বছর বন্দি থেকেও অকুতোভয় বীরের মতো নিজ সঙ্কল্পে অটল থেকেছেন, মুক্তির মহামন্ত্রে জাতিকে জাগিয়েছেন এবং স্বাধীনতার পথ ধরে জাতিকে পৌঁছে দিয়েছেন স্বপ্ন পূরণের চ‚ড়ান্ত লক্ষ্যে এ কৃতিত্ব একান্তভাবে তারই। কারণ, তিনিই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রূপকার এবং প্রতিষ্ঠাতা। দেশের মানুষের স্বার্থের বিষয়ে তিনি সব সময় ছিলেন আপোসহীন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি সব সময় ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ। কখনো কোনো কিছুর বিনিময় বা প্রলোভনে বা ভয়ে বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার করেননি। সত্তরের নির্বাচনে জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে তিনি অভিষিক্ত হন। গোটা জাতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। শুরু হয় এক অভ‚তপূর্ব আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন। দেশের মানুষকে তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করেন। এরই এক পর্যায়ে আসে মহান একাত্তরের ৭ মার্চ। সেদিন ঢাকার ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে তিনি যে ভাষণ দেন সেটাই হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অত্যুজ্জ্বল মাইলফলক। তিনি ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। তিনিই তার নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতিকে পৌঁছে দিয়ে গেছেন স্বাধীনতার স্বর্ণ তোরণে।

স্বাধীন এই দেশে লজ্জাজনক ঘটনা ঘটে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে ষড়যন্ত্রকারীরা। এরপর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করা যাবে না-এই মর্মে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে বাদ দেয়াই শুধু নয়, রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম থেকে তার নাম বা তার কথা প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। এক কথায় মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুর কথা, তার স্মৃতি, তার অবদান মুছে ফেলার যাবতীয় অপচেষ্টা করা হয় সে সময়। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করা, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা, তার ভ‚মিকা খাটো করে দেখানো ইত্যাদি চেষ্টা যে সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে সেটা সময়ের পরীক্ষায় প্রমাণিত। স্বীকার করতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের অপশক্তিরা কখনো চিন্তাও করতে পারেনি যে, বঙ্গবন্ধু সমহিমায় ফিরে আসবেন। তারা বুঝতে পারেনি, বীরের মৃত্যু হয় না।
 
আজ বাংলার অবিসংবাদিত মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ পালন করছে ‘মুজিববর্ষ’, এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশে একযোগে পালিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ঘোষণা করা হয়েছে মুজিববর্ষ। আর বাংলাদেশ সরকার বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১০ জানুয়ারি থেকে মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরু করে। আজ মধ্যরাত থেকেই শুরু হয়েছে মুজিববর্ষ। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন জাতীয় শিশু দিবস হিসেবেও পালিত হয়ে আসছে। আর এ কারণেই আজকের দিনটি উৎসবের। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ার। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ নীতি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীরা তার রেখে যাওয়া দলের নেতৃত্বেই বর্তমান সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো দেশ পরিচালনা করছে জনগণের সমর্থনে। সরকারের সামনে এখন প্রধান কাজটিই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়া।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শ সবার জন্যই এক শিক্ষণীয় বিষয়। বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার জন্য আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি যেমন আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তেমনি দেশের জন্য জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। এখনো বাঙালি জাতির যে কোনো সংকটে বঙ্গবন্ধুই যেন বারংবার ফিরে ফিরে আসেন! তাই বাঙালি জাতি চিরকাল শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে এবং করবে। কবির ভাষায়, ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর