ফুটবল পায়ে যুদ্ধ করেছিলেন স্বাধীন বাংলার ফুটবলাররা

ঢাকা, সোমবার   ২৯ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৮,   ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

ফুটবল পায়ে যুদ্ধ করেছিলেন স্বাধীন বাংলার ফুটবলাররা

এস আই রাসেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৭ ২৬ মার্চ ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নেমে ছিলাম। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তার কালজয়ী ভাষণে বলেছিলেন, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকবা”। তাই আমাদের ছিল ফুটবল। দেশের জন্য সেই ফুটবল নিয়েই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছিলাম দেশের জন্য কিছু করার।- মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবলারদের অবদান বলতে গিয়ে ডেইলি বাংলাদেশকে এমনটাই বলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ও বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু।

মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল এক অনন্য নাম। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার মানুষ। এ সময় বসে ছিলেন না খেলোয়াড়রাও। বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি এবং তহবিল সংগ্রহে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন স্বাধীন বাংলা দলের ফুটবলাররা। অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল খেলায় অংশ নেয় দলটি।

১৬টি ম্যাচ খেলে সংবাদমাধ্যমেও শিরোনাম হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। সংগ্রহ করেছিল যুদ্ধের জন্য তহবিল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের নানা ছবিজাকারিয়া পিন্টু বলেন, আমরা সব মিলিয়ে ১৬টি ম্যাচ খেলেছিলাম। যার ১২টিতে জয়, ৩টিতে ড্র এবং একটিতে হারি। প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি টাকা সংগ্রহ হয়েছিল। তখনকার দিনে এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তহবিল সাহায্য ছিল। আমরা চেষ্টা করেছিলাম কিছু করে অন্তত্ব তো যুদ্ধের সাথী হতে। আমরা হয়েছি।

তিনি আরো বলেন, এখন আমাদের টিমের অনেকেই ভালো নেই। যদিও সবাইকে ভাতা দেয়া হয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতা পদক পেয়েছি। তবে আমি মরার আগে অন্তত দলীয়ভাবেই স্বাধীনতা পদক পেতে চাই। আমি অনেক দেশ ঘুরেছি। তবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মত এমন ক্রীড়াপ্রেমী রাষ্ট্র নায়ক দেখি নি। তিনি দেশের যে কোন খেলাতে যে ভাবে এগিয়ে যান। নিজে উৎসাহ দেন তা ইতিহাসে বিরল। তার দৃষ্টি তে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল আসতে পারলে সবার শেষ জীবনটা হয়তো বদলে যেতো।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য কাজী সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জন্য কাজ করতে পারা।’ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কেউ সম্মুখ সমরে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, কেউ গান শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। কেউ আবার ফুটবল খেলে।

‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ বিশ্ব ইতিহাসে একমাত্র যোদ্ধা, যারা দেশমাতৃকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দলটির অনেকেই আজ বেঁচে নেই। অনেকে আছেন আমজনতা হয়ে। যারা মারা গেছেন এবং যারা ভালো অবস্থানে নেই, তাদের জন্য মন কাঁদে বাফুফে সভাপতি সালাউদ্দিনের।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে সতীর্থদের সঙ্গে সালাউদ্দিনএ বিষয়ে সালাউদ্দিন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়টার কথা আমৃত্যু মনে থাকবে। দেশের বাইরে থাকলেও মন কাঁদত দেশের জন্য। আমরা একে অপরকে উৎসাহিত করতাম। আমরা ছিলাম একটি পরিবার হয়ে। আজ অনেকেই বেঁচে নেই। অনেকেই খুব ভালো অবস্থানে নেই। এসব ভেবে খুব কষ্ট পাই। দেখতে দেখতে ৫০ বছর হয়ে গেছে। অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি।’ বাংলাদেশ এখন স্বাধীন একটি দেশ। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিত একটি মুখ। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

জুলাইয়ের শেষের দিকে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে দলটির অভিষেক হয়। ছোট স্টেডিয়ামটিতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মানুষ গাছ ও দেয়াল টপকে, প্রতিবেশীর ছাদ থেকে খেলা দেখে।

শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। এ সময় স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধিরা। এ ম্যাচে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। জাকারিয়া পিন্টু বলেন, ‘আমি এখনো সেই দিনটি স্মরণ করতে পারি। আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি হচ্ছে, দেশের বাইরে আমি প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। এটি বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত।’

বাংলাদেশ তাদের সর্বশেষ ম্যাচটি খেলেছিল পশ্চিমবঙ্গ বালুরঘাট একাদশের বিপক্ষে। বাংলাদেশের গেরিলা ক্যাম্পটিও ছিল বালুরঘাটে। খেলা শুরুর আগে খেলোয়াড়রা গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানবাংলাদেশ একাদশ দিল্লিতে তহবিল সংগ্রহের জন্য আরেকটি ম্যাচ খেলতে যাওয়ার কথা, এমন সময় তারা বহুল প্রতীক্ষিত সংবাদটি পেল- বাংলাদেশ পাকিস্তানের রোষানলমুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এতে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাদের সম্মাননা প্রদান করেন। বাংলাদেশের বাইরে খুব কম লোকই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অবদান সম্পর্কে অবগত আছেন।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন পৃথিবীর ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই দল নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। দলে যারা ছিলেন তাদের একজনের কথার সাথে অন্যজনের কথার অনেক অমিল দেখা যায়। বলতে দ্বিধা নেই স্বাধীনতার এই ৫০ বছর পরেও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নেই।

একাত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশসেরা ফুটবলাররা। স্বাধীনতা অর্জনে তাদের অবদান ভোলা মানে, প্রিয় স্বদেশকেই ছোট করা। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ক্রীড়াঙ্গনের সূর্যসন্তানরা চিরদিন বাংলাদেশের হৃদয়ে অম্লান হয়েই থাকবেন।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ৩৬ ফুটবলার হলেন: জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), প্রতাপ শংকর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), আলী ইমাম, কায়কোবাদ, অমলেশ সেন, আইনুল হক, শেখ আশরাফ আলি, বিমল কর, শাহাজাহান আলম, শেখ মনসুর আলী লালু, কাজী মো. সালাউদ্দিন (ছদ্দ নাম-তুর্জ হাজরা), এনায়েতুর রহমান, কে এন নওশেরুজ্জামান, সুভাষ চন্দ্র সাহা, ফজলে সাদাইন খোকন, আব্দুল হাকিম, তসলিম উদ্দিন শেখ, আমিনুল ইসলাম, আব্দুল মমিন জোয়াদ্দার, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, আব্দুস সাত্তার, প্রাণ গোবিন্দ কুন্ডু, মজিবর রহমান, খোন্দকার মো: নূরুন্নবী, লুৎফর রহমান, অনিরুদ্ধা চ্যাটার্জী, সনজিত কুমার দে, মাহমুদুর রশিদ, সাইদুর রহমান প্যাটেল, সিরাজ উদ্দিন, নিহার কান্তি দাস, মোজাম্মেল হক, বীরেন দাস বিরু, আব্দুল খালেক। 

ম্যানেজার : তানভীর মাজহার তান্না, কোচ : ননী বসাক।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএল