‘দেশের বাইরে আমি প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি’

ঢাকা, সোমবার   ২৯ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৮,   ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘দেশের বাইরে আমি প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি’

এস আই রাসেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৫ ২৬ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:১৬ ২৬ মার্চ ২০২১

জাকারিয়া পিন্টু

জাকারিয়া পিন্টু

১৯৭১ সালে বংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে যার যা ছিল তাই নিয়েই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ লড়েছে গান, কবিতা ও ফুটবল পায়ে নিয়ে। বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি এবং তহবিল সংগ্রহে অসামান্য ভূমিকা রেখে ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল খেলায় অংশ নেয় দলটি।

১৬টি ম্যাচ খেলে সংবাদমাধ্যমেরও শিরোনাম হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। সংগ্রহ করেছিলেন যুদ্ধের জন্য তহবিল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি। আর এই দলের অধিনায়ক হয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসে জাকারিয়া পিন্টু ও তার নেতৃত্বাধীন ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ এর নাম অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে কেবল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে নন, একজন অসাধারণ ফুটবলার এবং অধিনায়ক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি।

জাকারিয়া পিন্টু প্রথম বাংলাদেশি যিনি দেশের বাইরে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি এখনো সেই দিনটি স্মরণ করতে পারি। আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি হচ্ছে, দেশের বাইরে আমি প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। এটি বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশতিনি আরো বলেন, তৎকালীন সময়ে প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি টাকা সংগ্রহ হয়েছিল। তখনকার দিনে এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তহবিল ছিল। আমরা চেষ্টা করেছিলাম কিছু করে অন্তত্ব তো যুদ্ধের সাথী হতে। আমরা হয়েছি। তবে এখন আমাদের টিমের অনেকেই ভালো নেই। যদিও সবাইকে ভাতা দেয়া হয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে।

পিন্টু যোগ করেন, আমি ব্যাক্তিগতভাবে স্বাধীনতা পদক পেয়েছি। তবে আমি মরার আগে অন্তত্ব দলীয় ভাবেই স্বাধীনতা পদক পেতে চাই। আমি অনেক দেশ ঘুরেছি। তবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মত এমন ক্রীড়াপ্রেমী রাষ্ট্র নায়ক দেখিনি। তিনি দেশের যে কোনো খেলাতে যেভাবে এগিয়ে যান, নিজে উৎসাহ দেন তা ইতিহাসে বিরল। তার দৃষ্টিতে স্বাধীনবাংলা ফুটবল দল আসতে পারলে সবার শেষ জীবনটা হয়তো বদলে যেতো।

মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টু ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি নওগাঁয় জন্ম গ্রহণ করেন। ১০ বছর বয়সে নওগাঁ শহরের কৃষ্ণদেব হাই স্কুলের খেলার মাঠে তার ফুটবলে হাতেখড়ি হয়। ফুটবলের টানে তিনি চলে যান বরিশাল। ১৯৫৪ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন দুর্দান্ত ফুটবলার হিসেবে সবার নজরে আসেন তিনি।

মূলত রক্ষণভাগে খেলার পাশাপাশি নেতৃত্ব গুণের কারণে সমগ্র ফুটবল ক্যারিয়ারে তাকে অধিকাংশ সময় অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করতে হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬০ সালে ভর্তি হন বরিশালের বিএম কলেজে। তার কলেজ শেরে বাংলা শিল্ডে চ্যাম্পিয়ন এবং আন্তঃকলেজ ফুটবলে রানার্সআপ হয়। স্নাতক ডিগ্রি নেয়ার পর ১৯৬৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জাকারিয়া পিন্টু১৯৫৭ সালে কলেজে পড়ার সময় ইস্ট এন্ডের দ্বিতীয় বিভাগে খেলার আমন্ত্রণ পান পিন্টু। ট্রায়ালে তার ক্রীড়াশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে তাকে সরাসরি প্রথম বিভাগে খেলানো হয়। ১৯৫৭ ও ৫৮ সালে ইস্ট এন্ডে খেলার পর ১৯৫৯ সালে যোগ দেন তৎকালীন জনপ্রিয় দল ঢাকা ওয়ান্ডারার্সে। ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার এ ফুটবলার ওয়ান্ডারার্সের হয়ে হাফ ব্যাকে খেলে সবার নজর কেড়ে নেন।

দুর্দান্ত ফুটবল দক্ষতার কারণে পিন্টুর নাম হয় ‘কালো পাহাড়’। ১৯৬০ সালে ওয়ান্ডারার্স লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ১৯৬১ সালে তিনি যোগ দেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। এর পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছর মোহামেডানে খেলে ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন।

পরবর্তীতে তিনি হয়েছিলেন দেশের সেরা স্টপার। ক্লাবে যোগ দেয়ার প্রথম বছরই মোহামেডান লিগ, স্বাধীনতা দিবস টুর্নামেন্ট ও বরিশালের শেরে বাংলা শিল্ডে চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৭৫ সালে যখন খেলা ছেড়ে দেন, সেবারও লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় মোহামেডান। এছাড়া খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ১৯৬৩, ৬৫ ও ১৯৬৬ সালে লিগ শিরোপার স্বাদ পান।

১৯৬৮ সাল থেকে ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত রেকর্ড আট বছর মোহামেডানের অধিনায়ক ছিলেন পিন্টু। ১৯৬৮ সালে তার নেতৃত্বে আগাখান গোল্ড কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে সাদা-কালোরা। ওই বছরই তিনি জাতীয় দলে স্থান করে নেন।

পুরনো ছবিগুলো এখন শুধুই স্মৃতিপিন্টুর নেতৃত্বাধীন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের মাটিতে ১৬টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ১২টিতে জয়, ৩ টিতে ড্র ও ১ টিতে পরাজিত হয়। ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামে রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশের মধ্যে প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। মুজিবনগর একাদশের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।

এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়কও ছিলেন পিন্টু। ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ১৯তম মারদেকা ফুটবলে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব রক্ষণভাগের এই খেলোয়াড়। ব্যক্তিগত জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরুস্কার। স্বাধীনত পদকও পেয়েছেন তিনি।

স্বাধীনবাংলা ফুটবল দল, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক এবং একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড় হিসেবে সবসময় বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা অংশ হয়ে থাকবেন জাকারিয়া পিন্টু। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এএল/আরএস