একাকী জীবন সবসময়ই সুন্দর

ঢাকা, রোববার   ১৭ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ২ ১৪২৮,   ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

একাকী জীবন সবসময়ই সুন্দর

আরমীন ইসলাম বিপা  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০১:৪৭ ১৩ অক্টোবর ২০২১  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একাকী জীবন যৌথজীবনের মতোই একটি সাধারন অবস্থা। যদিও আমাদের সারাজীবনের গতানুগতিক শিক্ষা হচ্ছে- "একা একা আবার কোন জীবন হয় নাকি? যৌথজীবনই সুখের শেষ কথা।" কিন্তু সবসময় তো এটা হয়ে ওঠে না,  বা সবাই চায় না যৌথজীবনের বাড়তি ঝামেলাগুলো বইতে। তবে বিশ্বাস করুন আর না করুন, একাকী জীবনের রয়েছে অনেক অভাবনীয় সুবিধা। যারা স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে একাকী জীবনযাপন করছেন তারা চমৎকার সুবিধাগুলো -

নিজস্ব সাহায্য বলয়

যখন কেউ একটা সম্পর্কের ভেতর থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সঙ্গীর ওপরে সমস্ত নির্ভরতা তৈরি হয়। পরস্পরের ভালোবাসা, রাগ, দুঃখ, অভিমান, ভয় একজন আরেকজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়; সাহায্য সহায়তার জন্য একজন আরেকজনের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। 'দু'জনে দু'জনার' মতবাদের ভরসায় গড়ে ওঠা সম্পর্ক যখন কোনো কারণে দ্বিখণ্ডিত হয়, তখন দুজনেই এই চরম সত্যটা উপলব্ধি করে যে 'মানুষ আসলেই একা'। হঠাৎ করেই তার সকল সাপোর্ট সিস্টেম ধ্বসে পড়ে। 

একাকী জীবনে নিজের চারদিকে একটা সাহায্য বলয় তৈরি হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই। কারণ তখন মানুষটি জানে, 'সারভাইবাল ফর দ্য ফিটেস্ট'। আর ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য চারপাশের বন্ধুদের অবদান অনস্বীকার্য। একজন সংগীর থেকে দশজন ভালো বন্ধু আপনার একাকী জীবনের চার দিকে তৈরি করে এক চমৎকার সাহায্য বলয়। আপনার যেকোনো প্রয়োজনে কাউকে না কাউকে পাশে পেয়ে যাবেনই, যেটা একটা সম্পর্কের মধ্যে থেকে একক সঙ্গীর ক্ষেত্রে কখনোই আশা করা যায় না।

সময়টুকু শুধুই নিজের

একাকী জীবনে আপনার সমস্ত সময়ের সবটুকুই আপনি নিজের জন্য বরাদ্দ করতে পারেন। অন্য কারো জন্য কোন পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়না। আপনি বাইরে ঘুরতে যাবার পরিকল্পনা করতে পারেন; এবং চাইলে তক্ষুনি আবার সেটা বাদ ও দিতে পারেন। এজন্য আপনার উপরে কেউ হামলে পড়বে না, বা কৈফিয়তের দায়বদ্ধতায় আপনাকে ব্যতিব্যস্ত করবে না। একাকী জীবনে আপনি কারো কাছে কোন কৈফিয়ত দেয়া ছাড়াই নিজের জন্য নিজের সবটুকু সময় ব্যয় করতে পারেন। 

কম মানসিক উদ্বেগ 

ধরুন আপনার কোন বন্ধু আপনাকে মেসেজ দিল, 'তোমার সাথে কথা আছে'। আপনি কোন উদ্বেগ ছাড়াই এটা পড়বেন এবং হয়ত এটার কথা ভুলেও যাবেন। কিন্তু যখনি আপনার সঙ্গী আপনাকে এরকম একটি মেসেজ পাঠাবে, বিশ্বাস করুন, আপনি সারাক্ষণ একটা অদ্ভুত অস্থিরতা ও উদ্বেগের মধ্যে কাটাবেন। দ্রুত হৃদ স্পন্দন, কম্পিত হাত আর ঘর্মাক্ত কপাল নিয়ে অপেক্ষায় থাকবেন। মনের মধ্যে দুনিয়ার দুশ্চিন্তা এসে জড়ো হবে এবং দুরুদুরু বুকে আপনার সঙ্গীর সাথে কথা না বলা পর্যন্ত এই মানসিক পীড়ন সহ্য করতে থাকবেন। বিপরীতে, একাকী জীবনে আপনার এই পীড়ায় পীড়িত হবার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

নিজের টাকা নিজের কড়ি, ইচ্ছেমত খরচ করি

একাকী জীবন মানে কম অর্থনৈতিক দ্বায়িত্বের বোঝা। হিসেবটা সরল- যৌথজীবন মানেই দ্বিগুণ খরচ। অপরদিকে একাকী জীবন মানে আপনার সবটুকু আয় শুধুই আপনার। নিজের জন্য ব্যয় করে জীবনকে আরো আরামদায়ক করার সুযোগ থাকে। ইচ্ছেমত ব্যয় করুন, দান করুন বা জমান। সবটুকুই আপনার এবংআপনার সুখের জন্যই।

এবার জেনে নেওয়া যাক একাকী জীবনকে কীভাবে সাজিয়ে নিয়ে আরো সুখী করতে পারেন নিজেকে-

মজা করুন মনের খেয়াল খুশিমত

একাকী জীবন মানে আপনি আরেকজনের ভার থেকে মুক্ত। আরেক কথা, আপনি পুরোপুরি আপনার নিজের নিয়ন্ত্রাধীন। হঠাৎ রেস্টুরেন্টে গিয়ে পছন্দের খাবার খেতে অথবা শপিং এ যেতে হলেও আপনাকে কাউকে বলে যেতে হবেনা বা নির্ভর করতে হবেনা আরেকজনের সময় বা ইচ্ছার উপরে।

ঘুরে বেড়ান

কত্ত বড় এই পৃথিবীটা, প্রাত্যহিক জীবনের পিছুটানে কতখানি বা আর দেখতে পারি বা পেরেছি? একাকী জীবনের এই সুবিধাটুকু নিয়ে নিন - চোখ বুলিয়ে নিন অন্তর্জালে, ঠিক করুন গন্তব্য ও পরিকল্পনা, ব্যাকপ্যাকটা গুছিয়ে বেড়িয়ে যান দুনিয়া দেখতে! বিভিন্ন নৈসর্গিক স্থান ও স্থাপনার সাথে সাথে কত চমৎকার সব মানুষের দেখা পাবেন। তাদের সাথে পরিচিত হন, তাদের খাবার খান, তাদের উৎসবের অংশীদার হন, জানুন বৈচিত্র্যময় সমাজ ও সংস্কৃতিকে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, জীবনের নতুন অমূল্য একটা অর্থ খুঁজে পাবেন।

নিজের বিপরীতে নিজেই

এমন কিছু করতে পারেন যা আপনার নিত্যকার অভ্যস্ততার বাইরে। যেমন, আপনি যদি খুব শান্তু ঘরকুনো  মানুষ হন, বদলে ফেলুন নিজেকে এক রোমাঞ্চপ্রিয় দুর্দান্ত মানুষের সাথে। পাল্টে ফেলুন হেয়ারস্টাইল, জামাকাপড়। ঘুরে বেড়ান ইতিউতি। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। দুর্ধর্ষ ছটফটে মানুষ থেকে বনে যান নিরীহ শান্ত। ছেঁড়া জিন্স আর টি-শার্ট ছুড়ে ফেলে পড়ে নিন কোট প্যান্ট। বিরক্তিকর কোন সেমিনারে জয়েন করে ফেলতে পারেন, যেখানে যাবার কথা আগে চিন্তাও করতে পারতেন না।

এগুলো শুনতে একটু কঠিন মনে হচ্ছে? হ্যাঁ, এগুলো করা কঠিন এবং সেজন্যেই করবেন। নিজেকে ভেঙেচুরে বের করে আনুন আপনার এক 'নতুন স্বত্বা' কে। 

পথের সাথী বন্ধু 

'বন্ধু তোমার পথের সাথীরে চিনে নিও' - মানুষ কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, জীবনের পথ চলতে অবশ্যই বন্ধুর দরকার; সত্যিকারের বন্ধু। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে, বিপদে আপদে, সুখে দুঃখে, আনন্দে খুশীতে যারা আপনার পাশে থাকবে এবং আপনিও তাদের পাশে থাকবেন। তাই বন্ধুত্ব রক্ষা করুন। পারলে নতুন বন্ধু বানান, তবে একটু জেনে বুঝে, চিনে নিয়ে - উপরের গানটির মতো।

নিজেকে মূল্যায়ন করুন

হতেই পারে কোন কাজে সফল হননি, অনেক ছোট ছোট ভুল ত্রুটিও আছে আপনার; তবে এজন্য নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন। বরং নিজেকে বাহবা দিন আপনার একক সব প্রচেষ্টার জন্য। খেয়াল করে দেখুন, আমরা প্রায় সবাই অন্যের চোখে নিজেকে কাবিল দেখতে চাই, মরিয়া হয়ে যাই অন্যের কাছে কতটুকু গ্রহনযোগ্য হলাম সেটা জানার জন্য। অন্যের ভরসার কেন থাকবেন? নিজের দিকে মনযোগ দিন। খুঁজে খুঁজে বের করুন নিজের ভালোটুকু।

বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত হন

সুন্দর কিছুর সাথে জড়িত হন, উপভোগ করুন সেই অভিজ্ঞতা। নিজের শখ পূরন করুন, এমন কিছু করুন যা এতদিন সময়ের অভাবে করতে পারেননি। কোন প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারেন। অথবা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পড়াতে পারেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের, বিভিন্ন মানবিক কাজেও অংশ নিতে পারেন। মোদ্দাকথা, কিছু না কিছু করুন এবং এমন কিছু যা আপনাকে মানসিক প্রশান্তির পাশাপাশি আত্মিক শান্তিও দেবে; আপনাকে পরিনত করবে আরো উন্নত মানুষে।

জীবন সবসময়ই সুন্দর। গতানুগতিক চিন্তাধারা মতে একাকী বলে অসুখী হবার কিছু নেই। এমন অনেক কিছু করার আছে একাকী জীবনে যা যৌথজীবনে কখনোই সম্ভব নয়। জীবনকে চেনার জানার নতুন জানালা খুলে দেয় একাকী জীবন। যদি আপনি একা হন তবুও আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। দরকার শুধু দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে