‘কনডেম সেল’ আসলে কী?

ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭,   ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘কনডেম সেল’ আসলে কী?

ডেস্ক নিউজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:১০ ১ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৯:৩৪ ১ অক্টোবর ২০২০

কনডেম সেল।

কনডেম সেল।

২০১৯ সালের জুন মাসে বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় নিহতের স্ত্রী মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। বুধবার এ রায় ঘোষণার পর নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের কারাগারের 'কনডেম সেল' এ রাখা হয়েছে। এতে কনডেম সেল সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ পাচ্ছে।

কনডেম সেল কী?

কনডেম সেল মূলত কারাগারের ভেতরে থাকা আলাদা কক্ষ যেখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের রাখা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগ পর্যন্ত বন্দীদের সেই সেলে থাকতে হয়। কারাগারে অন্যান্য বন্দী বা কয়েদিদের চেয়ে কনডেমড সেলে থাকা কয়েদিদের আচরণবিধিও ভিন্ন। 

'কনডেম সেল'র সঙ্গে কারাগারের অন্যান্য সেলের পার্থক্য কী?

সাবেক কারা উপ-মহাপরিদর্শক শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, কোনো কারাগারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েদিদের অন্যান্য অপরাধীদের চেয়ে আলাদা ধরনের কক্ষে রাখা হয়। তবে বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধি মোতাবেক সে রকম কোনো আইন নেই।

কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর একজন বন্দীকে কারাগারে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা, দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও আলাদা কক্ষে রাখার বিষয়টি আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখিত নেই। তবে কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ অপরাধীদের চেয়ে কনডেম সেলের কয়েদিদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন বলে মন্তব্য করেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধিতে ফাঁসির আসামিদের কনডেমড সেলে রাখার মত কোনো বিষয় উল্লেখ নেই। তবে এ সেলটিতে রাখাকে এক ধরণের রেওয়াজ বলা যেতে পারে।

কনডেম সেলে কতজন বন্দী থাকেন?

শামসুল হায়দার বলেন, সাধারণত ধারণা করা হয় যে, দুইজন বন্দী থাকলে গোপনে পালানোর পরিকল্পনা করতে পারে, তবে তিনজন থাকলে পরিকল্পনা আর গোপন থাকে না। ঐ ধারণা থেকেই দুইজন বন্দী একটি কনডেম সেলে রাখা হয় না।

কারাবিধি অনুযায়ী, একজন বন্দীর থাকার জন্য ন্যুনতম ৩৬ বর্গফুট (৬ফিট বাই ৬ ফিট) জায়গা বরাদ্দ থাকতে হবে। তবে বাংলাদেশের জেলগুলোতে কনডেম সেলের ক্ষেত্রে এই আয়তন কিছুটা বেশি হয়ে থাকে বলে জানান সিদ্দিকী।

কনডেম সেল সাধারণত ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের হয়ে থাকলেও বাংলাদেশের অনেক জেলেই সেলের মাপ কিছুটা বড় হয়ে থাকে বলে জানান সিদ্দিকী। আর তিনজন বন্দী যেসব সেলে রাখা হয় সেগুলোর আয়তন আরো বড় হয়ে থাকে। কনডেমড সেলের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য সাধারণত অন্যান্য সেলের তুলনায় অনেক ছোট আকারের জানালা থাকে। আর এসব সেলে থাকা বন্দীদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেলের বাইরে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, এক সময় কনডেমড সেলের বন্দীদের নিজেদের সেলের বাইরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেল থেকে বছরের পর বছর বের হননি, এমন উদাহরণও আছে। কিন্তু একটা ছোট ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তাই বর্তমানে সব বন্দীদেরই দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বাইরে চলাফেরা করতে দেয়া হয়।

কতদিন পর কতজন মৃত্যুদণ্ডের কয়েদি সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন?

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, আগে এক সময় জেলের ভেতরেই কনডেম সেলে থাকা বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারতো দর্শনার্থীরা। তবে এখন মাসে একদিন জেল গেটে দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা।

একজন বন্দী একবারে সর্বোচ্চ পাঁচজন দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন। কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণত কনডেম সেলের প্রত্যেক বন্দীর কাছ থেকে তার নিকটাত্মীয়দের তালিকা নেন। নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া কনডেম সেলের বন্দীর সঙ্গে দেখা করতে অনুমতি দেয় না কারা কর্তৃপক্ষ।

তিনি আরো বলেন, সাধারণত মাসে একদিন বন্দীদের সঙ্গে দর্শনার্থীদের দেখা করার অনুমতি দেয়া হলেও বিশেষ বিবেচনায় কখনো কখনো ১৫ দিনের মধ্যেও কনডেম সেলের কয়েদিদের সঙ্গে দর্শনার্থীদের দেখা করতে দেয়া হয়।

উচ্চ আদালতে দণ্ড পরিবর্তিত হলে কী হয়?

বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো বহু নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। মাঝেমধ্যে দেখা যায় কোনো একটি বিচারিক আদালতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ পরিবর্তিত হয়েছে।

বাংলাদেশে এই ধরণের বেশকিছু ঘটনা রয়েছে যেখানে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করার পর তার সাজা কমেছে বা মওকুফ হয়েছে। আর এই ধরনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘসময় লেগে থাকে বলে মন্তব্য করেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। এসব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চতর আদালত থেকে বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কনডেম সেলেই থাকতে হয় বন্দীকে।

শামসুল হায়দার বলেন, যতদিন পর্যন্ত উচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বাতিল না করছে, ততদিন পর্যন্ত এ বন্দীকে কনডেম সেলেই থাকতে হয়। কারা বিধি অনুসরণ করে কনডেম সেল থেকে গিয়েই আদালতের কার্যক্রমে যোগ দিতে হয় বন্দীকে। আর এ রকম অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে বন্দীকে বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। বাংলাদেশে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো বন্দীর কনডেম সেলে থাকার নজির আছে বলে জানান হায়দার সিদ্দিকী।

-বিবিসি বাংলা

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ