ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ আবদুল কুদ্দুস মাখন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮,   ২৩ রমজান ১৪৪২

ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ আবদুল কুদ্দুস মাখন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫৫ ৩ মে ২০২১  

জাতীয় নেতা আবদুল কুদ্দুস মাখন

জাতীয় নেতা আবদুল কুদ্দুস মাখন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতি সন্তান, জাতীয় নেতা, ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর কাছে আবদুল কুদ্দুস মাখন এক অনুভূতির নাম। স্বমহিমায় যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায়। ‘প্রিয় মাখন ভাই’ দলমত নির্বিশেষে ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র।

আবদুল কুদ্দুস মাখন ছিলেন- স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ডাকসুর সাবেক জিএস, সাবেক এমপি এবং বঙ্গবন্ধুর চার খলিফাখ্যাত একজন।

১৯৪৭ সালের ১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার পুনিয়াউট গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন আবদুল কুদ্দুস মাখন। মো. আবদুল আলী ও আমেনা খাতুন দম্পতির ৯ ছেলে-মেয়ের মাখন ছিলেন তৃতীয়। মেধাবী আবদুল কুদ্দুস মাখন ১৯৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ (বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আবদুল কুদ্দুস মাখনের একটি দুর্লভ ছবি

স্কুলে থাকতেই ছাত্র রাজনীতির গোড়াপত্তন হয় আবদুল কুদ্দুস মাখনের। ১৯৬২ সালে তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহুকূমার শিক্ষার্থীদের একত্রিত করে ছাত্র আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব পান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন আবদুল কুদ্দুস মাখন। ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করে ছাত্র আন্দোলনকে গতিশীল করেন।

১৯৬৬-৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৮-৬৯ সালে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে এমএ পাশ করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে সর্ব প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন আবদুল কুদ্দুস মাখন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ গঠিত স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার সদস্যের অন্যতম ছিলেন আবদুল কুদ্দুস মাখন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর চার খলিফাখ্যাত একজন।

স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক ছাত্র জনসভায় স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করা হয় এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার প্রথম ইশতেহার পাঠ করা হয়। সেই ইশতেহারেই বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণ করে ঘোষণা দেয়া হয়।

জাতীয় বীর আবদুল কুদ্দুস মাখন পৌর মুক্তমঞ্চ

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার দিক নির্দেশনা দিলে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে লিপ্ত করার প্রয়াসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আবদুল কুদ্দুস মাখন ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার (চট্টগ্রাম, ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং ফরিদপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত) মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট, ট্রেনিং ও অস্ত্র সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আ.স.ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আবদুল কুদ্দুস মাখনের নেতৃত্বে ডাকসুর পক্ষ থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়।

আবদুল কুদ্দুস মাখন ১৯৭২ সালে ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী মেলায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুবলীগ সমন্বয়ে গঠিত দলের সদস্য হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন আবদুল কুদ্দুস মাখন। ১৯৭৪ সালে বার্লিনে আন্তর্জাতিক বিশ্ব যুব উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট সপরিবারে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা ছাড়া) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর ২৩ আগস্ট রাতে আবদুল কুদ্দুস মাখন গ্রেফতার হন। ১৯৭৮ সালের ১২ নভেম্বর জেল থেকে মুক্তি পান তিনি।

জাতীয় বীর আবদুল কুদ্দুস মাখন সেতু

১৯৯৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৭ বৎসর বয়সে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ও লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকার ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আবদুল কুদ্দুস মাখন। ১৪ ফেব্রুয়ারি তার লাশ দেশে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে লাশ ঢাকায় নেয়া হয়। ১৫ ফেব্রয়ারি ঢাকা জাতীয় ঈদগাহ্ ময়দানে জানাজা শেষে মিরপুর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় জাতীয় বীর আবদুল কুদ্দুস মাখনকে। মৃত্যুর আগে তিনি এক ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।

আবদুল কুদ্দুস মাখনের স্মৃতিকে চির জাগ্রত রাখতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি স্মৃতিসৌধ ও স্থাপনা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার উদ্যোগে শহরের মধ্যস্থলে (পৌর ভবন সংলগ্ন) নির্মিত করা হয়েছে ‘জাতীয় বীর আবদুল কুদ্দুস মাখন পৌর মুক্তমঞ্চ’। দৃষ্টিনন্দন ও ছায়াঘেরা এ ময়দান প্রতিদিন বিকেলে মানুষের পদভারে মুখরিত হয়। এছাড়া পৌর এলাকার লোকনাথ উদ্যানের (ট্যাংকেরপাড়) মঞ্চটিও ‘জাতীয় বীর আবদুল কুদ্দুস মাখন মুক্তমঞ্চ’ নামে নামকরণ করা হয়েছে।

সদর উপজেলার রামরাইল ইউনিয়নের একপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করুলিয়া খালের (অ্যান্ডারসন ক্যানেল) উপর নির্মিত ব্রিজের নামকরণও করা হয়েছে ‘জাতীয় বীর আবদুল কুদ্দুস মাখন সেতু’ নামে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্বরোডের গোলচত্বরে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘জাতীয় বীর আবদুল কুদ্দুস মাখন স্মৃতি চত্বর’।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর