জৌলুস হারাচ্ছে বিদ্রোহী কবির স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়ি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮,   ২৩ রমজান ১৪৪২

জৌলুস হারাচ্ছে বিদ্রোহী কবির স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়ি

আবুল বাসার আব্বাসী, মানিকগঞ্জ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২৫ ৩ মে ২০২১   আপডেট: ২১:৪১ ৩ মে ২০২১

নজরুল-প্রমিলার স্মৃতি বিজরিত ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়ি

নজরুল-প্রমিলার স্মৃতি বিজরিত ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়ি

‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ’, ‘ওই দেখা যায় তালগাছ ওই আমাদের গা’। যেই বাড়িতে বসে নজরুল রচনা করেছিলেন এমনি বহুগান, কবিতা। যেই ঘরে বসে, প্রতি রাতে গান, কবিতার আসর বসাতেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলা দেবী। তাদের স্মৃতি বিজরিত মানিকগঞ্জের তেওতা জমিদার বাড়ি দেশের পুরাকীর্তি স্থাপনার মধ্যে অন্যতম। 

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় যমুনা নদীর কোল ঘেষে ছায়া নিবিড় তেওতা এলাকায় জমিদার বাড়িটি অবস্তিত। এক সময় এ জমিদার বাড়িটি অতি সহজেই মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিতো। সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন জমিদার বাড়ির জৌলুস হারাতে বসেছে। দীর্ঘ বছর পার হলেও আংশিক সংস্কার ছাড়া অবহেলা আর অযত্নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়িটি।

সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, জমিদার হিমশংকর রায় চৌধুরী ও কিরন শংকর রায় চৌধুরীর বাড়ি ছিলো তেওতা গ্রামে। আঠার দশকের দিকে যমুনা নদীর কোল ঘেষা প্রায় আট একর জায়গা জুড়ে পায়ন রায় চৌধুরী এ-বিশাল বাড়িটি নির্মাণ করেন। 

অবহেলা আর অযত্নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়িটি।

অসাধারণ কারুকার্য় খচিত পুরো বাড়িতে নয়টি পোড়া মাটির ইট ও চুনামাটি দিয়ে তিনতলা বিশিষ্ট অট্রালিকা রয়েছে। প্রতিটি ভবন কাঠ, লোহা চিনামাটি দিয়ে নিপুণ হাতে গড়া বিভিন্ন কারুকার্যে খচিত নকশা দিয়ে তৈরি। দরজা জানালাসহ সব প্রকার আসবাবপত্রই শালকাঠ দিয়ে তৈরি। এতে কক্ষ রয়েছে মোট ৫৫ টি। বাড়ির সামনে রয়েছে শানবাঁধানো ঘাটলাসহ বিশাল আকারের পুকুর। পুকুরের জল তরঙ্গে পুরো রাজবাড়ির অবয়ন দর্শন করা যায়। দেখে মনে হয় পানির নিচে আরেকটি জমিদার বাড়ি রয়েছে। পুকুরের চতুরদিকে রয়েছে তালগাছ। বাড়ির ভেতরে রয়েছে আরো একটি পুকুর। যা পরিচর্যার অভাবে লাজুক অবস্থায় রয়েছে।

জনশ্রুতি রয়েছে, সে সময়ে জেলার সব প্রকার শাসন ব্যবস্থা, কর আদায় জমিদারবাড়ি থেকেই হতো। প্রাসাদের উত্তর পাশে ছিল নাটমন্দীর। মন্দিরের ভেতরে পিতলের গড়া বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি ছিলো। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে পুজা অর্চনা করতো। মাঝখানে ছিলো অন্দর মহল। রাজাদের শাসন ব্যবস্থার জন্য ঘর। কোনো প্রজা খাজনা বা কর না দিলে তাদেরকে ধরে এনে রাখার জন্য বন্দিশালার ঘর ছিলো। এছাড়া কেহ কর দিতে অস্বীকার করলে তাদেরকে অন্ধকূপে বন্দী রাখা হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে বলে জানান তিনি।

দক্ষিণ পাশে দুইটি অট্রালিকা। এর মাঝখানে ওপরে টিনের চালা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো থিয়েটার নাটক করার জন্য নাট্যমঞ্চ।  

 ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়িটি

জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকষর্ণীয় ছিল নবরত্ব দোলন মট। হিমশংকর রায় ১৮৫৮ সালে জমিদার বাড়ির আঙ্গিনায় শোভাবর্ধনকারী মটটি প্রতিষ্ঠা করেন। চারপাশে নয়টি মট দিয়ে প্রায় চার তলা বিশিষ্ট নবরত্ন মটটির উচ্চতা ৭৫ থেকে ৮০ ফুট। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মটটি খতিগ্রস্ত হয়। ১৯০৬ সালে মটটি মেরামত করা হয়। বাংলাদেশে এটিই প্রথম নবরত্ন মঠ। যা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠতো জমিদার বাড়ি। এখন বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে চোখে পড়ে এর ভগ্ন অংশ। 

রাজপ্রাসাদের সামনে রয়েছে সবুজ ঘাসে ভরা বিশার মাঠ। জমিদাররা এ-মাঠেই মাসব্যাপি দোলযাত্রার মেলার আয়োজন করতেন। রাজা নেই রাজ্য। এখন আর নিয়মিত পূজা অর্চনা হয় না। সন্ধা হলে আর শোনা যায় না পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ আর খোল করতালের শব্দ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসস্তপে পরিণত হয়ে হারাতে বসেছে এর জৌলুস।

শিবালয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহদুল ইসলাম বলেন, নজরুল প্রমিলার স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা প্রয়োজন। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা বনভোজনের জন্য আসে। দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন পর্যটকও আসে। এদের জন্য থাকা খাওয়া এবং নিরাপত্তার ভাল ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধা হলেই চলে যান। পর্যটকদের জন্য থাকা খাওয়ার ভালো পরিবেশের ব্যবস্থা থাকলে জমিদার বাড়িটি দর্শনীয় পর্যটক কেন্দ্র হয়ে উঠবে। 

জমিদার বাড়িতে ঘুরতে আসা চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক তানভির মোকাম্মেল বলেন, দেশে যে সকল পুরাকীর্তি রয়েছে তেওতা জমিদার বাড়ি এদের একটি। এগুলো আমাদের দেশের সম্পদ। আর তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এদেশের সরকার ও জনগণের। এখানে সিনেমা, নাটকসহ বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনের সুটিং স্পট করা যেতে পারে। 

অবহেলা আর অযত্নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়িটি।

বাংলা একাডেমির ফেলো, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতী বলেন, সংস্কারের অভাবে ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি তার জৌলস হারিয়ে ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজন্মদের কাছে এর সঠিক ইতিহাস জানাতে জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা দরকার। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউর রহমান জানু বলেন, নজরুল-প্রমিলার স্মৃতি বিজরিত ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়ির সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মর কাছে তুলে ধরতে এবং এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে জমিদার বাড়িটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।

শিবালয় ইউএনও মেহেদী হাসান জানান, এরই মধ্যে নজরুল প্রমিলা মিনি জাদুঘর, নজরুল প্রমিলা স্থায়ীয় নির্মাণসহ দুইটি ঘাট, তালতলা গুলঘর নবরত্ন মট পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। জমিদার বাড়িটি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে/আরএম